এত অহংকার, এত হিংসা—শেষ পর্যন্ত মানুষ কী নিয়ে থাকে?

মানুষের জীবন খুব ছোট। অথচ এই ছোট্ট জীবনের মধ্যেই আমরা কত কিছু নিয়ে অহংকার করি, কত মানুষের সঙ্গে হিংসা করি, কত সম্পর্ক নষ্ট করি, কত ভালোবাসাকে দূরে সরিয়ে দিই। কখনো অর্থ নিয়ে অহংকার, কখনো সৌন্দর্য নিয়ে, কখনো শিক্ষার জন্য, কখনো নিজের অবস্থান নিয়ে। আবার অন্য কেউ একটু ভালো থাকলে, একটু এগিয়ে গেলে কিংবা মানুষের কাছে একটু বেশি সম্মান পেলে আমাদের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্বস্তি তৈরি হয়।

file_000000005ab08211b759df034561c8e5.png

আমরা মুখে বলি—“অন্যের ভালো চাই।”

কিন্তু সত্যিই কি আমরা অন্যের ভালো চাই?

কেউ নতুন বাড়ি বানালে আমরা অভিনন্দন জানাই, কিন্তু মনে মনে ভাবি, “আমার তো এখনো হলো না।”
কেউ নতুন গাড়ি কিনলে হাসিমুখে শুভেচ্ছা দিই, অথচ ভেতরে একটা কষ্ট জন্ম নেয়।
কেউ ভালো চাকরি পেলে বলি, “ভালো হয়েছে”, কিন্তু মনে মনে তার ভাগ্যকে দোষ দিই।
কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালো কিছু অর্জনের ছবি দিলে আমরা লাইক দিই, অথচ নিজের জীবনের সঙ্গে তার জীবন তুলনা করে মন খারাপ করি।

এটাই কি মানুষের জীবন?

আমরা কি সত্যিই অন্যের সুখে সুখী হতে ভুলে যাচ্ছি?

অহংকার অনেক সময় মানুষের নিজের সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা থেকে জন্ম নেয়। মানুষ যখন কিছু অর্জন করে, তখন তার মনে হয়—“আমি অন্যদের চেয়ে আলাদা।” এই আলাদা হওয়ার অনুভূতিটা যদি আত্মবিশ্বাসের মধ্যে থাকে, তাহলে সেটি সুন্দর। কিন্তু যখন সেটি অন্য মানুষকে ছোট করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটিই অহংকার।

অর্থ থাকলে মানুষ অহংকার করে।

ক্ষমতা থাকলে অহংকার করে।

সৌন্দর্য থাকলে অহংকার করে।

শিক্ষা থাকলে অহংকার করে।

পরিচিতি থাকলে অহংকার করে।

এমনকি কখনো কখনো নিজের সামান্য জ্ঞান নিয়েও মানুষ এমনভাবে কথা বলে, যেন পৃথিবীর সব জ্ঞান তার একার কাছে রয়েছে।

কিন্তু আমরা ভুলে যাই—আজ যে অবস্থানে আছি, আগামীকাল সেই অবস্থানে নাও থাকতে পারি।

আজ যে মানুষকে আমরা তুচ্ছ করছি, কাল হয়তো তার কাছেই সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে।

আজ যে মানুষকে আমরা নিচু চোখে দেখছি, আগামীকাল হয়তো সেই মানুষটাই আমাদের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

জীবন কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।

সময়ের চাকা ঘুরতেই থাকে।

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো আমরা নিজেদের বর্তমান অবস্থাকে স্থায়ী মনে করি।

যে মানুষ আজ ধনী, সে মনে করে তার অর্থ সবসময় থাকবে।

যে মানুষ আজ ক্ষমতাবান, সে মনে করে তার ক্ষমতা কখনো শেষ হবে না।

যে মানুষ আজ জনপ্রিয়, সে মনে করে মানুষ সারাজীবন তাকে মনে রাখবে।

কিন্তু ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে—কোনো অবস্থাই স্থায়ী নয়।

একদিন যে মানুষকে সবাই ঘিরে রাখে, একসময় হয়তো তার পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষও থাকে না।

একদিন যে বাড়িতে মানুষের ভিড় থাকে, একসময় সেখানে নীরবতা নেমে আসে।

একদিন যে নামটি সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করে, সময়ের সঙ্গে সেই নামও মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে পারে।

তাহলে এত অহংকার কিসের?

