"জীবন ও মৃত্যুর মাঝে এক মুহূর্তের দুরত্ব"

in Incredible India5 days ago
IMG_20260130_230045.jpg

Hello,

Everyone,

আমাদের প্রত্যেকের জীবন অনিশ্চিত এ কথাটা আমরা সকলেই জানি। প্রত্যেকের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু আকস্মিক দুর্ঘটনা, আমাদেরকে বারংবার সে কথা স্মরণ করায়।কখনো কখনো হঠাৎ করে কিছু প্রিয় মানুষের সাথে ঘটে যাওয়া কোনো অঘটন হোক, কিংবা তাদের মৃত্যু আমাদেরকে জীবন সম্পর্কে আরো বাস্তবতা শেখায়।

খবরের কাগজে পড়া হোক কিংবা টিভির পর্দায় দেখা হোক, অচেনা কোনো মানুষের সাথে ঘটে যাওয়া কোনো কোনো দুর্ঘটনার কথা শুনে আমরা আঁৎকে উঠি। কখনো কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আবার কখনো কখনো সেই মানুষগুলোর জন্য আনমনে প্রার্থনা করি।

যাদের জীবনের সেই দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাদের পরিবারের সকলের প্রতি সমবেদনা জানাই এবং খুব কাছের কেউ হলে চেষ্টা করি শারীরিকভাবে সেখানে উপস্থিত থেকে, তাদের খারাপ সময়ে সঙ্গ দেওয়ার। মানুষ হিসেবে এই কাজগুলো আমাদের সকলেরই করা উচিত।

তবে‌ আমার কাছের মানুষদের শারীরিক ভাবে অনেকবার অসুস্থ হতে দেখলেও, ঈশ্বরের কৃপায় ব্যক্তিগতভাবে আমাকে কখনো এমন কোনো বড় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়নি, যেটা হতে হয়েছিল গত ২৫ শে জানুয়ারি।

আশাকরি আমার লেখা উপরোক্ত শীর্ষক দেখে আপনারা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পেরেছেন যে, কি বিষয় আজ আমি আপনাদের সাথে এই পোস্টের মাধ্যমে শেয়ার করতে চলেছি।

যারা আমার গত দিনের পোস্টগুলো পড়েছেন, তারা জানেন যে মামা শ্বশুরের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে গত ২৫ শে জানুয়ারি আমি কল্যাণীতে ছিলাম। সেদিন ছিল বৌভাতের অনুষ্ঠান। সুতরাং কন্যা যাত্রী হিসেবে আমরা সকলেই গিয়েছিলাম খড়দহ, যেখানে মামা শ্বশুরের মেয়ের বিয়ে হয়েছিল।

ডাবল ডেকার‌ বাস ভাড়া করা হয়েছিলো, যাতে সকলে মিলে একসাথে এক বাসে করেই যাওয়া যায়। আমার শশুর মশাই ও শাশুড়ি মা ছাড়াও আরো দুজন আত্মীয় বাদে আমরা সকলেই মামাশ্বশুর বাড়ি থেকে রাত প্রায় ৯:০০ টার দিকে রওনা করেছিলাম খড়দহের উদ্দেশ্যে।

যদিও সন্ধ্যা বেলা‌ থেকেই মোটামুটি বৌভাতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিলো। সকলে তৈরি হতে হতে সাড়ে আটটার কাছাকাছি বেজে গিয়েছিলো। এরপর এক এক করে সকলে এসে বাসে ওঠে, সাথে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য তত্ত্বের সমস্ত কিছু রেডি করাই ছিলো সেগুলো এক এক করে বাসে তুলে, সবাই মিলে রওনা দিতে রাত প্রায় নটা বেজে গিয়েছিলো।

