"একজন মায়ের ইচ্ছাপূরণের গল্প"

in Incredible India4 days ago (edited)
IMG_20260119_214119.jpg
"ননদের জন্য সারপ্রাইজ গিফ্ট"

Hello,

Everyone,

আমাদের প্রত্যেকেরই মনের মধ্যে কিছু কিছু ইচ্ছে সুপ্ত অবস্থায় আজীবন থেকে যায়। খুব সত্যি কথা বলতে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের মনের ইচ্ছেরও যেন পরিবর্তন ঘটে। বয়সের সাথে সাথে আমাদের পছন্দ বদলায়।

ছোটোবেলা থেকে আমাদের ইচ্ছে পূরণের জন্য আমরা সব সময়ই বাবা-মায়ের উপরে নির্ভর করি। একটা বয়সের পর সেই জায়গাটাও পরিবর্তন হতে শুরু করে। তবে তার থেকেও একটা বড় সত্যি হলো, জীবনের একটা পর্যায়ে এসে আমরা আমাদের মনের সুপ্ত ইচ্ছাগুলোকে প্রকাশ করার আগে অনেক কিছু চিন্তা ভাবনা করি।

আবার এমন অনেক ইচ্ছে থাকে, যেগুলো প্রকাশ করলেও হয়তো পরিস্থিতির কারণে বা আরও নানান সমস্যার কারণে তা অপূরণীয় থাকে। এই বয়সে এসে যেটা সবথেকে বেশি উপলব্ধি করেছি সেটা হলো, আমাদের জীবনে হয়তো অনেক ইচ্ছাই অপূরণীয় রয়েছে, তবে তার থেকেও বেশি অপূরণীয় ইচ্ছা নিয়ে আমার মাকে এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়েছে।

IMG_20260119_214042.jpg
"ননদের হাজব্যান্ড স্কুটি ডেলিভারি নেওয়ার মুহুর্তে"

কারণ সন্তানের জন্য, সংসারের জন্য, নিজের ইচ্ছে গুলোকে নিমেষের মধ্যে ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা বোধহয় ঈশ্বর শুধুমাত্র মায়েদের মধ্যে দিয়ে থাকেন। কেন জানিনা তবে আমি বিশ্বাস করি, বাবারা সমস্ত দায়িত্ব পালন করার মাঝেও, নিজের ছোটো ছোটো ইচ্ছে পূরণ করেই নেন। তবে সংসারের বাঁধনে বাধা পড়ে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মায়েরাই তাদের জীবনের ছোটো ছোটো ইচ্ছে পূরণ করে উঠতে পারে না।

তবে আমার মায়েদের মতন সাধারণ গৃহবধূরা সব সময় সন্তানদের ইচ্ছে পূরণের মাধ্যমে নিজেদের মনের সুপ্ত বাসনা গুলো পূরণের স্বপ্ন দেখে থাকেন। আমার মাও নিশ্চয়ই দেখেছিলেন এমন অনেক স্বপ্ন। তবে হয়তো তার সবটা পূরণ করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। ক্যান্সারের মতন দুরারোগ্য রোগে তিনি বয়সের অনেক আগেই পরলোক গমন করেছেন।

তবে এটা দেখে অবাক লাগে এমন অনেক সন্তানেরাই আছে, যারা বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব তো দূরের কথা দুবেলা তাদেরকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিতে চান না। অসুস্থতায় তাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেন না। বরং নির্দ্বিধায় তাদের সমস্ত দায়িত্ব অস্বীকার করেন। শুধু নিজেদের জীবন, নিজেদের সংসার, নিজেদের সন্তান, সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব ভুলে যায়। আজকালকার সমাজে এমন সন্তানদের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

IMG_20260119_214612.jpg
"স্কুটি যে দোকান থেকে কেনা হয়েছিলো সেখানকার রিসেপশন"

