মিসকিন!Poverty- The Story of a Mother!(প্রথম পর্ব )

লেখায় উল্লেখিত তথ্য কাল্পনিক মনে হলে সেটাই!আবার, অনেক গৃহের অভ্যন্তরীণ সত্য মনে হলে তাই!
সবটাই পাঠকের উপরে ছেড়ে দিলাম।
একজন লেখক হিসেবে রচনা আমার কাজ, সেখানে দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যের সঙ্গে লেখায় তথা কিছু জীবনের সাদৃশ্য থাকবে বৈকি!
জন্মের সময় যদি মাতা পিতা তাদের নবজাত শিশুর জীবনের আগত সময়ের এক ঝলক দেখতে পেতেন, তাহলে বোধকরি আজকের এই লেখাটি লেখার প্রয়োজন হতো না!
অকালে, শুকিয়ে যাওয়া এবং ঝরে পড়া কত ফুলের মত প্রাণ, মাতৃক্রোড়ে প্রাণ হারাতো না! অনাকাক্ষিত কত ঘটনা সমাজে জায়গা পেতে না! এমনই এক ঘটনার সাক্ষী হতে হয়েছিল আমাকে।
তখন আমি কর্মসূত্রে বাইরে থাকি, কোথায়?
বিষয়টি আবশ্যকীয় নয়, কারণ, গল্পটি যার তার সম্পর্কে জানা বেশি প্রয়োজন।
গল্পের মূল চরিত্র মিশ্রি!
ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ, উচ্চতা হবে আনুমানিক এই পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি! নামের স্বার্থকতা চেহারায় সুস্পস্ট।

আমার কর্মস্থান থেকে সোজা পিচে মোড়া রাস্তা ধরে রোজ মায়ের সাথে স্কুলে যেতো!
তখন অবশ্য নাম জানতাম না, অফিসের প্রথম বিরতি পেয়ে চোদ্দো তলা থেকে লিফটে করে একই সময় নিচে নেমে প্রাতরাশ সেরে উপরে উঠে যেতাম।
সেই ফাঁকেই দেখতাম, একজন মা তার মেয়ের হাত ধরে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যেত।
মায়ের পরিহিত শাড়ি সংসারের হাল সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করছিল।
মিশ্রীর চেহারা এতটাই আকর্ষণীয় যে, যেকোনো পুরুষের দৃষ্টি অনায়াসে আকর্ষিত হবে।
আমি বেচারা অফিসের কাজের চাপে খানিক বিরতি নিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে নিচে নামি।
এই অধমের নাম তরুণ। নামটা নিয়ে বন্ধুরা বেশ কাহিনী গড়েছিল এক্ সময়, তারা প্রায়শঃই বলাবলি করতো,
হয়তো, আমার মাতা , পিতা তাদের একমাত্র পুত্রকে চির সতেজ রাখতে, আমার এই নামকরণ করেছিলেন, যাচ্ছে তাই!
আমার কথা থাক, এবার মিশ্রির কথায় ফেরা যাক।
সালটা ছিল ২০২২, বর্ষার হাত ধরে মাত্রই স্বস্তি ফিরেছে, তাই কাদাজল অবজ্ঞা করে সবেমাত্র নিচে নেমেছি প্রাতরাশ সারতে।
হঠাৎ একটি চিৎকার কানে আসতেই মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম, মিশ্রি কাদছে, পাশে তার মা, এদিক ওদিক সাহায্যের জন্য চাইছেন।
আমি চা ফেলে দিলাম দৌড়, কাছে গিয়ে বুঝলাম, পিচের রাস্তায় যে গর্তে জল জমে ছিল সেটি খেয়াল না করাতে, এই বিপদ।
সঙ্গে সঙ্গে ছায়াছবির নায়কের মত কোলে তুলে নিয়ে কাছে অবস্থিত নার্সিং হোমের দিকে দৌড়োলাম, পিছনে মেয়ের নামধরে ডাকতে ডাকতে তার মা আমার পিছন পিছন দৌড়চ্ছিলেন।
সেই মুহুর্তে মেয়েটির নাম প্রথমবার জানার সুযোগ পেয়েছিলাম।
এরপর, জানা গেলো মিশ্রির পা ভাঙেনি বটে, কিন্তু পা মচকে গেছে, কাজেই কিছুদিন বিশ্রামের প্রয়োজন।
মনে মনে ভাবলাম, তাহলে তো কাল থেকে আর দেখতে পাবো না মিশ্রিকে!
মনের মধ্যে কেমন যেন খালিবোধ করতে শুরু করলাম।
তার মায়ের কাছে বাড়ির ঠিকানা কি বলে চাইবো বুঝতে পারছিলাম না!
তবে, কাজটি মিশ্রির মা সহজ করে দিলেন, তার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে জানালেন, চিকিৎসায় যা খরচ আমি করেছি, সেই অর্থ এই মুহূর্তে তার কাছে নেই, তাই পরদিন বাড়ি গিয়ে টাকা নিয়ে আসতে।
তারপর রিক্সা ধরে দুজনেই, নার্সিং হোমের পাশের গলি ধরে এগিয়ে গেলেন।
খরচ করা টাকা ফেরত নেওয়া আমার উদ্দ্যেশ্য ছিল না, বরং তার চাইতে অধিক কৌতূহল ছিল মিশ্রি কে দেখার, সাথে তার ঠিকানা জানবার।
পরদিন কিছু ফল, আর একটা হরলিক্স কিনে, ঠিকানা নিয়ে মিশ্রি কে দেখতে তার বাড়িতে হাজির হলাম।
সবেমাত্র, সন্ধ্যা ঘনিয়েছে, মর্নিং শিফট শেষ করে মিশ্রি কে দেখতে গিয়েছিলাম।
আমাকে দেখে,মিশ্রির মা, বললেন, এসো, ঘরে এসো!