দুরত্ব খুব বেশি নয়, তবে বাসটা এতো বড় ছিলো যে, সরু রাস্তা দিয়ে যেতে বেশ অসুবিধা পড়তে হয়েছে দু তিনবার। যার কারণে আমাদের আরও একটু লেট হয়েছে। প্রায় দশটার কাছাকাছি আমরা গিয়ে পৌঁছেছিলাম বিয়ে বাড়িতে। আগে থেকেই আশেপাশের লোকজনের ভিড় ছিলো, তার উপর কন্যা যাত্রী হিসেবে আমরা প্রায় ৭৫ জন গিয়েছিলাম। তাই কতখানি ভিড় হয়েছিলো সেই সময়, আশাকরি আপনারা আন্দাজ করতে পারছেন।

যাইহোক সেখানকার খাওয়া দাওয়া, আনন্দের মুহূর্ত, সমস্ত কিছু ভালোই কেটেছে। সকলের সঙ্গে দেখা করে, ছবি তুলে, ভালো সময় কাটিয়ে আমরা যখন বাসে করে কল্যাণী ফিরছি, তখন ঘড়িতে প্রায় রাত দুটো। সকলেই মোটামুটি ক্লান্ত। খাওয়া-দাওয়া শেষে সকলেরই চোখে ঘুম। তবুও সকলে সকলের সাথে গল্প করতে করতে বাড়িতে ফিরছিলাম।

হঠাৎ করে ভীষণ জোড়ে ঝাঁকুনি হলো। উল্টোদিকে সিটে বসে থাকা প্রতিটি ব্যক্তি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। কেউ কেউ বাসের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। আবার অনেকে সামনের সিট থেকে উল্টো দিকের সিটের মানুষের গায়ের উপরে পড়লো। মুহূর্তের মধ্যে কি হলো বুঝে ওঠার আগেই, সকলের চিৎকারে যেন সম্বিত ফিরলো।

সবাই‌ আগে বাচ্চাগুলোর দিকে তাকালো, কারণ বেশিরভাগ বাচ্চাই দোতলায় ছিলো। দু একটা বাচ্চা ভয় পেয়ে সাথে সাথে উপর থেকে লাফ দিয়ে বাসের মাঝখানে পড়লো। দুই একজন বয়স্ক মানুষ সিট থেকে নিচের দিকে পড়ে যাওয়ায় হাত পায়ে‌ সামান্য কেটে গেলো।

বাচ্চাদের কান্নাকাটি, বয়স্ক মানুষদেরকে টেনে তোলার চেষ্টা, সমস্ত কিছু মিলিয়ে সেই পরিস্থিতির আসলে বর্ণনা করার মত নয়। কারোর মোবাইলে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না, আবার কারোর ব্যাগ।

এই সম্পূর্ণ ঘটনার ভালো সব রাগ অবশ্যই ড্রাইভারের উপরে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। হঠাৎ করে এমনভাবে ব্রেক দিয়েছে যে, বাসে থাকা প্রতিটি ব্যক্তি ব্যাথা পাওয়ার পাশাপাশি প্রচন্ড ভয়ও পেয়েছে। কারণ অহরহ যে ঘটনা সংবাদপত্রে পড়েন বা টিভির পর্দায় থাকেন, আজ নিজেদের সাথে তেমন একটা ঘটায় ঘটায় আতঙ্কিত হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ছিলো।

তবে পরবর্তীতে বাস ড্রাইভার এর পাশে থাকা মানুষজন জানালেন, আমাদের‌ বাসের ড্রাইভারের কোনো দোষ ছিল না। বরং তিনি যদি সেই মুহূর্তে এতো জোরে ব্রেক না করতেন, তাহলে এই দুর্ঘটনা আরও অনেক গুণ বেড়ে যেতে পারতো। এমনকি বাসটা পাল্টিও খেতে পারতো। তখন আদেও কতজন মানুষ জীবিত থাকতো, সেই বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিলো। মুহূর্তের মধ্যে‌ বাস থেকে কয়েকজন নিচে নেমে, সামনে থাকা একটা চার চাকার গাড়ির ড্রাইভারকে বের করে প্রচন্ড মারধর করলো।

