জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ।
অনেক দিন ধরেই স্টিমিটের সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। বেশ কিছুদিন থেকেই লিখবো লিখবো ভেবেছি ঠিকই কিন্তু কেন যেন মনে হতো পারবো না। এর একটা কারন হয়তো আমার অসুস্থতাও ছিলো।
একটা সময় ওষুধের কারনেই কিনা জানি না গুছিয়ে চিন্তা ও অন্য মানুষ কি বলতেছে সেটাও খুব একটা বুঝতে সমস্যা হতো। বোকার মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম আর বোঝার চেষ্টা করতাম। তবে এখন সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠেছি।
আসলে ভেতরে ভেতরে এতটা অসুস্থ হয়ে পরলেও ওপরে তেমন কোন লক্ষনই ছিলো না।
দাড়িয়ে থাকলে কিছুটা অসস্তি লাগতো এটা নিয়েই ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি একটার পর একটা টেস্ট দেয়ার পরে আস্তে আস্তে ধরা পরলো যে লিভার ড্যামেজ হয়েছে ভালোমতোই।
আমাদের বহুদিনের পরিচিত ডক্টরের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমি সেদিন। তিনি কিছু বলার আগেই তার মুখভঙ্গি দেখেই বুঝতে পারছিলাম যে বড় ধরনের ঝামেলা হয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা সময় চুপ করে থেকে তিনি বললেন যে, আপনি পরিচিত মানুষ.. আপনার এই রিপোর্ট দেখে আমার মনটাও খারাপ হয়ে গেছে।
আমি আপনার চিকিৎসা করতে পারবো তবে আপনার আপনাকে আরো ভালোভাবে চিকিৎসা করবে তেমন একজনের কাছে পাঠাচ্ছি।তাকে বললাম রিভার্স কি সম্ভব? তিনি উত্তরে জানালেন, আমি কোন মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।
ওই দিনই আমি একজন গ্যাস্ট্রোলজিস্টের কাছে যাই আর তিনিই আমাকে জানান যে, আমার হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আছে। কিন্তু কোন লক্ষন না থাকায় কিছুই বুঝতে পারি নাই আমি।
সি ভাইরাসের কাজই হলো লিভারের ক্ষতি করা। ফ্যাটি লিভার ও সি ভাইরাস দুটো মিলে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে আমাকে। তিনি টেস্ট রিপোর্টের ওপর আঙ্গুল রেখে দেখালেন যে, ক্যান্সার রিমার্ক বেড়ে ১৩৯ হয়ে গেছে। পরের দিন একই সাথে এন্ড্রোস্কপি ও কোলনস্কপির করেন। এবং তার পরের দিন ৫ ঘন্টা সময়ব্যাপী সিটি স্ক্যান করেন। আর এর পর থেকেই থেকেই আমার চিন্তাশক্তি কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায়।
সৌভাগ্যবশত এন্ডোসস্কপি ও কোলনস্কপির রিপোর্ট ভালো আসে।কিন্তু ক্যানসার রিমার্কের কারনে একজন অনকোলজিস্টের কাছে যাই আবার। তিনি অবশ্য জানান যে, অনেক সময় লিভার কিংবা গলব্লাডারে ইনফেকশন থাকলেও ক্যান্সার রিমার্কস বেড়ে যায়।
তিনি একমাস ওষুধ খাওয়ার পরে আবারো টেস্ট করতে বলেন। তিনি জানান যে এরপর যদি রিমার্ক আরো বেড়ে যায় কিংবা ওইভাবেই থাকে তাহলে হোল বডি পেট স্ক্যান করে দেখবেন কোথায় ক্যান্সার সেল তৈরি হচ্ছে।
এই পুরো সময়টা আমার থেকে আমার পরিবারের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে বলা যায়।কারণ মাত্র বছর চারেক আগেই আমার বাসাতেই আমার শাশুড়ি মা লিভার ক্যানসারে মারা গেছেন।তখন কাছ থেকে সবাই দেখেছে কতটা যন্ত্রণাদায়ক ছিলো সেই মৃত্যু ।
যদিও আমার সামনে সবাই স্বাভাবিক আচরণ করতো ।এরই মাঝে একদিন আমার ছেলেকে পাশের রুম থেকে বলতে শোনলাম ,আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।
তবে আমি শুরু থেকেই নিজেকে বুঝিয়েছিলাম যে, মানুষতো একদিন মারা যাবেই। অন্য মানুষ জানে না কবে মারা যাবে আর আমি নাহয় বুঝতে পারব যে দ্রুতই মারা যাবো।
সেই সাথে এটাও জানতাম যে, আমি যদি মানসিকভাবে ভেঙে পরি তাহলে আমার কোনভাবেই বডি ফাইট করতে পারবে না অসুখের সাথে। তাই ভেঙে পরা যাবে না কোনভাবেই।
এসময় আমি চিন্তা করি এখন মারা যাওয়া যাবে না। পৃথিবীতে দেখার মতো অনেক কিছু এখনো বাকি। আমাকে সেগুলো দেখতে হবে। এসময় আমি একটা লিস্ট করি কোথায় কোথায় যাবো। প্রিয় জায়গাগুলোতে আবারো যাবো এটা নিয়ে বাচ্চাদের সাথে কথা বলি। অসুখের কথা না ভেবে সবসময় ভাবতাম আমি মেরিন ড্রাইভের রাস্তায় চলতেছি ।
আর যদি মারা যা-ই তাহলে বাবা-মায়ের পাশে কবর দিতে বলবো। একদিন হাসবেন্ডেকেও বলে রাখি যে, যদি মারা যাই তাহলে তুমি আরেকটা বিয়ে করো কারন বৃদ্ধ বয়সে একা বাচা কঠিন। বাচ্চারা যার যার মতো নিজেকে নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পরবে আর তখন কথা বলার মতো হলেও একজন পাশে একজন মানুষ প্রয়োজন ।
এতসব টেস্ট আর ঔষধের অত্যাচারে আমি সত্যিকারের রোগী হয়ে যাই ।প্রতিদিন আমার দুই ভাইয়ের বাসা থেকে খাবার পাঠাতো।এই সময় আমার পুরো পরিবার যেন অসুখের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় ।এজন্য আমি আমার পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো শেষ দিন পর্যন্ত ।
এরই মাঝে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয় দেশে চিকিৎসার পাশাপাশি দেশের বাইরে থাইল্যান্ডে নিয়ে যাবে চিকিৎসার জন্য। সবাই মিলে সেই প্রস্তুতি নিতে থাকে।




@sohanurrahman,
thank you so much,sir.