গোধূলির ডায়েরি || পর্ব-২: আয়নার ওপারে
সন্ধ্যাটা আজ বেশ ভারী। আকাশজুড়ে মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি নামার ঠিক আগের মুহূর্তে দাদু পার্কে এলেন। তার সেই জীর্ণ চামড়ার ডায়েরিটা আজ বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরা। চশমার কাঁচ দুটো কেমন যেন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। দাদু বেঞ্চিতে বসলেন না, দাঁড়িয়েই রইলেন লেকের পাড়ে। বাতাস তখনো বইতে শুরু করেনি, চারিদিক নিথর।
ডায়েরির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে তিনি এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলেন। গলার স্বর কিছুটা ভাঙা, হয়তো বয়সের ভারে, কিংবা হয়তো আজ তার মনের আকাশেও কোনো ঝড় উঠেছে।
"শোনো হে যুবক, আজ আয়নার পেছনের গল্প বলি, যা আমরা সবাই জানি কিন্তু মানতে চাই না।"
দাদু সামনের লেকের স্থির জলের দিকে আঙুল নির্দেশ করলেন। জলের ওপর আকাশের মেঘের ছায়া পড়েছে, দেখতে কেমন কুৎসিত লাগছে। তিনি বলতে থাকলেন, “আমরা সারাজীবন আয়নায় নিজেদের খুঁজি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করি, পোশাক গুছাই, হাসার ভান করি। আমরা চাই সবাই আমাদের ওই রূপটাই দেখুক, যা দেখতে চমৎকার, যা সমাজে প্রশংসিত। কিন্তু আমরা কেউ আয়নার পেছনে তাকাতে চাই না।”
বৃদ্ধের হাত একটু কেঁপে উঠল। তিনি আবার ডায়েরির পাতায় চোখ রাখলেন।
"আয়নার পেছনের ওই অন্ধকারের নাম ‘বাস্তবতা’। ওইখানে আমাদের আসল চেহারাটা লুকিয়ে আছে। আমাদের ভয়, আমাদের ভুল, আমাদের অক্ষমতা। আমরা সবাই এক একটা মুখোশ পরে ঘুরছি। আমরা ভাবি, মুখোশটা সুন্দর হলে বুঝি আমরাও সুন্দর হয়ে যাব। কিন্তু একদিন যখন আয়নাটা ভেঙে যায়, তখন ওই কুৎসিত রূপটা দেখে আমরা নিজেরাই চমকে উঠি।”
দাদু ডায়েরিটা সজোরে বন্ধ করলেন। তখন দূরের মেঘ ডেকে উঠল, বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা দাদুর চশমায় পড়ল।
"আমরা আসলে নিজেকে ভালোবাসতে জানি না ছোকরা, আমরা শুধু নিজেদের প্রতিবিম্বটাকে ভালোবাসি। অথচ মনের ভেতরের ওই ভাঙাচোরা অন্ধকারটাকে যদি একটুও ভালোবাসতে পারতে, তবে এই পৃথিবীটা হয়তো মুখোশহীন হতে পারত। আয়না শুধু ছবি দেখায়, চরিত্র না।”
