"ঈশ্বরের পরিকল্পনা পরিবর্তন করার ক্ষমতা আমাদের নেই। কারণ ওটাই আমাদের ভবিতব্য।"
Hello,
Everyone,
গত কালকের দিনটা এতো সুন্দর ভাবে কাটানোর পর আজকের দিনটা যে এমন ভাবে শুরু হবে, এটা সত্যিই বুঝতে পারিনি। এই জন্যই বোধহয় সকলে বলে "ভালো সময় বড্ড ক্ষণস্থায়ী।"
অন্যান্য দিনের মতন ফোনে অ্যালার্ম দেওয়াই ছিলো। যেহেতু আজ শুভর অফিস ছিলো, তাই সময়মতো ঘুম থেকে উঠে সব কাজ করতে হবে বলে অ্যালার্ম দিয়েই শুয়ে ছিলাম। তবে বুঝিনি যে আজ ঘুম থেকে ওঠার জন্য আর অ্যালার্মের প্রয়োজন হবে না, কারণ ফোনের রিং এর শব্দেই ঘুম ভাঙ্গলো আজ।
ঘড়িতে তখন ছটার একটু বেশি বাজে, হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম আমার মামী ফোন করেছে। অতো সকালে ফোন পেয়ে বুঝতে অসুবিধা হলো না নিশ্চয়ই কোনো দুঃসংবাদ দেওয়ার জন্যই ফোন করেছে এতো সকাল সকাল।
কারণ অন্যান্য দিন মামী মূলত সন্ধ্যার পরেই ফোন করে। ফোনটা রিসিভ করার আগেই মাথার মধ্যে অনেকগুলো মুখ ভেসে উঠলো, ফোনটা তোলার পর যাদের শরীর খারাপের কথা শুনতে পারি এমন বিশ্বাস ছিলো মনে মনে।
যাইহোক ফোনটা তুলতেই অপরপ্রান্ত থেকে মামী বললো,- "বোলপুরের কোনো খবর পেয়েছিস?"
আমি বললাম,- "না।"
সত্যিই তার আগের রাতে শুতে যাওয়া পর্যন্ত তেমন কোনো কথা শুনিনি। আমার ফোনেও ফোন আসেনি, আর শশুর মশাইয়ের ফোনে কেউ কোনো খবর দিয়েছে, তেমন কোনো সংবাদ পাইনি।
মামি বলল, - "বোলপুরের বড় মামি মারা গেছে।"
হয়তো ঘুমের ঘোরে ভুল শুনছি ভেবে আবার জিজ্ঞাসা করাতে মামী বলল,- "মানিক মামার বউ মারা গেছে।"
তখন আর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে কার কথা বলছে। মামীর কাছেই শুনলাম, গতকাল রাতে ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করেছে। হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মারা গেছে।
এবার বলি আসলে ঘটনা। তিন থেকে চার দিন আগে ওই মামী নিজের শাশুড়ি মা এবং দুই নাতনি অর্থাৎ ছোটো মেয়ের দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে দিল্লি গিয়েছে। ওনার ছোটো মেয়ে এবং বড় মেয়ে দুজনেই দিল্লিতে থাকে। ছোটো মেয়ের বাচ্চা দুটোকে বোলপুরে স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলো। ওরা দিদিমার কাছেই থাকে ছোটো থেকেই যেহেতু বড় হয়েছে, তাই মাকে ছেড়ে দিদিমার কাছে থাকতে ওদের অসুবিধা হয় না।
ওদের স্কুলের পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছিলো, তাই মামি ঠিক করেছিল ওদেরকে সাথে নিয়ে দিল্লিতে কয়েকদিন বেরিয়ে আসবে। যাতে বাচ্চা দুটো বাবা মায়ের সাথেও থাকার সুযোগ পায়। দিল্লি থেকে বৃন্দাবন খুব বেশি দূর নয়, তাই যাওয়ার সময় সাথে করে নিজের শাশুড়ি অর্থাৎ আমার দিদিমাকেও নিয়ে গিয়েছিলো, যাতে ওনাকে বৃন্দাবন দর্শন করাতে পারেন। কারণ দিদিমার বহুদিনের ইচ্ছা ছিলো বৃন্দাবন দর্শন করার, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। তাই মামি এবার সেই দায়িত্ব নিয়েছিলো।