তাই আজকের সমাজের বেশিরভাগ মানুষ এটা বুঝে গিয়েছেন যে, সন্তানের উপরে নির্ভর করাটা নেহাত বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়স। তাই প্রত্যেকেই নিজেদের ইচ্ছে হোক বা ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব নিজেরা নিয়ে থাকেন। নিজেদের স্বাবলম্বী করার প্রচেষ্টা আজ সকলের মধ্যেই লক্ষ্যিত হয়।

তবে এই চিত্রের মধ্যে যখন একটা ব্যতিক্রমী কিছু চোখে পড়ে, তখন সেই জিনিসটা শেয়ার করতে মন চায়। তাই আজ আপনাদের মধ্যে সেই রকমই একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা উপস্থাপন করার জন্য হাজির হলাম।

আমার ননদের বড় ছেলে পলিটেকনিক পাস করে, ছ, মাস মতন হয়েছে ছত্রিশগড়ে একটি কোম্পানিতে কাজ করছে। সংসার খরচ চালনোর জন্য এতো কম বয়সে কাজে যুক্ত হয়েছে এমনটা নয়। জীবনে প্রথমবার ইন্টারভিউ দিয়ে এই চাকরিটা পেয়েছে, তাই সেখানে যাওয়ার এক প্রবল ইচ্ছা ছিলো ওর।

IMG_20260119_214131.jpg
"দোকানে থাকা আরও অন্যান্য স্কুটি"

বাড়ি ছেড়ে অত দূরে থাকার অভ্যাস কোনো দিন ছিল না। তবে সময় সবটাই শিখিয়ে নেয়। ননদ এবং ননদের হাসবেন্ডও বারণ করেনি, কারণ এখন থেকেই যদি দায়িত্ব নিতে শেখে, তাহলে একটা সময় হয়তো বুঝবে বাবা মায়েরাও কত কষ্ট করে সংসার চালিয়েছে, ওকে এবং ওর ছোট ভাইকে মানুষ করেছে, পড়াশোনা শিখিয়েছে, আর তাই ও আজকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে টাকাও ইনকাম করতে পারছে।

সবটাই খুব ভালোভাবে চলছে। নিজের ইনকাম করে প্রতি মাসে মায়ের কাছে অল্প কিছু টাকাও পাঠায়। তবে ছোটবেলা থেকেই ও শুনেছে ওর মায়ের একটা স্কুটি কেনার খুব শখ। কেনার থেকেও বলা ভালো স্কুটি চালানোর ইচ্ছে ছিলো খুব বেশি। তবে বিয়ের আগে তা পূরণ হয়নি।

আর বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব ও সন্তানদের বড় করার চেষ্টায় এতটাই মগ্ন হয়েছিল যে, নিজের সেই ছোট্ট স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। মায়ের মুখে এই কথা বহুবার ও শুনেছে। তাই বাবার সাথে আলাদা করে প্ল্যান করেছিল মা কে একটা সারপ্রাইজ দেবে।

IMG_20260119_214107.jpg
"বাচ্চাদের জন্য ব্যাটারি চালিত চার চাকা গাড়ি"

কিছু টাকা ও দেবে, আর কিছু টাকা বাবা দেবে, দুজনে মিলে মায়ের এই ছোট্ট স্বপ্ন পূরণ করবে। একদিকে স্বামী হিসেবে দাদার অবদান থাকবে, আর অন্যদিকে সন্তান হিসেবে ও মায়ের স্বপ্নপূরণের ছোট্ট অংশীদার হবে। অতোটুকু একটা ছেলের মাথায় এই ভাবনাটা এসেছে এটা জেনেই ভীষণ খুশি হয়েছিলাম।

