শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সময়ের গল্প
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
আমরা সাধারণত ভাবি, একজন মানুষের জীবন শুরু হয়েছে তার জন্মের দিন থেকে। জন্মের পর থেকেই শরীর বড় হয়েছে, কোষ তৈরি হয়েছে, পুরোনো কোষ নষ্ট হয়েছে—এভাবেই শরীর বদলেছে। কিন্তু আপনার শরীর নিয়ে একটি অবাক করা সত্য হলো, আপনার শরীরের কিছু কোষ বা কোষের বংশধর আপনার জন্মের আগেই তৈরি হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ আপনি যখন পৃথিবীর আলো দেখেননি, তখনই আপনার শরীরের কিছু অংশের যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিষয়টি শুনতে একটু অবিশ্বাস্য লাগলেও জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর পেছনে রয়েছে কোষের দীর্ঘ জীবন, ধীরগতির পরিবর্তন এবং শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর নিজস্ব পুনর্গঠন প্রক্রিয়া।আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের আয়ু একরকম নয়। কিছু কোষ কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন বেঁচে থাকে, কিছু কয়েক মাস বা কয়েক বছর, আবার কিছু কোষ অনেক দশক ধরে টিকে থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আমাদের রক্তের লোহিত কণিকাগুলো সাধারণত কয়েক মাসের মতো বেঁচে থাকে। এরপর পুরোনো কোষগুলো সরিয়ে নতুন কোষ তৈরি হয়। ত্বকের কোষও নিয়মিতভাবে বদলে যায়। ফলে আজ আপনার ত্বকে থাকা অনেক কোষ হয়তো কয়েক সপ্তাহ বা মাস আগে ছিল না। শরীর যেন প্রতিনিয়ত নিজের কিছু অংশ মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করে চলেছে।কিন্তু সব কোষের গল্প এমন নয়। আমাদের শরীরে এমন কিছু কোষ আছে যেগুলো অত্যন্ত দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের কিছু নিউরন বা স্নায়ুকোষের আয়ু অনেক দীর্ঘ হতে পারে। মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের নিউরন শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। তাই আপনার শরীরের অন্য অনেক কোষ যখন বারবার বদলে যাচ্ছে, তখন কিছু স্নায়ুকোষ হয়তো আপনার জীবনের বহু বছরের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে একই শরীরে থেকে যাচ্ছে।এখানে একটি বিষয় বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ—“জন্মের আগের কোষ” বললেই এমনটা বোঝায় না যে আপনার শরীরের কোনো কোষ নিশ্চয়ই আপনার মায়ের গর্ভে তৈরি হওয়ার সময় থেকে আজ পর্যন্ত একেবারে অপরিবর্তিত অবস্থায় আছে। কোষের বিভাজন, বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জৈবিক পরিবর্তন অত্যন্ত জটিল। কোনো কোষ বা তার বংশধর দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে, কিন্তু সেটি সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও যেতে পারে। তাই বিষয়টিকে সরলভাবে “একই কোষ সারাজীবন বেঁচে আছে” বলা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়।তবে মানুষের শরীরে এমন কিছু কোষের বংশধর রয়েছে, যাদের ইতিহাস জন্মের আগের সময় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদাহরণগুলোর একটি হলো মস্তিষ্কের কিছু নিউরন। ভ্রূণের বিকাশের সময় মস্তিষ্কে বিপুল সংখ্যক নিউরন তৈরি হতে শুরু করে। জন্মের পর মস্তিষ্কের বিকাশ চলতে থাকে, সংযোগগুলো আরও পরিণত হয় এবং নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্র বদলাতে থাকে। কিন্তু অনেক নিউরন দীর্ঘদিন টিকে থাকে। ফলে আপনার শৈশব, কৈশোর এবং পরবর্তী জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সময়ও আপনার মস্তিষ্কের কিছু পুরোনো নিউরন সেখানে উপস্থিত থাকতে পারে।আরেকটি বিস্ময়কর বিষয় হলো চোখের লেন্সের কিছু কোষ। লেন্সের কেন্দ্রীয় অংশে থাকা কিছু কোষ ও তাদের অবশিষ্ট উপাদান অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে। মানুষের শরীরের অন্যান্য অনেক টিস্যুর তুলনায় এগুলোর পরিবর্তনের ধরন একেবারেই আলাদা। অর্থাৎ শরীরের ভেতরে এমন কিছু কাঠামো রয়েছে, যেগুলোর ইতিহাস আমাদের জীবনের অনেক পুরোনো সময় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।