মাঝরাতের লোকাল প্যাসেঞ্জার

নীলমণি বাবু রেলের ছোটখাটো অফিসার। বদলির চাকরি, তাই তাকে প্রায়ই অসময়ে অচেনা সব স্টেশনে যাতায়াত করতে হয়। সেদিন ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় বারোটা বেজে গেল। ছোট স্টেশন, নাম 'কুসুমডিহি'। চারপাশ ঘন জঙ্গলে ঘেরা, আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়।
প্ল্যাটফর্মে আর কেউ নেই, শুধু দূরে একটা টিমটিমে হ্যারিকেন হাতে এক বুড়ো লোক বসে আছে। নীলমণি বাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করলেন, "ট্রেনটা কি আদেও আসবে?"
হঠাৎ পাশ থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "এ লাইনে আজ আর গাড়ি আসবে না বাবু।"
নীলমণি বাবু চমকে তাকিয়ে দেখলেন, সেই বুড়ো লোকটা কখন যেন তার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। লোকটার গায়ের চাদরটা বড্ড পুরনো আর একটা ভ্যাপসা গন্ধ বেরোচ্ছে।
নীলমণি বাবু: "কেন আসবে না? টাইমটেবলে তো ১২:১৫-র একটা আপ ট্রেন আছে।"
বুড়ো লোক: (একটু হেসে) "সে ট্রেন তো গত বছরেই আসা বন্ধ করে দিয়েছে। ওই যে দূরে ভাঙা সিগন্যালটা দেখছেন? ওখানেই একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটেছিল।"
নীলমণি বাবু কিছুটা ভয় পেলেও তর্কে হার মানতে চাইলেন না। তিনি মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে টাইমটেবলটা দেখতে গেলেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, টর্চের আলোটা পড়তেই দেখলেন সেই বুড়ো লোকটার কোনো ছায়া মাটিতে পড়ছে না!
তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। তিনি দ্রুত পায়ে স্টেশনের বাইরে যাওয়ার গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। পিছন থেকে সেই বুড়ো লোকটা চিৎকার করে বলে উঠল, "বাবু, একা যাবেন না! ওরা লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে আছে!"
নীলমণি বাবু পিছু ফিরে তাকালেন না। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর খেয়াল করলেন, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মটা শেষই হচ্ছে না। তিনি যেদিকেই হাঁটছেন, বারবার সেই একই ভাঙা সিগন্যাল আর সেই টিমটিমে হ্যারিকেন হাতে বুড়ো লোকটার সামনে এসে হাজির হচ্ছেন।
হঠাৎ দূরে একটা ট্রেনের বাঁশি শোনা গেল। এক অদ্ভুত কুয়াশাচ্ছন্ন আলো নিয়ে একটা ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে। ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে কোনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে না, কোনো শব্দ নেই। ট্রেনের জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ফ্যাকাশে চেহারার কিছু মানুষ, যাদের সবার চোখগুলো একদম সাদা।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা নীলমণি বাবুকে লাইনের ধারে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তার গায়ে কোনো চোট ছিল না, কিন্তু তার মাথার সব চুল একরাতেই ধবধবে সাদা হয়ে গিয়েছিল। আজও তিনি কুসুমডিহি স্টেশনের নাম শুনলে আতঙ্কে সিঁটিয়ে যান।
গল্পটা কেমন লাগলো? আপনি কি আরও গা ছমছমে কোনো শহুরে ভৌতিক গল্প শুনতে চান, নাকি পুরনো জমিদার বাড়ির কোনো রহস্য?