"আমাদের গন্তব্য ছিলো নর্থ সিকিম - যাওয়ার পথের গল্প"

in Incredible India7 hours ago
IMG_20260509_132452.jpg
"নর্থ সিকিমে যাওয়ার পথে যখন মেঘের খুব কাছাকাছি ছিলাম, তখনকার একটা মুহূর্ত"

Hello,

Everyone,

ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ সকলের কথার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো। তখন হঠাৎ করেই মনে পড়লো আমি বাড়িতে নয়, গ্যাংটকের হোটেল রুমে আছি। আর সেটা মনে পড়তেই অন্যরকম খুশিতে মনটা ভরে উঠলো, যেটা খুব স্বাভাবিক।

প্রাত্যহিক জীবনে ঘুম থেকে উঠে সোজা রান্নাঘরে যাওয়ার অভ্যাস, তাই হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে যখন বুঝতে পারি আজ দিনটা অন্যরকম হতে চলেছে,‌ সত্যিই বেশ ভালো লাগে। যাইহোক এক এক করে সকলেই তৈরি হতে লাগলো। এর মাঝে আমি উঠে রুমের জানালা খুলে বাইরের কিছু ছবি তুললাম।

IMG_20260509_065504.jpg

IMG_20260509_065459.jpg

"গ্যাংটকের হোটেলে রুমের জানালা দিয়ে সকালের পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য"

পাহাড়ের এটাই বিশেষত্ব, যে কোনো জায়গা থেকেই যেন তার সৌন্দর্য্য অপূর্ব। যাইহোক একটু তাড়াহুড়োতেই আমরা সকলে রেডি হলাম। কারণ আমাদের ড্রাইভার দাদা আগেই বলে দিয়েছিলেন, একদম সকাল সকাল বেরোতে হবে। পথে কিছু সাইট সিন আছে, এমনকি লাঞ্চও রাস্তার কোনো হোটেলেই করতে হবে।

IMG_20260509_085215.jpg
"রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে তোলা একটা ছবি, স্মৃতি হয়ে থেকে যাক"
IMG_20260509_091458.jpg
"গাড়িতে সকলে‌ একত্রে"

তারপরেও নর্থ সিকিমে যেখানে আমরা থাকবো, সেখানে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে যাবে। কারণ রাস্তাটা অনেকখানি এবং কিছু কিছু জায়গায় গাড়ি খুব সাবধানে চালাতে হবে, সেই কারণে দিনের বেলাতেই পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সমস্ত কিছু গোছগাছ করার পর, লাগেজ নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।

IMG_20260509_091802.jpg
"আমাদের গাড়ি যখন জ্যামে আটকে ছিলো।"
IMG_20260509_091552.jpg
"সকাল বেলায় প্রার্থনায় মগ্ন একজন বৃদ্ধা"

এরপর গাড়ি চলতে শুরু করলো। কিছুদূর এগোনোর পর একটু জ্যাম পেলাম আমরা। সামনে গাড়ির লাইন ছিলো, আমাদের গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিলো। পাশে চোখ পড়তেই এক বয়স্ক মহিলাকে দেখলাম এক হাতে মালা জপ করছেন এবং অন্য হাতে একটা কোন যন্ত্র ঘোরাচ্ছেন। সেটা হয়তো ওনাদের মতো করেই প্রার্থনার একটা পদ্ধতি। গাড়ির মধ্যে থেকে ওনার একটা ছবি তুলে নিলাম।

IMG_20260509_091938.jpg
"গ্যাস নেওয়ার জন্য সকলে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।"

আরও কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ল রাস্তার পাশে খালি সিলিন্ডার নিয়ে মানুষের ভিড়। এখানে গ্যাসের সিলিন্ডার বাড়িতে বাড়িতে দেয় না। নির্দিষ্ট একটা দিনে রাস্তার পাশে একটা নির্দিষ্ট স্থানে গ্যাসের সিলিন্ডারের গাড়ি আসে। প্রত্যেকে নিজের বাড়ির ফাঁকা সিলিন্ডার এনে সেখানে লাইন দেন এবং সেখানে ফাঁকা সিলিন্ডার জমা দিয়ে, ভর্তি সিলিন্ডার নিয়ে বাড়িতে যান। পাহাড়ের দিকে নাকি এটাই নিয়ম, আমাদের ড্রাইভার দাদা সেটাই বললো।

কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়িটা একটুখানি সময়ের জন্য দাঁড়িয়েছিলো। ড্রাইভার দাদার কোনো একটা কাজ ছিলো সেই কারণেই। তাই আমরাও সকলে একটু গাড়ি থেকে নামলাম। সাথে সাথেই দূর থেকে একজন ছুটে এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালো।

IMG_20260509_094035.jpg

IMG_20260509_094039.jpg

"পাহাড়ের মতোই শান্ত স্বভাবের হয়ে থাকে এই পাহাড়ি সঙ্গীরা"

ছবিটা দেখে আশা করছি বুঝতেই পারছেন কার কথা বলছি। পাহাড়ের পরিবেশের মতো, সেখানকার মানুষদের মতো, এদের স্বভাবও ভীষণ শান্ত ও বন্ধুসুলভ হয়ে থাকে, এ কথা আমি আমার দার্জিলিং এ ঘোরার অভিজ্ঞতাতেও বহুবার উল্লেখ করেছি।

IMG_20260509_100447.jpg

IMG_20260516_200400.jpg

"নর্থ সিকিমে ঢোকার পথে পরে এই ব্রিজটি। এটা পার হলেই নর্থ সিকিমের এড়িয়া শুরু হয়।"

বেশ কিছুটা দূরে এগোতেই একটা ব্রিজ দেখিয়ে আমাদের ড্রাইভার দাদা বললেন, এই ব্রিজটা পেরোলেই আমরা পৌঁছে যাবো নর্থ সিকিমের মধ্যে। কারণ ব্রিজের ওপাশ থেকে নর্থ সিকিমের এড়িয়া শুরু হয়েছে। দেখলাম একদমই সঠিক, ব্রিজটা পার হতেই উল্টো দিকে একটা বোর্ডে‌ সেটাই লেখা রয়েছে।

IMG_20260509_105030.jpg

IMG_20260509_104258.jpg

IMG_20260509_104312.jpg

IMG_20260509_104305.jpg

"নর্থ সিকিমের অন্যতম আকর্ষণ 'সেভেন সিস্টার্স ওয়াটার ফলস' ও‌তার আশেপাশের সুন্দর পরিবেশ"

গাড়িতে করে অনেকটা পথ ফেরানোর পর সাইড সিন এর জন্য ড্রাইভার দাদা একটা জায়গায় দাঁড় করালেন, যেটার নাম ছিলো "সেভেন সিস্টার্স ওয়াটার ফলস"। বেশ মানুষের ভিড় ছিলো সেখানে। আশা করছি ছবি দেখে আপনারা বুঝতে পারছেন সেখানকার পরিবেশটাও খুব সুন্দর ছিলো। পাহাড়ের গা বেয়ে সাতটি জলধারা একত্রে নেমে আসায় এমন নামকরণ করা হয়েছে। তবে এই ওয়াটার ফলসের সৌন্দর্য্য সবথেকে বেশি উপভোগ করা যায় বর্ষাকালে।

IMG_20260509_104755.jpg

IMG_20260509_104809.jpg

IMG_20260509_104133.jpg

IMG_20260509_104429.jpg

"আমরা সকলে মিলে কিছু মুহূর্ত কাটালাম যা স্মৃতিতে অমলিন থাকবে।"

এতো সকালের দিক রোদ্দুর তেমন ওঠেনি আবার খুব একটা মেঘলা পরিবেশও ছিলো না। সেখানে দাঁড়িয়ে সকলেই নিজেদের মতন কিছু ছবি তুললাম। তারপর আমাদের গাড়ি আবার এগিয়ে চললো ‌সামনের দিকে। পাহাড়ি রাস্তার প্রত্যেকটা মুহূর্ত অনেক বেশি উপভোগ্য। তবে কিছু কিছু জায়গা যেন দৃষ্টি আকর্ষণ করে আরও বেশি।

IMG_20260517_235849.jpg
"প্রথমবার স্বচক্ষে দেখা ধাপ চাষ"