যেহেতু সারপ্রাইজ মাকে দেবে, তাই মামা আর মামীকেও অর্থাৎ আমাকে ও শুভকে বিষয়টা জানাতেই হলো। তাই এর মাঝে একদিন শুভ আর আমার ননদের হাসবেন্ড গিয়ে গাড়ি দেখে এসেছিলো। কাগজপত্রের কাজও করে এসেছিলো। তারপর যেদিন গাড়ি ডেলিভারি দেবে সেদিন শুভ আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো সেই শোরুমে। যেখান থেকে গাড়ি ডেলিভারি নিয়ে আমরা ননদের বাড়িতে যাবো ঠিক করেছিলাম।

IMG_20260119_214501.jpg
"বাচ্চাদের জন্য ব্যাটারি চালিত বাইক "

সেখানে দাঁড়িয়েই বেশ কিছু ছবি তুলেছিলাম এবং কোন গাড়িটা আমরা নিয়েছিলাম সেটাও উপরে আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করেছি। তবে দুঃখের বিষয় গাড়িটা নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পর আমার ননদের এক্সপ্রেশনটা আর আলাদা করে ক্যামেরাবন্দি করতে পারিনি। করতে পারলে আপনারাও দেখতেন আনন্দেও মানুষের চোখে কিভাবে জল আসে এবং এই সামান্য স্বপ্ন পূরণ কতখানি তৃপ্ত করতে পারে।

বড় হয়ে আদেও ননদের ছেলে তাদেরকে কতখানি দেখবে বা তাদের ভালো থাকার কতখানি দায়িত্ব নেবে আমি আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তার গ্যারান্টি দিতে পারি না। তবে ও যে মনে রেখেছে ওর মায়ের এই ছোট্ট ইচ্ছার কথা এটাই সব থেকে বড় বিষয়।

আমার ননদ ভীষণ খুশি হয়েছিলো স্কুটাটা দেখে। যদিও এই মুহূর্তে ননদের ছেলে আনন্দ সহকারে স্কুটি চালাচ্ছে। তবে ও যখন আবার কাজের জায়গাতে ফিরে যাবে, তখন ননদ এই স্কুটি করেই ছোট ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসবে, নিয়ে আসবে। ফলে সময় যেমন বাচবে, তেমন নিজের জীবনের এই ইচ্ছাটাও পূরণ হবে।

সেদিন ননদকে দেখেই মনে হয়েছিলো হয়তো এমন অনেক অপূরণীয় ইচ্ছে নিয়ে আমার মাকেও চলে যেতে হয়েছে। সন্তান হিসেবে ননদের ছেলে যা পারলো, আমি হয়তো তা পারিনি। কারণ তেমন কিছু বুঝে ওঠার আগেই, মা সারা জীবনের হিসাব নিকাশ মিটিয়ে নিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে।

IMG_20260119_214115.jpg
"ননদের এই রঙটাই পছন্দের,তাই ননদের ছেলে এটাইসিলেক্ট করেছিলো "

যাই হোক আমি না পারলেও কোন একজন সন্তান যে তার মায়ের জন্য এতটুকু ভেবেছে, এটা ভেবে সেদিন বেশ ভালো লেগেছিলো। এমনভাবেই প্রতিটি মায়ের ছোট্ট ছোট্ট ইচ্ছে পূরণ হোক, সন্তানরা মায়েদের কাছে থাকুক, তাদের সাথে থাকুক। মা হিসেবে হয়তো প্রত্যেকটা মা শুধু এটুকুই চায়।

এর বাইরে যদি সন্তান তার জন্য কিছু করে, তাহলে তা হয় উপরি পাওনা। যাইহোক খুব ছোট্ট একটি মুহূর্ত, তবে আনন্দে খুশিতে ভরা। তাই ভাবলাম এই ঘটনাটাও আপনাদের সাথে শেয়ার করা যাক। ঘটনাটা সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত অভিমত মন্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চয় শেয়ার করবেন।

ভালো থাকবেন আপনারা সকলে। শুভরাত্রি।

Sort:  

I really enjoy your writing. Wishing you the best and continued success. Your job is really beautiful. ♥️

follow
@kfeedgamer5

756.jpg

Posted using SteemX

Loading...