আমি তো আগে থেকেই তৈরি ছিলাম, ঘরের ভিতরে ঢুকতে একটু অসুবিধা হলো! মাথা নিচু করে বেড়া দিয়ে ঘেরা টিনের চালের ঘরে!
মাটির মেঝে, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায়, ঘরে প্রবেশ করতেই দেখলাম মিশ্রি চোখ বই এর পাতায়।
আমি যে, ফল আর হরলিক্স নিয়ে গিয়েছিলাম, সেটি মিশ্রির মায়ের হাতে তুলে দিলাম।
আমাকে বসতে দিয়ে, মিশ্রির মা,
আমার নাম জানতে চাইলেন।
আমি ইতস্তত হয়ে নিজের নাম জানালাম।
শাড়ির আঁচলের ভাজ খুলে, আমার টাকা ফেরত দিতে হাত বাড়াতেই আমি হাতজোড় করে জানালাম, আমি টাকা ফেরত নিতে আসিনি।
এরপর, খানিক জোরাজুরি করেছিল বটে, তবে আমি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে, এক্ প্রকার অজুহাত দেখিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম।
মিনিট পনেরো ছিলাম, তারমধ্যে একবার বই থেকে চোখ সরিয়ে আমাকে এক্ ঝলক দেখেছিল মিশ্রী, নাম বলবার সময়।
এর পরের বছর বদলি হয়ে গিয়েছিল আমার, তাই সময়ের সাথে মিশ্রীর স্মৃতি গলতে বসেছিল,
এক বন্ধুর বিয়েতে নিমন্ত্রণের কারণে গত বছর এসেছিলাম।
থাকার ব্যবস্থা বন্ধুর বাড়িতেই ছিল, কিন্তু বিবাহের স্থান ছিল বন্ধুর বাড়ি থেকে পাঁচশ মিটার দূরত্বে।

কাজেই, বিয়ের দিন সকালে আচার অনুষ্ঠান এর ফাঁকে ধুমপান করতে পাড়ার দোকানে দাঁড়িয়েছি, এমন সময় সামনের ট্রাফিক জ্যামে চোখ পড়লো, একটি প্রিজন ভ্যান এর জানালায় চোখ যেতেই, হাত থেকে সবেমাত্র ধরানো সিগারেট মাটিতে পড়ে গেলো!
স্থির চোখে প্রিজন ভ্যানের জানালার ফাঁক দিয়ে রাস্তায় যে মুখটি দেখলাম, সে অতি পরিচিত মুখ! সে আর কেউ নয়, "মিশ্রি!"
কিছু বোঝার আগেই, ট্রাফিক সিগন্যাল গ্রীন হয়ে যেতে, প্রিজন ভ্যান চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেলো!
মিশ্রির এই পরিস্থিতি কিভাবে হলো? কি হয়েছিল তার সাথে?