অর্থ?

অর্থ তো সঙ্গে যাবে না।

সৌন্দর্য?

সৌন্দর্যও একদিন বয়সের কাছে হার মানবে।

ক্ষমতা?

ক্ষমতাও একদিন অন্য কারও হাতে চলে যাবে।

খ্যাতি?

খ্যাতিও সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়।

তাহলে শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে কী থাকে?

তার ব্যবহার।

তার ভালো কাজ।

তার ভালোবাসা।

তার রেখে যাওয়া স্মৃতি।

অহংকার যেমন মানুষকে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, হিংসা তেমনি মানুষকে নিজের কাছ থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়।
হিংসুক মানুষ অন্যের ক্ষতি করার আগে নিজের শান্তি নষ্ট করে।
সে অন্যের জীবন নিয়ে ভাবে।

অন্যের সাফল্য নিয়ে ভাবে।

অন্যের সম্পর্ক নিয়ে ভাবে।

অন্যের টাকা-পয়সা নিয়ে ভাবে।

অন্যের পোশাক, বাড়ি, গাড়ি, কাজ—সবকিছুর সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করে।

ফলে সে নিজের জীবনের সৌন্দর্য দেখতে পায় না।

তার নিজের ঘরে হয়তো শান্তি আছে, কিন্তু সে পাশের মানুষের বড় বাড়ির দিকে তাকিয়ে নিজের ঘরকে ছোট মনে করে।

তার নিজের হাতে হয়তো প্রয়োজন মেটানোর মতো টাকা আছে, কিন্তু সে অন্যের বেশি টাকা দেখে নিজেকে দরিদ্র মনে করে।

তার নিজের পরিবার হয়তো তাকে ভালোবাসে, কিন্তু সে অন্যের সুন্দর পরিবার দেখে নিজের পরিবারকে নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে যায়।

অথচ সে জানে না—যে মানুষটাকে দেখে সে হিংসা করছে, সেই মানুষটিও হয়তো তার জীবনের কোনো একটি বিষয় দেখে হিংসা করছে।

এটাই জীবনের অদ্ভুত বাস্তবতা।

আমরা সবাই অন্য কারও জীবনের এমন একটি অংশ দেখে হিংসা করি, যেটা তার পুরো জীবনের গল্প নয়।

অহংকার করে কাউকে ছোট করবেন না।
হিংসা করে নিজের শান্তি নষ্ট করবেন না।
অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ ভাববেন না।
কারও সাফল্য দেখে কষ্ট না পেয়ে তাকে অভিনন্দন জানাতে শিখুন।
কারও কষ্ট দেখলে হাসার বদলে পাশে দাঁড়াতে শিখুন।
ভুল হলে ক্ষমা চাইতে শিখুন।
অন্যের ভুল হলে ক্ষমা করতে শিখুন।
কারণ জীবন খুব ছোট।
আজ আমরা যাদের সঙ্গে কথা বলছি, তাদের মধ্যে কেউ হয়তো কাল আমাদের জীবনে থাকবে না।
আজ যে সুযোগ আছে, কাল হয়তো সেটাও থাকবে না।
তাই যতদিন বেঁচে আছি, মানুষের প্রতি একটু ভালোবাসা, একটু সম্মান আর একটু সহানুভূতি নিয়ে বাঁচি।
অন্যকে হারিয়ে নয়—নিজেকে বদলে বড় হই।
অন্যের জীবনকে ছোট করে নয়—নিজের চরিত্রকে বড় করে বাঁচি।
শেষ পর্যন্ত মানুষ তার সম্পদ দিয়ে নয়, তার মানবিকতা দিয়ে মানুষের মনে বেঁচে থাকে।