এক অন্তঃসত্ত্বা মায়ের মৃত্যু || 10% beneficiaries @shy-fox

in আমার বাংলা ব্লগ4 years ago

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বা আমিনবাজারের মোড়ের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কত মানুষ যে প্রাণ হারিয়েছে সে হিসেবে আমার নেই। গণহত্যা বলতে যদি শব্দ থেকে থাকে তাহলে এই ক্ষেত্রে গণমৃত্যু বললে কি খুব বেশি ভুল হবে ? বোধহয় হবে না। মৃত্যু শব্দটা আজকাল কেমন যেন পরিচিত হয়ে গেছে। চারিদিকে এত মৃত্যুর খবর শুনে মনে হয় এটাই তো স্বাভাবিক। ৮০ বছরের বৃদ্ধ মরবে ৪৪ বছরের মধ্যবয়সী মানুষ মরবে আবার ৫ বছর বয়সী শিশুও মরবে। ফেইসবুকের কল্যাণে কোন মৃত্যুর খবর জানার বাদ থাকে না। তবে পত্রিকাগুলোতে গণমৃত্যুর খবর ছাড়া বাকিগুলো হয়তো কোন একটা কোণায় জায়গা পায়।

গণমৃত্যুই হোক আর কারোর একার মৃত্যুই হোক, সব গুলোই পেছনে একটা অসমাপ্ত গল্প রেখে যায়। পৃথিবীর পিছুটান এত বেশি যে হুট করে যেদিন এই টান ছিড়ে যায়, সেটা মেনে নেওয়া বড় কঠিন হয়ে যায়। যে চলে গেল সে তো পৃথিবীর সব মায়া আর দায়িত্বকে কাটিয়ে এই পাঠের সমাপ্তি ঘটিয়ে চলে গেল। কিন্তু যে বা যারা রয়ে গেল? আর যারাই বা চলে গেল তারাই কি কখনো হুট করে চলে যেতে চেয়েছিল? এমন হাজারো অজানা গল্প রয়ে যায় প্রতিটি মৃত্যু আর গণমৃত্যুতে।

সবার কথা বলতে পারব না; আসলে সবার গল্প জানা সম্ভবও না। আমিনবাজারের ঘটনায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন সাবেক শিক্ষার্থী মারা যান যারা পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন পূজা আপু। তার সাথে আমার কোন যোগাযোগ ছিলনা। কিন্তু তার বন্ধু বা ভাইদের পোস্ট থেকে তার জীবন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করতে পারি।

পূজা আপুর চোখে স্বপ্ন ছিল অনেক বড় কিছু করার। পড়াতে ভাল লাগে তাই বিকেএসপিতে যোগও দিতে চেয়েছিলেন। স্বামী ছিল, আর ছিল ছোট একটা সংসার। সব থেকে বড় কথা উনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং এটাই তাদের প্রথম সন্তান। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা তাকে কিসের শাস্তিস্বরূপ স্পট ডেড হবার জন্য মনোনীত করল? তার এক বন্ধু হাসপাতালে গিয়ে দেখে ওনার স্বামী শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। সে কি করবে বুঝতে না পেরে ওনাকে জড়িয়ে ধরলেন। এতেই যেন হাহাকার করতে থাকা বুক থেকে কিছু কথা বেরিয়ে এল।

pexels-rodnae-productions-6149309.jpg

Image source
মৃত্যুর আগের দিন তার ৫ মাসের অনাগত সন্তানের আল্ট্রাসনোগ্রাফ করানো হয়। সেই রাতেই ভাই আপুকে রিপোর্ট দেখে দেখে সন্তানের বর্ণনা দিচ্ছিল। কি স্বপ্নের মত দিন! অথচ একটা দিনের ব্যবধানে স্বপ্নের মত সেই দিন স্বপ্নের মতই উবে গেল। আপু তো চলে গেল, কিন্তু এর সাথে ভাইয়ের রঙিন জীবনটাও নিয়ে গেল।

আর একজন আপু আইসিইউতে ছিলেন ২/৩ দিন। এরপর উনিও না ফেরার দেশে চলে যান। পেছনে রেখে যান স্বামী ও দেড় বছর বয়সী একটা সন্তান।

চারিদিকে এত মৃত্যু; হিসেব ছাড়া মৃত্যু; দায়ভার ছাড়া মৃত্যু। সবার মত আমিও সড়ক ব্যবস্থা আর গাড়ির ফিটনেসের কথা না বলে পারছিনা। জানিনা অর্থলোভী এসব মানুষ কবে সামান্য অর্থের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য দিতে জানবে। আমার অবস্থান থেকে এখন হয়ত শুধু প্রার্থনাই করে যেতে পারি।

লোকেশন

Sort:  
 4 years ago 

আসলেই যে মরে যায়,মরে গিয়ে বেঁচে যায় কিন্তু যারা বেঁচে থাকে তারা বেঁচে থেকে ও জীবনটা প্রায় অর্থহীন হয়ে পরে।ঘটনাটা পড়ে খারাপ লাগলো।এই রকম দুর্ঘটনা হাজারো মানুষ সাথে স্বপ্ন ও মরে যায়।ধন্যবাদ

 4 years ago 

আপনাকেও ধন্যবাদ আপু। আসলেই একটা মানুষের বিয়োগ কখনো সুখের হয়না। কিন্তু এটাই প্রকৃতির নিষ্ঠুরতম নিয়ম।

