গোধূলির ডায়েরি || পর্ব-১: লাশের ভুরিভোজsteemCreated with Sketch.

শহরের কোলাহল যখন স্তিমিত হয়ে আসে, ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় রাস্তার ধারের ভাঙা বেঞ্চটায় এসে বসেন এক বৃদ্ধ। উষ্কোখুস্কো সাদা চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর হাতে একটা জীর্ণ চামড়ার ডায়েরি। আমরা তাকে 'দাদু' বলেই ডাকি। দাদু যখন কথা বলেন, তার প্রতিটা শব্দ যেন জীবনের কোনো নির্মম সত্যকে নগ্ন করে দেয়।

IMG_20260525_194519.png

আজ সন্ধ্যায় দাদু ডায়েরিটা খুললেন। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে তেতো হাসলেন। তারপর বললেন,

"শোনো ছোকরা, আজ তোমাকে এই সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় তামাশার গল্প বলি।"

দাদু বলতে লাগলেন, "আমাদের গলির মোড়ে একটা লোক পড়ে থাকত। ছেঁড়া জামা, পেটে খিদের জ্বালা। দুদিন ধরে এক মুঠো ভাতের জন্য সে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। কেউ তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, কেউ অলস বলে গালি দিয়েছে। গতকাল রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর তীব্র খিদের চোটে লোকটা ফুটপাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। কেউ তার খোঁজ নেয়নি।"

বৃদ্ধ একটু থামলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়েরির পাতা ওল্টালেন।

"আজকে তার জানাজা আর চল্লিশা। জানো গলিতে আজ কী হচ্ছে? যে মানুষটা বেঁচে থাকতে এক টুকরো শুকনো রুটি পায়নি, আজ তার মৃত্যুর পর তাকে সম্মান জানাতে এলাহী কাণ্ড! বড় বড় ডেকচিতে বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। শত শত মানুষ তৃপ্তি করে খাচ্ছে আর আফসোস করছে—ইস, লোকটা বড় ভালো ছিল!"

দাদু ডায়েরিটা দপ করে বন্ধ করলেন। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত শূন্যতা।

"একটাই তো জীবন ছোকরা। ক্ষুধার্ত মানুষটা অন্নের অভাবে মরে গেল, অথচ তার মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে আজ খাবারের মহোৎসব হচ্ছে। এই পৃথিবী বেঁচে থাকা মানুষকে এক ফোঁটা জল দেয় না, কিন্তু লাশের ওপর ঠিকই রাজকীয় সমাদর ঢেলে দেয়। মানুষ আসলে ভালোবাসতে জানে, তবে শুধু লাশকে; জীবিত প্রাণটা তাদের কাছে বড্ড সস্তা।"