গত শুক্রবার রওনা করেছিলঝ দিল্লির উদ্দেশ্যে। রবিবার দিন গিয়ে পৌঁছেছে। ওখানেই দুদিন কাটিয়েছে। ঠিক ছিলো আজ অথবা আগামীকাল বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে রওনা করবে। কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছে ছিলো অন্যরকম।
কথায় আছে যে কোনো তীর্থস্থানে ঈশ্বর না চাইলে কখনোই ভ্রমন করা যায় না। তাই জন্যই হয়তো দিল্লির পর্যন্ত পৌঁছেও ওনাদের বৃন্দাবন দর্শন করার সুযোগ হলো না। তবে ঈশ্বর অন্য কোনো উপায়ে বৃন্দাবন দর্শন নাই করাতে পারতেন, সেটা মেনে নিতে এতো কষ্ট হতো না যতটা কষ্ট হলো এই মৃত্যুর খবরে।
মামীর দুই মেয়ে দিল্লিতে থাকলেও ছেলে কিন্তু বোলপুরেই রয়েছে। এমনকি ওনার স্বামীও। সুতরাং হয় আমার মামাকে ও ভাইকে দিল্লিতে যেতে হবে, অথবা মামীর বডি দিল্লি থেকে বাড়িতে নিয়ে আসতে হবে। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই ভাবনা চিন্তাতেই সকাল থেকে অনেকটা সময় পার হয়েছে।
আমি কতোটুকু খবর শুনেই ফোন রাখলাম। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে, ফ্রেশ হয়ে প্রতিদিনের মতো কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু মনটা পরেছিল ওইখানেই। কিছুক্ষণ পরে বোলপুরেই মাসির কাছে ফোন করে জানলাম, যেহেতু হসপিটালে নেওয়ার পথেই মৃত্যু হয়েছিলো, তাই ওরা আর হসপিটালে নেয়নি। কারণ হসপিটালে নেওয়া মানেই আবার পোস্টমর্টেমর বিষয়ে থাকবে। তাতে আরও সময় নষ্ট হবে।
তবে যেহেতু কোনো ডক্টর দেখেননি, তাই ডেথ সার্টিফিকেটও নেই। ফলতো প্লেনে করে বডি আনার কোনো উপায় নেই। অগত্যা সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অ্যাম্বুলেন্সে করেই ববি বাড়িতে নিয়ে আসবে। কারণ সকলের পক্ষে দিল্লিতে গিয়ে মামীকে দেখা সম্ভব নয়। তাই কোনোভাবে যদি শেষবারের মতন মামিকে বাড়িতে আনা যায়, তাহলে সকলে অন্তত চোখের দেখা দেখতে পারবে।
আমরা প্রত্যেকেই জানি মানুষ মারা যাওয়ার পর আত্মা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু তবুও যেন আমাদের কাছে মানুষের শারীরিক উপস্থিতির মূল্য অনেকখানি। মামির ছেলে অর্থাৎ আমার ভাই পাগলের মতন কান্না করছে, যেটা খুব স্বাভাবিক। আসলে ওর নিজেরও দিল্লিতে যাওয়ার কথা ছিলো। তবে কাজের জায়গা থেকে ছুটি না পাওয়ায় ও যেতে পারেনি। সেই বিষয়টা নিয়ে ও আরও বেশি আফসোস করছে।
দুপুরের দিকে খবর পেলাম দিল্লি থেকে বডি নিয়ে দিদিমা, মামীর ছোটো মেয়ে, তার হাজব্যান্ড এবং দুটো নাতনি একসাথে রওনা হয়েছে এ্যাম্বুলেন্সে করেই। আজ সারাদিন, সারারাত এবং আগামীকাল সারাদিন ওরা অ্যাম্বুলেন্সেই থাকবে। মোটামুটি সন্ধ্যার পর হয়তো বোলপুরে এসে পৌঁছাবে।