এখন প্রশ্ন আসতে পারে—যদি শরীরের কোষগুলো এত দ্রুত বদলে যায়, তাহলে আমরা একই মানুষ হিসেবে থাকি কীভাবে? এখানেই জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর বিষয়গুলোর একটি রয়েছে। মানুষ শুধু কোষের একটি স্থির সমষ্টি নয়। আমাদের শরীর হলো একটি চলমান ব্যবস্থা। কোষ আসে, বদলায়, বিভাজিত হয়, মারা যায় এবং নতুন কোষ তাদের জায়গা নেয়। কিন্তু একই সঙ্গে শরীরের জিনগত নির্দেশনা, টিস্যুর কাঠামো এবং কোষগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। তাই শরীরের অনেক অংশ বদলালেও আমরা নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলি না।এটাকে অনেকটা একটি পুরোনো শহরের সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি শহরের অনেক বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি তৈরি হয়, রাস্তা বদলায়, মানুষ বদলায়, গাছ কাটা হয়, নতুন গাছ লাগানো হয়। তারপরও শহরটির একটি ধারাবাহিক পরিচয় থাকে। আমাদের শরীরও অনেকটা তেমন। এর ভেতরে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন চলছে, কিন্তু পুরো ব্যবস্থাটি একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।আরও মজার বিষয় হলো, মানুষের শরীর শুধু জন্মের পর পরিবর্তিত হয় না। জন্মের আগেই শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যায়। ভ্রূণের বিকাশের সময় কোষগুলো বিভাজিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের কোষে পরিণত হয়। কেউ স্নায়ুকোষ হয়, কেউ পেশিকোষ, কেউ রক্তের কোষ, কেউ হাড় বা ত্বকের অংশের ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ জন্মের মুহূর্তে আমরা একটি “সম্পূর্ণ নতুন” শরীর নিয়ে শুরু করি না; বরং জন্মের আগেই শরীরের বিশাল একটি নির্মাণপ্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়ে যায়।এমনকি আপনার শরীরের কিছু কোষের ইতিহাস শুধু জন্মের আগেই থেমে নেই। তাদের বংশধারার ইতিহাস আরও পেছনে যেতে পারে—ভ্রূণের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত। অর্থাৎ আপনি পৃথিবীতে আসার আগে আপনার শরীরের ভেতরে এমন একটি জৈবিক গল্প শুরু হয়েছিল, যার পরবর্তী অধ্যায় আপনি আজ বহন করছেন।তবে এর মানে এই নয় যে আমাদের শরীরের সব কোষ জন্মের আগের। বরং বাস্তবতা হলো, শরীরের বিভিন্ন কোষের আয়ু এবং পুনর্নবীকরণের হার একেবারেই আলাদা। কিছু কোষ দ্রুত বদলায়, কিছু ধীরে বদলায়, আর কিছু অত্যন্ত দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। তাই “আমাদের শরীরের সব কোষ কয়েক বছর পরপর সম্পূর্ণ বদলে যায়”—এই প্রচলিত ধারণাটিও অতিরিক্ত সরলীকরণ।সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, আপনার শরীর আসলে একটি চলমান ইতিহাস। আপনার ত্বকের কোনো কোষ হয়তো খুব অল্পদিনের, আপনার রক্তের কোনো কোষ কয়েক মাসের, আবার আপনার মস্তিষ্কের কোনো দীর্ঘজীবী নিউরনের ইতিহাস হয়তো আপনার জীবনের বহু বছরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একই শরীরের ভেতরে তাই নতুন আর পুরোনোর এক অদ্ভুত সহাবস্থান চলছে।তাই পরেরবার আয়নায় নিজের দিকে তাকালে একটু অন্যভাবে ভাবতে পারেন। আপনি শুধু আজকের তৈরি একজন মানুষ নন। আপনার শরীরের ভেতরে এমন কিছু কোষ ও কোষের বংশধারা থাকতে পারে, যাদের গল্প আপনার জন্মেরও আগে শুরু হয়েছিল। তারা আপনার শৈশব দেখেছে, আপনার পরিবর্তন দেখেছে, আপনার অভিজ্ঞতার সময় আপনার শরীরের অংশ হিসেবে থেকেছে।আমাদের শরীর তাই শুধু জীবন্ত একটি কাঠামো নয়—এটি সময়েরও একটি জীবন্ত আর্কাইভ।কিছু অংশ প্রতিনিয়ত নতুন হচ্ছে, কিছু অংশ ধীরে বদলাচ্ছে, আর কিছু অংশ আমাদের জীবনের বহু পুরোনো অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকতে পারে।ভাবতে অবাক লাগে—পৃথিবীতে আসার আগেই আমাদের শরীরের গল্প শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমরা জন্মের দিন থেকে শুধু সেই গল্পের নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করেছি।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

