"আমার ঠাকুরমার তিরোধান দিবস/মৃত্যুবার্ষিকী"
![]()
|
|---|
Hello,
Everyone,
শ্রীমৎভগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, আমাদের শরীরের মধ্যে যে আত্মা আছে সেটা অবিনশ্বর অর্থাৎ আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না। তিনি আরও বলেছেন, আমরা যেমন জরাজীর্ন কাপড় ছেড়ে নতুন কাপড় পরি, ঠিক তেমনই আত্মাও মৃত্যুর সময় আমাদের শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীরে আবার পৃথিবীতে জন্মগ্ৰহন করে।
তাই আমাদের খুব কাছের মানুষেরা যখন আমাদের ছেড়ে পরলোকে চলে যান, তখন আমরা তাদের শারীরিক অনুপস্থিতির কষ্ট মনে বয়ে বেড়াই। কারণ আত্মা তখনও এই পৃথিবীতেই থেকে যায়, অন্য কোনো শরীরে, অন্য কোনো রূপে।
তবে এই পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া ও পুনরায় অন্য কোনো শরীরে জন্ম নেওয়া মাঝে কতখানি সময় অতিক্রম হয়, তার হিসাব আমাদের কারোর পক্ষে জানা কখনোই সম্ভব নয়। তাই আজীবন আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের প্রিয়জনেরা আমাদের সাথেই আছেন। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।
আজ থেকে ১৩ বছর আগে আমার মা এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। মা মারা যাওয়ার পরে আমাদের সংসারকে যে আগলে রেখেছিলেন, যার কারণে বাড়ির প্রতি এক টান ছিলো, ইট কাঠের তৈরি কাঠামোটিকে যার জন্য বাড়ি মনে হতো, সেই মানুষটি ছিলেন আমার ঠাকুরমা।
অনেক কম বয়সে মা চলে গেলেও তিনি কিন্তু মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সংসারটিকে আগলে রেখেছিলেন। আজ থেকে তিন বছর আগে, আজকের দিনে সেই মানুষটিও আমাদেরকে ছেড়ে চিরতরে চলে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ আজ আমার ঠাকুরমার মৃত্যুবার্ষিকী।
পৃথিবীর নিয়ম অনুসারে হয়তো এই মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে তিনি আবার পুনর্জন্ম পেয়েছেন। সত্যিই একথা আমি বিশ্বাস করি, কারণ এই জীবনে তার বহু অপূর্ণতা ছিলো। বেশ পুরনো ধ্যান ধারণার মানুষ ছিলেন তিনি। তাই সেই ১৬-১৭ বছর বয়স থেকে আমৃত্যু নিষ্ঠার সহিত তিনি বৈধব্য জীবন পালন করেছেন।
ঠাকুমার মুখেই শুনেছি, তার সংসার জীবন ছিল সাত আট বছরের। কারণ খুব অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার পর, ঠাকুরদার সঙ্গে তার সুখের সংসার খুব বেশি বছর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ঠাকুরমার বাপের বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা খুব বেশি ভালো না থাকলেও, শ্বশুর বাড়ির আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো ছিলো।
অনেক জমি জমা ছিলো আমার ঠাকুরদার। সংসারটা ভালোভাবে গুছিয়ে নেওয়ার আগেই, আমার বাবার চার বছর বয়সেই ঠাকুরদা মারা যান। ওই বয়সেই বাবাকে নিয়ে ঠাকুরমা তার বাপের বাড়িতে চলে আসেন। আর সেই থেকে শুরু হয় তার জীবনের লড়াই।
