রাত ১২টার দিকে ঢাকা ছেড়ে মাওয়া চলে যাওয়া।
ভূমিকম্পের পরে সবাই বাসা থেকে চলে যায়। এর মাঝেই বিভিন্ন ধরণের ভয়ঙ্কর সব গুজব ছড়িয়ে পরে আর সাথে যোগ হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলগুলো। সত্যি বলতে কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কারণ দুদিনে ৪ বার ভুমিকম্প আসলেই মনোজগতকে নাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট আর সবকটারই উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা ও এর আশেপাশে।
এগুলো মূল ভূমিকম্প নাকি আফটারশক সেটাও এখনো ক্লিয়ার না। আফটারশকও যে কি পরিমান ভয়ঙ্কর হতে পারে তার প্রমান তুরস্কের ভূমিকম্প। সেখানে আফটারশক এতটাই প্রবল ছিল যে ,তাতে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়।
আমাদের ভয়টাকে আরো বাড়িয়ে দেয় আমাদের বিড়ালের আচরণ। প্রথম দিন যখন ভূমিকম্প হচ্ছিলো তখন ওর দিকে আমার নজর পরেছিলো। পান্ডার বয়স অল্প হবার কারণেই হয়তোবা ও একদমই স্বাভাবিক আচরণ করতেছিলো কিন্তু এঞ্জেলকে দেখলাম ও টেবিলের নিচে পিঠ একদম নিচু করে রয়েছে। পরমুহূর্তেই দেখলাম পিঠ নিচু করে খাটের নিচে লুকাচ্ছে।
এর পরে ব্যাস্ততার জন্য ওকে আর খেয়াল করি নাই কিন্তু কিছুক্ষন পরে ছেলেদেরকে দেখলাম ওকে খুঁজতেছে। দুজনে মিলে সারা বাড়িতে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিছু সময় পরে ওদের সাথে আমিও যোগ দিলাম কিন্তু ওর কোনো খোঁজ নেই।
ও কলিং বেলের শব্দ শুনলে যেখানেই থাকুক কিংবা যত ঘুমেই থাকুক না কেন ছুটে আসে কিন্তু ঐদিন লম্বা সময় ধরে কলিং বেল বাজিয়েও ওকে বের করা যাই নাই। অনেক পরে পান্ডাকে দেখে রান্না ঘরের ক্যাবিনেটের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে।।
কিন্তু ওকে দেখে বোঝে যাচ্ছিলো যে ও ভয় পাচ্ছে কিছু নিয়ে। এর পরে বিষয়টা নিয়ে আর আমরা কেউ ভাবি নাই। কিন্তু পরের দিন ভূমিকম্পের পরে ওর মাঝে আবারো এক ধরণের অস্থিরতা ও আতংক খেয়াল করি আমরা সবাই।
আমরা সবাই জানি যে ,ভূকম্প কিংবা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টা পশুপাখিরা আগেই টের পেয়ে থাকে। আস্তে আস্তে ওর এই আচরণের পরিবর্তন আমাদেরকেও কিছুটা প্রভাবিত করতে থাকে। কিন্তু সবচাইতে বেশি প্রভাব পরে আমার ছেলের উপরে।
আমার শাশুড়ি মারা গিয়েছিলো রাত ৩টার সময় ,তার ঘন্টা দুয়েক আগে ছেলেরা ঘুমিয়েছিলো। আমার ছেলেদের সাথে ওদের দাদির খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আড়াইটার দিকে আমি আমার ছেলেদেরকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিলাম। এই ঘটনাটা আমার বড়ো ছেলের মনের উপরে হয়তোবা সারাজীবনের জন্যই প্রভাব ফেলে গেছে। ও সারারাত স্বাভাবিক থাকলেও ২টা থেকে ৩টাকে খানিকটা ভয় পায়। তবে সেটা যে যে অস্বাভাবিক রকমের ভয় তেমন না কিন্তু ভয়।