 4 years ago 

মানুষের জীবনটা হচ্ছে একটা যুদ্ধক্ষেত্র আসোলে যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ জয়ী হতে পারে। আরে জয় বিজয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন। তবে কিছু কিছু মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। শুধু সারাজীবন একটা ক্ষত সৃষ্টি করে দেয় এবং কি যে পিছু টান টা রেখে যায় সারা জীবন তার বিশ্বাস করা যায় না। যা সত্যি কল্পনার জগৎকে হার মানিয়ে দেয়। আসলে আপু আপনি হয়তো অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে লিখেছেন। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু আছে যারা কল্পনা করা যায় না এবং তার ব্যাখ্যা করা যায় না। অসম্পূর্ণ পরিত্যক্ত কিছু গল্পের মতো থাকে রায়। কিন্তু পুরোপুরি উইপোকা যেমন কাগজকে খেয়ে পেলে তার হৃদয়ের স্থানগুলো ক্ষত হতে হতে একসময় ছিড়ে যারে যায় সে প্রাণ। কিন্তু তাতেও খান্ত নয় রেখে যায় পিছুটান। অসাধারণ ছিল আপনার লেখাগুলো এবং অন্তঃসত্ত্বা মায়ের মৃত্যু যা শোনার জন্য সত্যিই প্রস্তুত ছিলাম না। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাদেরকে এত সুন্দর একটা বাস্তব গল্প উপহার দেওয়ার জন্য।

 4 years ago (edited)

ঠিক বলেছেন ভাইয়া কিছু মৃত্যুর কোন ব্যাখ্যা হয়না। কারণ সেই ব্যাথা প্রকাশ করার মত ভাষা হয়ত পৃথিবীর লেখকদের জানা নেই। শুধু প্রার্থনা করি বেচে থাকা মানুষগুলোর দুঃখ যেন লাঘব হয়।

 4 years ago 

প্রতিটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু যেন একেবারেই মেনে নেয়া যায় না। বিশেষ করে এই সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যু গুলো। এই মৃত্যু গুলো কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব যদি সড়কপথ আরো নিরাপদ করা যেত। পূজা আপুর মৃত্যু আসলেই একদম নাড়া দিয়ে গিয়েছে সকলকে।

 4 years ago 

জি আপু। সবাইকে আসলে সচেতন হতে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে যেন নিজের উপর আরোপিত দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারি। আর সেই মূল্যবোধ আসলে সমাজের গোড়া থেকেই হওয়া উচিত।

 4 years ago 

আপনার ঘটনাটি পড়ে আমার নিজেরই গায়ে যেন কিরকম শিউরে উঠলো। সত্যি প্রতিনিয়ত এত মৃত্যু বিষয়গুলো দেখলে ভীষন খারাপ লাগে। সত্যি একদিনের মধ্যে কত স্বপ্ন যেন মিলিয়ে গেল। আসলে প্রথম সন্তান নিয়ে বাবার কতটা স্বপ্ন থাকে সেটা নিশ্চয়ই আমরা কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারি। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি এরকম ভাবে মিথ্যে হয়ে যায় তখন তার জীবনে আর কিছুই বাকি থাকে না। যেন সব কিছুই শুধু আফসোস।

 4 years ago 

ঠিক বলেছেন আপু। সব হারানো সেই সব মানুষদের জায়গায় নিজেকে রাখলে একদন্ডও টিকতে পারিনা। শুধু কল্পনা করেই নিজের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। আল্লাহ সবাইকে রক্ষা করুন।

 4 years ago 

অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন আপনি। আমি শুধু ভাবছি অন্তঃসত্ত্বা মা টি চলে গিয়েছে আর তার পেটের বাচ্চাটি পৃথিবীতে আসতে না আসতেই মায়ের সঙ্গে চলে গেল। আপনার আজকের ঘটনাটি পড়ে আমার প্রতিবেশী এক ছোট বোনের এরকম মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা মনে পড়ে গেল। সেই ছোট বোনটি সাত মাসের অন্তঃসত্তা ছিলো ব্যাংকে চাকরি করতো লাঞ্চের সময় কলিগের বাসায় দাওয়াত ছিল। রিকশায় যাওয়ার সময় গলায় ওড়না পেচিয়ে পড়ে যায়। ফলে পেছনের অন্য একটি অটো রিক্সার চাকা গলার উপর দিয়ে উঠে গেলে সেখানেই মৃত্যু হয়। ঘটনাগুলো ভাবতেই অনেক খারাপ লাগে।

 4 years ago 

আপনার গল্পটি পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল । মৃত্যুবরণ আমাদের সবাইকেই করতে হবে, তবে সেটা একটা স্বাভাবিক নিয়মে হয়। কিন্তু অকাল মৃত্যু আমরা কেউ মেনে নিতে পারি না । বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এই অকাল মৃত্যু হল একটি পরিবারের জন্য খুবই দুঃখজনক । আপনি অনেক সাজিয়ে-গুছিয়ে পোষ্টটি লিখেছেন ধন্যবাদ আপনাকে।

 4 years ago 

এজাতীয় পোস্টগুলো আমার পড়তে একেবারে মন চায় না। কারণ এইগুলো পড়তে গেলে খুবই কষ্ট মনের মধ্যে জেগে ওঠে এবং কেমন জানি একটি মনোভাব সৃষ্টি হয়ে যায়।