উপরে যে জায়গার ছবিটি আপনারা দেখতে পারছেন এখানে মূলত ধাপ চাষ হয়। ধাপ চাষ সম্পর্কে আমরা ভূগোলে বহুবার আগে পড়েছি, তবে এগুলো চোখের সামনে দেখার অনুভূতি একেবারেই অন্যরকম। ছবিটা দেখে আপনারা বুঝতে পারছেন কিনা জানিনা, তবে ধাপ ধাপ করে সমতল ভূমি তৈরি করে সেইখানে বেশ কিছু জিনিস চাষ করা হয় বলেই এটাকে ধাপ চাষ‌ বলে।

IMG_20260517_235903.jpg
"পাহাড়ি গাছের ফাঁকে মেঘের আনাগোনা"

এই সমস্ত জিনিস পেরিয়ে গাড়ি যখন আরও কিছুটা এগিয়ে চলেছে, তখন খানিক মেঘলা পরিবেশ চোখে পড়লো। যতো উপরের দিকে উঠছিলাম যেন মেঘেদের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছিলাম। এরকম ভাবেই বেশ কিছুটা চলতে চলতে সুন্দর বড় বড় কিছু গাছ দেখতে পেলাম। দূর থেকে ভেবেছিলাম বোধহয় এগুলো কোনো ফল বা ফুলের গাছ হবে। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম এগুলো পাহাড়ি কোনো গাছ, এতে আলাদা করে কোনো ফল বা ফুল হয় বলে মনে হলো না।

IMG_20260509_130538.jpg
"আমরা লাঞ্চ করেছিলাম এই হোটেলেই"

প্রায় দুপুরে একটা নাগাদ আমাদের গাড়ি এসে থামলো "গ্রিন ভ্যালি হোটেল" নামক একটা হোটেলে। সেখানেই আমাদের দুপুরের লাঞ্চ করার কথা ছিলো। তাই গাড়ি থেকে নেমে হোটেলের দিকে চোখ পরতেই দেখলাম সেখানে আরও একজন সদস্য হোটেলের সামনে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।

IMG_20260509_124040.jpg
"আমার এগ থালি"

জনকোলাহল খুব বেশি নেই, মাঝেমধ্যে কয়েকটা গাড়ি এসে দাঁড়াচ্ছে এবং আমাদের মতনই কয়েকজন পর্যটক সেখান থেকে নেমে এখানে লাঞ্চ করছেন। যাইহোক আমরাও ভিতরে ঢুকে লাঞ্চ করে নিলাম। আমাদের মধ্যে দুজন ফিস্ থালি নিয়েছিলো ঠিকই, তবে আমি এবং আরও তিনজন এগ থালি নিয়েছিলাম।

IMG_20260517_235930.jpg

IMG_20260517_235918.jpg

"মেঘের সাথে সাথে আমারও চলছিলাম আমাদের গন্তব্যে"

খাওয়া-দাওয়া সম্পন্ন করে আমরা হোটেলের বাইরে একটু ঘোরাফেরা করে, তারপর গাড়িতে করে আবার রওনা করলাম নর্থ সিকিমের উদ্দেশ্যে। ধীরে ধীরে যেন মেঘ আরও বাড়তে থাকলো এবং সম্পূর্ণ পরিবেশটা আরও শীতল হতে শুরু করছিলো। হোটেল থেকে যখন খেয়ে বেরিয়েছিলাম, তখনও ততটা ঠান্ডা লাগছিলো না। তবে সেখান থেকে আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বেশ শীত অনুভূত হচ্ছিলো।

যাইহোক এর পরবর্তীতে আমরা আরও বেশ কিছুটা রাস্তা পেরিয়ে, তারপর পৌঁছেছিলাম আমাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে। তবে সেখানে যাওয়ার আগে আরও কিছু জায়গা পরিদর্শন করেছিলাম, যেগুলো সম্পর্কে আমার অনুভূতি পরবর্তী পোস্টে উপস্থাপন করবো। আজকের মতো লেখা এখানেই শেষ করছি।

প্রত্যেকে ভালো থাকবেন। শুভরাত্রি।