আসলে দোষটা ওই ড্রাইভারেরই। আমাদের বাসের পিছন পিছন গাড়িটি আসছিলো, হঠাৎ করেই সে আমাদের বাসকে ওভারটেক করে বাসের সামনে চলে আসে এবং গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলতো ওই গাড়ির উপরে আমাদের বাস যাতে ধাক্কা না দেয়, সেই কারণেই বাসের ড্রাইভার বাধ্য হয়ে এতো জোড়ে ব্রেক দিয়েছিলো।

চার চাকার ড্রাইভারটা মদ্যপান করেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তবে সেই মুহূর্তে কমবেশি সকলের ব্যথা লেগেছে, তাই খুব বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে, বাকিরা বাসে উঠে পড়ার পর, বাস আবার চলতে শুরু করলো।

আধ ঘন্টার মধ্যে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম ঠিকই, কিন্তু বাড়ি ফিরেও সারারাত আমি একটুও ঘুমাতে পারিনি। একটা ভীষণ রকমের আতঙ্ক কাজ করছিল মনের ভিতরে। কি হতে পারতো? আমরা প্রত্যেকে কোথায় থাকতাম? কি অবস্থা তে থাকতাম? আদেও বাড়ি ফিরতে পারতাম কিনা? কিংবা বেঁচে থাকতাম কিনা? এই সমস্ত কিছু চিন্তা ভাবনায় গোটা রাত পার হলো। পরের দিনে সকলের মুখেও এই একই কথা চলছিলো।

তবে সৌভাগ্যবশত অনেকের হাতে, পায়ে, কোমরে, ঘাড়ে, ব্যথা লেগেছে, অনেকের কেটে গেছে ঠিকই, কিন্তু এর থেকে বেশি আর কারোর কিছু হয়নি, এটা আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে। কারণ এর থেকেও আরও অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো এটা ভেবেই বাড়ি প্রত্যেকে আতঙ্কিত ছিলো।

যাইহোক ওই এক মুহূর্তে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনাটা, জীবন এবং মৃত্যুর মাঝে যে খুব বেশি ফারাক নেই তা আরও একবার বুঝতে সাহায্য করলো।

বহু বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছি, অনেক রাতে ফিরেছি, এছাড়াও অনেক দূরে বাসের ট্রাভেল করেছি, কিন্তু এমন দুর্ঘটনার সম্মুখীন এর‌ আগে আর কখনো হতে হয়নি। তাই এই ঘটনাটা আজীবনকাল মনে থাকবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ঈশ্বরের অসীম কৃপায় সকলেই আমরা ভালো ছিলাম। সামান্য ব্যথা পেলেও কারোরই খুব বড় কিছু ক্ষতি হয়নি, এটাই সত্যকে বড় কথা।

আপনাদের প্রত্যেকের কাছে অনুরোধ থাকবে যারা প্রতিদিন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে হোক, কিংবা জীবিকার কারণে হোক বাড়ি থেকে বেরোন, তারা সাবধানে চলাফেরা করবেন। কারণ সময়ের থেকে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।

অনেক সময় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে আমরা জীবনে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়ে থাকি‌ তবে সত্যি কথা বলতে জীবনে কোন মুহূর্তে কি দুর্ঘটনা ঘটবে সে বিষয়ে আমরা কেউ জানিনা। তাই সচেতনতাই একমাত্র দুর্ঘটনা থেকে বাঁচার উপায় হতে পারে।

ভালো থাকবেন আপনারা সকলে। শুভ রাত্রি।

Sort:  
Loading...
 4 days ago 

You share sudden brake and how fear spread among everyone in the bus. You explained this scene in a very simple and clear way. And it truly shows how life can change within seconds. While reading, I could feel the panic, confusion and silence that comes after such shocks. You are right, distance between life and death is only one moment. This experience teache us value life more and to always stay careful while traveling.

Posted using SteemX