পুরোনো দিনের স্মৃতি: হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালি শৈশবsteemCreated with Sketch.

a9ee7b10e0364995a356db84a4858dd0.jpeg

আজ রাতে হঠাৎ করেই ঘুম আসছিল না। জানালার বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, আর সেই শব্দের সাথে সাথে মনটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ফিরে গেলাম সেই দিনগুলোতে, যখন না ছিল স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন, না ছিল ব্যস্ততার দৌড়। ছিল শুধু মাটির গন্ধ, মায়ের ডাক আর বন্ধুদের হাসি। আজ সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কিছু গল্প আপনাদের সাথে ভাগ করতে চাই।
ভোরের সেই ডাক
তখন আমাদের ঘুম ভাঙত মোরগের ডাকে আর মায়ের গলার আওয়াজে। উঠানে গোবর-মাটি দিয়ে লেপা মেঝের সোঁদা গন্ধ, মাটির চুলায় ভাতের ফ্যান ফুটছে, আর ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে মায়ের ব্যস্ত মুখ। আজ দামি রেস্টুরেন্টে বসেও সেই পান্তাভাত আর কাঁচা মরিচের স্বাদ খুঁজে পাই না। কারণ ওই খাবারে শুধু চাল ছিল না, ছিল মায়ের হাতের ভালোবাসা।
দাদির গল্পের ঝুলি
সন্ধ্যা হলেই হারিকেনের আলোয় দাদির পাশে গোল হয়ে বসতাম আমরা ভাইবোনেরা। বাইরে ঝিঁঝি পোকার ডাক, ভেতরে দাদির মুখে রূপকথার রাজ্য। রাক্ষস-খোক্কস, সাত ভাই চম্পা, দৈত্যের গল্প শুনতে শুনতে কখন যে দাদির কোলেই ঘুমিয়ে পড়তাম, টেরই পেতাম না। আজ ইউটিউবে হাজারো কার্টুন আছে, কিন্তু দাদির সেই কাঁপা কাঁপা গলার গল্পের কাছে সব ফিকে। দাদি আজ আর নেই। তবু চোখ বন্ধ করলে এখনো তাঁর গলার সুর শুনতে পাই।
বর্ষার দিনের আনন্দ
বর্ষা এলেই আমাদের আনন্দের শেষ ছিল না। স্কুল থেকে ফেরার পথে কাদায় মাখামাখি হওয়া, খাতার পাতা ছিঁড়ে কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া, কে কার নৌকা আগে যায় তা নিয়ে বাজি ধরা। মা বকতেন, "জ্বর আসবে তো!" কিন্তু কে শোনে সেই কথা? বৃষ্টিতে ভিজে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়ার সুখ এখনকার কোনো এসি রুমে পাওয়া যায় না।
বন্ধুদের সেই দল
আমাদের একটা দল ছিল। গুলতি হাতে আম-জাম-কুলের গাছে চড়া, ঘুড়ি ওড়ানো, লাটিম ঘোরানো, গোল্লাছুট আর কানামাছি খেলা। কারও বাড়িতে দামি খেলনা ছিল না, কিন্তু আমাদের মতো ধনী কেউ ছিল না। সারা দিন খেলে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বকুনি খেতাম, আবার পরদিন সকালে সবাই হাজির। আজ সেই বন্ধুরা কেউ ঢাকায়, কেউ বিদেশে, কেউ সংসারের চাপে হারিয়ে গেছে। ফোনে মাঝে মাঝে কথা হয়, কিন্তু সেই প্রাণখোলা হাসিটা আর ফিরে আসে না।
ঈদের সকাল
ঈদের আগের রাতটা ছিল সারা বছরের সবচেয়ে অপেক্ষার রাত। নতুন জামাটা বালিশের পাশে রেখে ঘুমাতে যেতাম, যেন কেউ নিয়ে না যায়। ভোরে উঠে গোসল করে আতর মেখে বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যাওয়া। ফেরার পথে বড়দের সালাম করে পাওয়া দশ-বিশ টাকার সেই সালামি ছিল আমাদের কাছে লাখ টাকার চেয়েও দামি। মা সারা রাত জেগে সেমাই-পায়েস রান্না করতেন, আর আমরা কেবল খেয়েই খালাস। আজ বুঝি, সেই আনন্দের পেছনে মায়ের কত ত্যাগ লুকিয়ে ছিল।
চিঠির অপেক্ষা
তখন মোবাইল ছিল না। দূরের আত্মীয়ের খবর আসত চিঠিতে। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই বুক ধুকপুক করত, আমার নামে কি কিছু এল? একটা চিঠির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতাম। যখন আসত, বারবার পড়তাম, আর যত্ন করে বাক্সে তুলে রাখতাম। এখন এক সেকেন্ডে মেসেজ যায়, কিন্তু সেই অপেক্ষার মধুর কষ্টটা হারিয়ে গেছে।
আজকের এই নিঃসঙ্গতা
সময় বদলেছে, আমরাও বদলেছি। এখন হাতে হাতে ফোন, কিন্তু মনে মনে দূরত্ব। এক ঘরে বসেও আমরা যে যার স্ক্রিনে ডুবে থাকি। মা-বাবার পাশে বসে দুটো কথা বলার সময়টুকুও আমাদের হয় না। আর যখন সময় হয়, তখন হয়তো অনেকেই আর পাশে থাকেন না।
সত্যি বলতে, আমরা অনেক কিছু পেয়েছি, কিন্তু কিছু অমূল্য জিনিস চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। সেই সরল হাসি, সেই নিখাদ ভালোবাসা, সেই নির্ভার মনটা।
শেষ কথা
পুরোনো দিন আর ফিরে আসবে না, এটা জানি। কিন্তু স্মৃতিগুলো আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যখন মন ভারী হয়, যখন জীবনের যুদ্ধে ক্লান্ত লাগে, তখন চোখ বন্ধ করে সেই দিনগুলোতে ফিরে যাই। একটু কাঁদি, একটু হাসি, আর নতুন করে শক্তি পাই।
আপনারা যারা এই লেখাটা পড়ছেন, একবার থেমে ভাবুন তো, আপনার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটা কী? কার কথা মনে পড়ছে? হয়তো আপনার কোনো প্রিয় মানুষ এখনো আপনার পাশেই আছেন। আজই তাঁকে একটা ফোন করুন, দুটো কথা বলুন। কারণ সময় কারও জন্য থেমে থাকে না, আর আজকের এই মুহূর্তটাই একদিন আপনার পুরোনো দিনের স্মৃতি হয়ে যাবে।
আপনার প্রিয় শৈশবের স্মৃতিটা কমেন্টে জানান।