মানুষের ব্রেইন খুবই জটিল একটা জিনিস র সেজন্যই হয়তো আর সেই ভয়টা এসে যোগ দেয় এই ভূমিকম্পের ভয়ের সাথে।ওর ভয় ক্রমশ বাড়তে থেকে। ও আমাকে এসে বলে যে ও জানে যে ও যেটা ভাবতেছে সেটার পেছনে কোনো ধরণের যুক্তি নেই কিন্তু ওর কাছে মনে হচ্ছে যে আজকে রাত ২টার থেকে ৩টার মাঝে খারাপ কিছু একটা হবে। আমরা সবাই মিলে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যার্থ হই।
এই ধরণের আতংক যে শুধু ওর মাঝেই হচ্ছে এমন না ।অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছে এতে আর এই আতঙ্কের নাম সিসমোফোবিয়া বা ভূমিকম্প-ভীতি।কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে ,আর দাদির মৃত্যুর সময় হঠাৎ ডেকে তোলার কারণে যে ভয় ওর মনের মাঝে ঢুকে গেছে সেই দুটো যদি একত্রিত হয় বিশেষ করে মনের মাঝে যখন একটা নির্দিষ্ট সময়ও সেট হয়ে গেছে।
ওই সময় আসলে ওর কি অবস্থা হতে পারে এটা নিয়ে আমার কোনো ধারণাই নেই। হয়তোবা কিছুই হবে না আবার এমনও হতে পারে যে অবস্থা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
কিন্তু আমার মনের এই ভয় কাউকে বুঝিয়ে বলার সাহসও পাচ্ছিলাম না। গত দুইদিন ধরেই চাপ যাচ্ছে আর সেই সাথে ওর বাবার পরের দিন সকালে ব্যাংকে যেতে হবে সেটাও আমার মাথায় আছে।
তবে আমি না বললেও আমার ছোট ছেলে আমার মনের অবস্থা টের পেয়েছিলো যার কারণে আমি যখন ওর সাথে একমত হয়ে বললাম যে ,চলো আমরা ঢাকা থেকে বের হই ও তখন ওই ভাবে কোনো প্রতিবাদ করে নাই। কিন্তু এতে সবচাইতে বেশি বিরক্ত হলো ওর বাবা। তার এক কথা যে আমার ক্লান্তি লাগছে ,তোমরা যাও আমি এখন ঘুমাবো।
আমিও নাছোড়বান্দার মতোই তার পেছনে লাগলাম। তারপর আসলেই আমরা রাত ১২টার দিকে ব্যাগ গুছিয়ে আমাদের ২ বিড়ালের খাবার ,লিটারবক্স ও লিটারের বস্তা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। কোথায় যাবো সেটাও জানা নেই। ওদেরকে বললাম যে মাওয়ার দিকে চলো।
মাওয়াতে রাত যত বাড়ে মানুষও বাড়তে থাকে। আমরা মাওয়ার খোলা প্রান্তরে গাড়ি থামিয়ে বসে রইলাম। বাইরে প্রচন্ড রকমের মশা যার কারণে বের হওয়া যাচ্ছিলো না। ৪টার দিকে ছেলেকে বললাম এখন তো বাসায় যাওয়া যায় তাই না। ও মাথা দুলিয়ে রাজি হলো আর বললো সকালে বাবাকে ব্যাংকে যেতে না হলে আমি যেতাম না।
আমরা চুপচাপ গাড়ি নিয়ে ঢাকার পথে রওনা দিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার ছেলে আমাকে প্রথম কথাটাই বললো যে ,রাতে বের হওয়াটা একদমই বোকামি হয়েছিল। ওকে আমি উত্তরে বললাম যে,এটা তোমাকে রাতে বললে তুমি বুঝতে পারতে না। ও ঘাড় নেড়ে আমার কথায় সম্মতি জানালো।





@sduttaskitchen,
thank you so much ma'am.