শেষ বৃষ্টির শহর
“মেঘ জমলে গল্প হয়… আজও আকাশ ভিজে আছে শব্দে।”
শেষ বৃষ্টির শহর 🌧️
শহরটা আজও একেবারেই আলাদা লাগছে।
বৃষ্টি নেমেছে ঝরঝরে, রাস্তায় পেছনের গাড়ির লাইটের প্রতিফলন নৃত্য করছে। আকাশ থেকে পড়া ফোঁটা যেন একে একে মানুষের স্মৃতি ঘেঁটে নিয়ে যাচ্ছে।
রোহান ছাদের কাছে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল। চোখে অদ্ভুত এক দুঃখের ছাপ। ফোনে বারবার নীহারিকার নাম আসছিল, কিন্তু তিনি আর ফোন ধরছিলেন না।
নীহারিকা। তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মানুষ। এবং সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ।
প্রথম প্রেমের দিন
তাদের দেখা হয়েছিল এক বর্ষার দুপুরে।
রোহান ছাতা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ এক ধাক্কা—কেউ তার দিকে ছুটে আসছে। নীহারিকা, হাতের বই ভিজে যাচ্ছে।
“দুঃখিত… আমি দেখে উঠতে পারিনি।” সে বলেছিল।
রোহান হেসে বলেছিল, “কিছু হয়নি। আপনি কি ভিজছেন?”
নীহারিকার চোখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। “ভিজতে ভালো লাগে।”
সেদিন থেকে বৃষ্টি তাদের বন্ধুত্বের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভালোবাসার মুহূর্ত
বছর দুয়েক ধরে তারা একসাথে ছিল।
সপ্তাহের অন্তে শহরের পুরোনো পার্কে বসে গল্প করত।
রোহান নীহারিকাকে বলত, “তুমি ছাড়া বৃষ্টি যেন সুন্দর লাগে না।”
নীহারিকা হেসে বলত, “বৃষ্টি আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী।”
তাদের ছোট ছোট অভ্যাস ছিল—একসাথে ছাতা ছুঁড়ে ফেলা, বইয়ের পাতা ভিজানো, হঠাৎ একে অপরের হাতে হাত রাখা।
শহরের ভিড়, ট্রাফিক, কোলাহল—সব কিছু যেন তাদের জন্য থেমে যেত।
সেই রাত
একদিন ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো।
নীহারিকা ফোন করেছিল, “আজ একটু দেখা হবে?”
রোহান ছুটে গেল। গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সে দেখল নীহারিকা, ভেজা চুল, চোখে অদ্ভুত আলো।
“রোহান… আমাকে ক্ষমা করো।”
“কেন?”
“আমি আর এখানে থাকতে পারব না। আমার পরিবার অন্য শহরে চলে যাচ্ছে। আমি… আমি চাই না তুমি অপেক্ষা করো।”
রোহানের বুকের ভেতরে একটাই শব্দ বাজছিল—না।
কিন্তু বৃষ্টি, ঝড়, অন্ধকার—সবই যেন তার কণ্ঠ চেপে দিল।
নীহারিকা ছাতার নিচে চলে গেল, আর রোহান শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
তিন বছর পর
রোহান এখন শহরের ব্যস্ত জীবনে আটকে। বড় অফিস, বড় বাড়ি, বড় চাকরি—সবই আছে।
কিন্তু বৃষ্টি নামলেই তার চোখ ভিজে যায়।
বুকের ভেতরে সেই রাতের স্মৃতি ঝাঁপসা হয়ে উঠে।
একদিন হঠাৎ সে এক ছোট্ট ক্যাফেতে ঢুকল। জানালার পাশে বসে কফি খাচ্ছিল। বাইরে বৃষ্টি।
এবং হঠাৎ—তাকে দেখল। নীহারিকা।
তাদের চোখ মিলল। শব্দ কিছুই হল না। শুধু বৃষ্টি বাজছিল, শহরের গলি ভিজছিল, আর হৃদয় দুইটিরই দ্রুত নাচছিল।
“তুমি এখানে?” রোহান অবাক হয়ে বলল।
“হ্যাঁ… আমি শহরে কাজ করি। দেখলাম তুমি এখানে,” নীহারিকা হেসে বলল।
তাদের মাঝে সময় থেমে গেল।
কিন্তু ভেতরে উভয়েরই জানা ছিল—তাদের স্বপ্ন আলাদা। তারা ভালোবাসা পেয়েছে, কিন্তু জীবন তাদের আলাদা পথে নিয়ে গেছে।
বৃষ্টি ও স্মৃতি
রোহান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে হালকা বৃষ্টি উপভোগ করল।
“তুমি ভালো আছ?”
নীহারিকা হেসে বলল, “হ্যাঁ। তুমি?”
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর নীহারিকা বলল, “বৃষ্টি নামলে সব কষ্ট মনে হয়। কিন্তু আমি চাই তুমি আনন্দে থাকো।
বৃষ্টি আমাদের শিখিয়েছে—ভালোবাসা শুধু আনন্দ নয়, কখনও কখনও ব্যথাও। কিন্তু সেই ব্যথাই আমাদের মানুষ করে।”
রোহান শুধু হেসে তার দিকে তাকাল।
মনের মধ্যে অগণিত প্রশ্ন, উত্তর, ব্যথা—সব মিলিত হয়ে একসাথে ভিজল।
শেষ দৃশ্য
বৃষ্টি থেমে যাচ্ছে।
নীহারিকা হাত তুলে আকাশের দিকে তাকালো।
রোহান পাশে দাঁড়িয়ে হালকা হাসল।
শহরটা এখনও একই—কোলাহল, ট্রাফিক, ব্যস্ততা।
কিন্তু তাদের দুইজনের মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তি।
একটি প্রেম যা পূর্ণ হয়নি, ব্যথা দিয়েছে, কিন্তু স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
একটি ভালোবাসা যা শহরের শেষ বৃষ্টির মতো—দূর থেকে সুন্দর, কাছ থেকে ব্যথা।
💧 শেষ লাইন:
“শহর ভিজল, মন ভিজল… কিন্তু আমাদের গল্প চিরকাল বৃষ্টির মতো থাকবে।”
“এটাই ছিল আজকের মেঘের গল্প। আবার দেখা হবে অন্য এক বৃষ্টিতে…” 🌥️