লড়াইটা ছিলো আর্থিক, সামাজিক, মানসিক, শারীরিক, সব দিকের। তবে সমস্ত লড়াই তিনি দৃঢ়তার সাথে লড়েছেন। তবে কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি, মিথ্যাচার করেননি, জ্ঞানত অবস্থায় কারোর ক্ষতি করেননি। তাই আমি বিশ্বাস করি এজীবনে তিনি নিশ্চয়ই ভালো আছেন।
তবে জীবনের শেষ দিনগুলো কি ভীষণ যন্ত্রণা নিয়ে তিনি কাটিয়েছিলেন তা কল্পনা করলেও ভিতর থেকে শিউড়ে উঠি মাঝে মাঝে। সেই মুহূর্তে একদিকে বাবা আইসিতে জীবন মৃত্যুর সাথে লড়ছিলো, আর অন্যদিকে ঠাকুমার শারীরিক অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছিলো। বাবাকে সামলে ঠাকুরমাকে আর শেষ দিকে সময় দিয়ে উঠতে পারিনি, এই অপরাধবোধ আজকের দিনে যেন আরও বেশি কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
ওই সময় দাঁড়িয়ে ঠাকুরমার মৃত্যু কামনা বোধহয় আমরা সকলেই করেছিলাম। কারণ ওই কষ্ট বহন করে বেঁচে থাকার থেকে, উনি মুক্তি পাক এই প্রার্থনা আমাদের সকলের মনে ছিলো। আজীবন কাল অনেক কষ্ট পেয়েছেন তিনি, তবে সেই মুহূর্তের কষ্টটা ঈশ্বর বেশিদিন ওনাকে পেতে দেননি তার জন্য সত্যিই আমরা কৃতজ্ঞ।
সকলেই বলে মানুষ কর্ম অনুযায়ী ফল পেয়ে থাকে। তবে এই জীবনে মানুষটাকে তেমন কোনো খারাপ কাজ করতে দেখিনি। তাই কোন জীবনের কর্মের ফল তিনি পেলেন, তা সত্যিই আমার অজানা। তবে এখন তিনি ভালো আছেন, এ কথা আমি বিশ্বাস করি। কারণ আমি জানি ঈশ্বর সর্বদা নির্দয় হয় না।আর বিচারের কাঠগড়ায় তিনি সকলের প্রতি ন্যায়বিচার করেন।
![]() |
|---|
তাই এ জীবনে আমার ঠাকুরমা হিসেবে সকল কার্য সাঙ্গ করে আজ থেকে তিন বছর আগে এই দিনে তিনি সকলকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে এই পৃথিবীতেই তিনি আছেন, অন্য কোনো নামে, অন্য কোনো পরিচয়ে। হয়তো আমার সাথে আর কখনোই তার দেখা হবে না, তবে এমন একজন মানুষের সান্নিধ্যে পেয়ে জীবনে অনেক ভালো কিছু শিখেছি, একথা গর্বের সহিত বলতে পারি।
ভেবেছিলাম আজকের দিনে বাড়িতে যাবো, কারণ ওই বাড়িটা আমার ঠাকুমার বড্ড প্রিয় ছিলো। হাজার অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও, কখনো ওই বাড়ি ছেড়ে তিনি বেড়োতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি ঐ বাড়িতেই থাকবেন। আর ছিলেনও। ওই বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়। তাই আজকের দিনে ঐ বাড়িতে গেলে হয়তো আমাদের মনটাও শান্তি পেতো।
তবে শশুর মশাইয়ের শারীরিক অবস্থার কারনে আর যাওয়া হয়নি। কারণ যিনি চলে গেছেন তার স্মৃতির কাছে যাওয়ার থেকেও যে এখনও পর্যন্ত বেঁচে আছে, তাকে সাহায্য করার শিক্ষাও আমি আমার ঠাকুরমা, মা সকলের থেকে পেয়েছি। তাই আমার যেতে না পারার কারনটা বোধহয় ঠাকুরমা ঠিক বুঝতে পারবে।
সবশেষে বলবো যতদিন বেঁচে আছে কাছের মানুষদের আগলে রাখুন, যখন সময় ফুরিয়ে যাবে তখন তাদের স্মৃতির বোঝা বহন করা খুবই কঠিন। ভালো থাকবেন সকলে।
শুভরাত্রি।


Thank you for your support 🙏.