কলকাতার নিরালা লেনের এক বাড়ির ভূতুড়ে গল্পো

উত্তর কলকাতার এক পুরনো দিনের গলি, নাম নিরালা লেন। সেই গলির শেষের মাথায় একটা অনেক দিনের পুরনো দোতলা বাড়ি। বাড়িটার বয়স কম করে একশো বছর, দেওয়ালে বট-অশ্বত্থের চারা গজিয়েছে। এই বাড়িতেই সস্তায় একটা ঘর ভাড়ায় পেয়েছিল অতনু।
সেদিন ছিল শ্রাবণ মাসের রাত। বাইরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ছে। রাত এগারোটা নাগাদ হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। অতনু দেশলাই হাতড়ে টেবিল থেকে মোমবাতিটা জ্বালিয়ে নিল। জানলার বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
হঠাৎ, সেই বৃষ্টির শব্দের মাঝেই একটা অদ্ভুত আওয়াজ অতনুর কানে এল।
ছম... ছম... ছম...
কারো পায়ের আওয়াজ। কেউ যেন ভারী রূপোর নূপুর পায়ে দোতলার লম্বা টানা বারান্দা দিয়ে হাঁটছে। অতনু প্রথমে ভাবল মনের ভুল। কিন্তু আওয়াজটা ক্রমশ স্পষ্ট হতে লাগল। আওয়াজটা বারান্দা পেরিয়ে ছাদের কাঠের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অতনুর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। এই দোতলায় সে ছাড়া আর কেউ থাকে না সেটা ভেবেই তার বুকের হৃদস্পন্দন আরও বেড়ে গেলো। একতলার ভাড়টেরা পুজোয় দেশের বাড়ি গেছে। তাহলে ছাদে কে যাচ্ছে?
কৌতূহল আর ভয়—দুটো মিলিয়ে অতনু মোমবাতিটা হাতে নিয়ে ঘরের বাইরে এল। সিঁড়ির কাছে এসে সে থমকে গেল। ছাদের দরজাটা হাট করে খোলা! অথচ সে নিজে বিকেলে সেখানে মরচে পড়া তালাটা লাগিয়ে এসেছিল। অতনু আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠল। বৃষ্টির ছাঁটে মোমবাতির শিখাটা কাঁপছে।
ছাদের এক কোণে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। পরনে পুরনো আমলের লাল পাড় সাদা শাড়ি। পিঠ ছাপানো ভিজে চুল। মহিলাটি ছাদের কার্নিশ ধরে নিচের গলির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
অতনুর গলা শুকিয়ে কাঠ। কাঁপা কাঁপা গলায় সে ডাকল, "কে? কে ওখানে?"
মহিলাটি ধীরে ধীরে অতনুর দিকে ঘুরল। মোমবাতির টিমটিমে আলোয় অতনু যা দেখল, তাতে তার শরীরের রক্ত জল হয়ে গেল। মহিলার মুখে কোনো চোখ, নাক বা ঠোঁট নেই! একটা মসৃণ, ফ্যাকাশে চামড়ার আস্তরণ পুরো মুখটা ঢেকে রেখেছে।
মহিলাটি এবার অতনুর দিকে একটা ফ্যাকাশে হাত বাড়াল। ঠিক তখনই দমকা হাওয়ায় মোমবাতিটা দপ করে নিভে গেল।
পরদিন সকালে একতলার ভাড়টেরা ফিরে এসে অতনুকে সিঁড়ির মুখে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তিন দিন পর অতনুর জ্ঞান ফেরে হাসপাতালে। সে আর কোনোদিন ওই নিরালা লেনের বাড়িতে ফিরে যায়নি। তবে পাড়ার বয়স্করা বলেন, ওই বাড়ির ছাদে নাকি আজও বৃষ্টির রাতে নূপুরের শব্দ শোনা যায়।
