লঞ্চ দূর্ঘটনা - বাস্তব অভিজ্ঞতা।
আসসালামু আলাইকুম। প্রিয় আমার বাংলা ব্লগবাসি, কেমন আছেন আপনারা? আশা করি সকলেই ভাল আছেন। আজ আপনাদের সাথে একটি স্মৃতি কথা শেয়ার করব। যার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে, আমার জীবনে ঘটা একটি লঞ্চ দুর্ঘটনা।

ঘটনাটা আরও দশ বছর আগের। তখনো চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনাল ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় ছিল। এখন যেমন মেঘনা নদীতে আছে, তখন সেটা ছিল না। তখন চাঁদপুরের বিখ্যাত সেই তিন নদীর মিলনস্থল থেকে ভিতরে ডাকাতিয়া নদীতে ছিল লঞ্চ টার্মিনাল। যারা বিষয়টি এখনো বুঝতে পারেনি, তাদের আরো সুবিধার জন্য বলছি। ধরুন, মেঘনা হচ্ছে একটি মহাসড়ক যা সোজা চলে গিয়েছে। সেখান থেকে ডাকাতিয়া নদী একটি গলি আকারে বের হয়েছে সম্পূর্ণ ৯০ ডিগ্রি কোণে। সেই ডাকাতিয়া নদীতে এই লঞ্চ টার্মিনাল ছিল। মেঘনা নদীর বিশালত্বের কাছে ডাকাতিয়া নদী খুবই সরু। যার কারনে তখন হর হামেশাই লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটতো সেখানে। বর্ষাকালে তো এমনও হয়েছে, সেই তিন নদীর মুখের ঘোলে অনেক লঞ্চ, কার্গো, বাল্কহেড, নৌকা তলিয়ে গেছে।
তখন আমি অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়তাম। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছিলাম ঈদের দশ দিন আগে। আমি তখন সাধারণত রাতের লঞ্চ ব্যবহার করতাম। আমাদের চাঁদপুরের লঞ্চগুলো দুইটি স্টেশনে থামে। এক ধরনের হচ্ছে ঢাকা থেকে সরাসরি চাঁদপুর যায়, অন্য কোন ঘাট ধরে না। আরেক ধরনের হচ্ছে চাঁদপুর থেকে তারা হাইমচর উপজেলার দিকে যায় এবং সেখানে বেশ কয়েকটি ঘাট ধরে। চাঁদপুরের লঞ্চ ঘন্টায় ঘন্টায় পাওয়া গেলেও হাইমচরের লঞ্চ ছিল মাত্র একটি। যাইহোক, আমি অনেক আগে সদরঘাট পৌঁছে ভাবলাম অনেকদিন হাইমচর ঘাট হয়ে যাওয়া হয় না। আমি তাহলে হাইমচর ঘাট হয়ে যাই। এই ভেবে হাইমচরের লঞ্চে উঠি।
সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। এমন না যে তখন শীতকাল, নদীতে অনেক কুয়াশা। তেমন কিছুই না। তখন শীতকাল ছিল না। লঞ্চ রাত ৩ টার কিছুক্ষণ পর চাঁদপুর ঘাটের কাছাকাছি আসে। ওই মুহূর্তে মেঘনা নদী থেকে লঞ্চ টার্নিং নিয়ে ডাকাতিয়া নদীতে প্রবেশ করবে চাঁদপুর ঘাট ধরার জন্য। একটি ঘাটে যাওয়ার আগে যা হয়, লঞ্চের সবগুলো আলো জ্বলে উঠে এবং এক ধরনের বেল বেজে ওঠে ঘাঁট আসছে এমন সতর্ক করার জন্য। সেই শব্দ শুনে এবং আলো জ্বলে উঠায় আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ওই মুহূর্তে আমি দোতলায় চেয়ার কোচে বসে ছিলাম। আমার পাশেই ছিল জানালা এবং আমি যখন জানালার দিকে তাকালাম তখন আমার বুক ধড়ফড়িয়ে উঠলো।
ওই সময় আমি দেখলাম, বরিশাল থেকে ঢাকাগামী একটি বিশাল লঞ্চ যা আমাদের লঞ্চের তুলনায় বড় ছিল সেটি চাঁদপুর ঘাট থেকে ধেয়ে আসছে। সেই লঞ্চের গতি অনেক বেশি ছিল আর আমাদের লঞ্চে যেহেতু টার্নিং নিবে। তাই মৃদু গতিতে লঞ্চে ঘুরাচ্ছিল। এমন ভাবে সেই লঞ্চটি ধেয়ে আসছিল যে আমার বুকে কাপন ধরে যায় এবং আমি নিশ্চিত যে এখনই লঞ্চে লঞ্চে ধাক্কা খাবে।
আমি আশেপাশে চেয়ারে ঘুমিয়ে থাকা অন্যান্য যাত্রীদের দিকে তাকালাম। আমি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে সবাইকে সতর্ক করবো সেই শব্দটুকুও আমার মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল না। আমি কেবল আমার সাথে থাকা ব্যাগটি খুব জোরে কোলে পেঁচিয়ে বসে ছিলাম আর এক হাতে চেয়ার সিটের হাতল ধরে বসে ছিলাম। তখন ওই দিক থেকে আশা লঞ্চটি আমাদের লঞ্চটিকে ৯০ ডিগ্রী এ্যাঙ্গেলে খুব সজোড়ে ধাক্কা মারে। তখন দুটি লঞ্চে একসাথে দিক বদলে সামনের দিকে চলা শুরু করে। আমাদের লঞ্চটি বেশ বড় রকমের হেলাধুলা করে। কিছুক্ষণ পর লঞ্চটি স্থির হয়।
তখন আমি নিচতলায় যাই। ঈদ উপলক্ষে অনেকেই ঢাকা থেকে নানা রকমের জিনিসপত্র বোঝাই করে গ্রামে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে গিয়ে দেখলাম এরকম কয়েকটি কার্টুন নিচে পড়ে আছে। কয়েকজন লোক আহত হয়ে লঞ্চের ফ্লোরে শুয়ে পড়েছে। জানতে পারলাম, তিনজন লোক নদীতে পড়ে গিয়েছে এবং তারা সবাই ছিল লঞ্চের স্টাফ।
তড়িঘড়ি করে ওই মুহূর্তে লঞ্চটিকে ঘুরিয়ে চাঁদপুর ঘাটে ভেড়ানো হয়। ততক্ষণে এই খবর সবদিকে চাউর হয়ে গিয়েছে এবং বুঝতে পারলাম দোষ আমাদের লঞ্চের মাস্টারেরই ছিল। কোন রকমে লঞ্চটি চাঁদপুর টার্মিনালে ভিড়ানোর পর আমাদের লঞ্চের মাস্টার তিন তলা থেকেই পানিতে লাফ দিয়ে পালিয়ে যায়। অন্যান্য স্টাফরা আগেই পানিতে বা নৌকায় করে পালিয়ে গেছে।
যাইহোক, সেদিন বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু ঘটতে পারতো। আল্লাহ সেই যাত্রায় আমাদেরকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। অগত্যা চাঁদপুর থেকেই বাড়ি আসতে হলো। দুর্ঘটনার কারণে হাইমচর ঘাটে আর যাওয়া হলো না।