কথাগুলো শোনার পর থেকে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। এইরকম ভাবে এতটা পথ জার্নি করে আসা যে কি অবর্ণনীয় কষ্ট, তা বোধহয় আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না, যতটা উপলব্ধি করতে পারছে ওই অ্যাম্বুলেন্সে উপস্থিত মানুষগুলো।
দিদিমার কথা ভাবলে অনেক বেশি খারাপ লাগছে। ওনার এতটা বয়স হয়েছে, হয়তো উনি চলে গেলেও এতটা কষ্ট পেতাম না। যেখানে মামীর বেঁচে থাকার দরকার ছিলো তার সন্তানদের জন্য, নাতি-নাতনিদের জন্য। সেখানে তিনি পরলোকগমন করলো, অথচ তার সামনে তার শাশুড়ি মা বেঁচে রয়েছে।
শাশুড়ি হয়ে বৌমার বডি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসছে, এটা বোধহয় দিদিমার জন্য আরও অনেক বেশি কষ্টকর একটা অনুভূতি। ওদের কাছে ফোন করার সাহস করে উঠতে পারলাম না, কারণ ওদের পরিস্থিতি বোঝার মতন ক্ষমতা আমার নেই।
খবরটা শোনার পর থেকে আমার শশুরমশাইও একেবারেই চুপ করে গেছেন। আসলে এমন একটা সংবাদ এর জন্য বোধহয় কেউ কখনোই তৈরি ছিলাম না। দিদার অনেকটা বয়স হয়েছে, আমার শ্বশুর মশাইও খুব কষ্ট পাচ্ছেন। এনাদের মৃত্যুটা মেনে নেওয়া যতটা সহজ, এমন একটা কম বয়সী মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া ততটাই কঠিন। জীবনের অনেকটা পথ চলা এখনও বাকি ছিলো, কিন্তু তার আগেই সবটা শেষ হয়ে গেছে।
আগামীকাল এসে অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছালে জানিনা পরিস্থিতি কি হবে, তবে এইরকম একটা কঠিন মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত থাকা আমাদের অবশ্যই কর্তব্য ছিলো। কিন্তু পরিস্থিতি আমাদেরকে এমনভাবে বেঁধে রেখেছে যে, এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষে বোলপুর যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শ্বশুর মশাইয়ের যা শারীরিক অবস্থা, তাতে ওনাকে একা সামলানো কঠিন। তাই শ্বশুর মশাইকে সামলে, সংসারের সমস্ত কিছু করা আমার শাশুড়ির পক্ষে একটু অসম্ভব।
মামিকে আমি বহু বছর আগে সামনা সামনি দেখেছি। তারপর আর দেখা হয়নি। জীবনে শেষবারের মতন আর দেখা হবেও না, এটা ভেবেই খারাপ লাগছে। মৃত্যুর কাছে আমরা মানুষ কত অসহায় হয়ে পড়ি, অজান্তে কখন যে মৃত্যু এসে সামনে দাঁড়ায় আমরা কেউ আন্দাজও করতে পারি না। তাই নাহলে নিজের বাড়ি থেকে অতো দূরে গিয়ে কেন মৃত্যু হবে মামীর। এটাই ছিলো ওনার নিয়তি বা ভবিতব্য। ঈশ্বর এইভাবেই ওনার মৃত্যু লিখেছেন, যা খন্ডন করার ক্ষমতা আমাদের নেই।
মামীও যেমন ভেবেছিলো শাশুড়ি মাকে বৃন্দাবন দর্শন করাবে, সাথে নিজেও দর্শন করবে। যত সব পরিকল্পনা, ইচ্ছে সবটাই শেষ হয়ে গেল এক নিমেষেই। যাইহোক ঈশ্বর ওদের সকলকে এই শোক সামলে ওঠার শক্তি দিক, আমার সাথে সাথে আপনারাও এই প্রার্থনা করবেন, এই আশা রাখছি।
শুভরাত্রি।

Thank you for sharing on steem! I'm witness fuli, and I've given you a free upvote. If you'd like to support me, please consider voting at https://steemitwallet.com/~witnesses 🌟
Thank you for your support 🙏.