মস্তিষ্ক কীভাবে বুঝে কোন স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা ভুলে যেতে হবে?

in আমার বাংলা ব্লগ • 22 days ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।




6105031708026540857.jpg

আমাদের জীবনে প্রতিদিন কত কিছু ঘটে—কত মানুষের সঙ্গে কথা বলি, কত রাস্তা দিয়ে হাঁটি, কত শব্দ শুনি, কত মুখ দেখি, কত কথা মনে আসে আবার কিছুক্ষণ পরেই হারিয়ে যায়। আপনি হয়তো আজ সকালে নাশতায় কী খেয়েছেন তা কয়েক দিন পর মনে করতে পারবেন না, কিন্তু কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনো ছোট্ট ঘটনা এখনও স্পষ্টভাবে মনে থাকতে পারে। কোনো একটি কথায় আজও মন খারাপ হয়ে যায়, আবার এমন অনেক দিনের কথা আছে যেগুলো যেন কখনো ঘটেইনি। প্রশ্ন হলো, মস্তিষ্ক কীভাবে ঠিক করে কোন স্মৃতি রেখে দিতে হবে আর কোনটি ধীরে ধীরে ভুলে যেতে হবে? আসলে মস্তিষ্কের কাছে প্রতিটি ঘটনা সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে প্রতিনিয়ত তথ্য বাছাই, সংরক্ষণ এবং বাদ দেওয়ার এক বিশাল কাজ করে যাচ্ছে।আমরা ভাবি স্মৃতি মানে হয়তো মস্তিষ্কের ভেতরে কোনো ঘটনার একটি ছবি জমা হয়ে থাকা। কিন্তু বাস্তবে স্মৃতি এত সরল নয়। আমরা যখন কোনো ঘটনা অনুভব করি, তখন তার দৃশ্য, শব্দ, অনুভূতি, স্থান, সময় এবং সেই মুহূর্তের আবেগ—সবকিছু মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে প্রক্রিয়াজাত হয়। পরে প্রয়োজন হলে মস্তিষ্ক সেই বিভিন্ন তথ্য একত্র করে ঘটনাটিকে আবার মনে করিয়ে দেয়। অর্থাৎ স্মৃতি হলো কোনো ঘটনার নিখুঁত ভিডিও নয়; বরং মস্তিষ্কের তৈরি ও পুনর্গঠিত একটি অভিজ্ঞতা।এখন প্রশ্ন আসে, এত বিপুল তথ্যের মধ্যে মস্তিষ্ক কীভাবে বেছে নেয় কোনটি মনে রাখা দরকার? এর একটি বড় উত্তর হলো মনোযোগ। আমরা কোনো কিছুর দিকে যত বেশি মনোযোগ দিই, সেটি মনে থাকার সম্ভাবনাও সাধারণত তত বেশি হয়। আপনি যদি ক্লাসে শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তাহলে বিষয়টি পরে মনে থাকার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু একই সময়ে যদি আপনার মন অন্য কোথাও থাকে, তাহলে শিক্ষক কী বলেছিলেন তার অনেকটাই পরে মনে নাও থাকতে পারে। কারণ মস্তিষ্ক সব তথ্যকে সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে না।তবে শুধু মনোযোগই যথেষ্ট নয়। আবেগও স্মৃতির শক্তি বাড়াতে পারে। কোনো ঘটনা যদি আমাদের খুব আনন্দ দেয়, অবাক করে, ভয় পাইয়ে দেয় বা গভীরভাবে নাড়া দেয়, তাহলে সেটি অনেক সময় সাধারণ দিনের ঘটনার তুলনায় বেশি শক্তভাবে মনে গেঁথে যায়। যেমন, জীবনের কোনো বিশেষ অর্জনের দিন, কোনো গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে প্রথম দেখা, হঠাৎ পাওয়া কোনো সুখবর কিংবা খুব অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা বহু বছর পরও মনে থাকতে পারে। কারণ সেই মুহূর্তে আবেগ মস্তিষ্ককে সংকেত দেয়—“এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ।”একই কারণে ছোট কোনো ঘটনাও কখনো বিশাল স্মৃতিতে পরিণত হয়। ধরুন, বহু বছর আগে কোনো শিক্ষক আপনাকে একটি সাধারণ কথা বলেছিলেন। কথাটি হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ছিল, কিন্তু সেটি আপনার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। আজও হয়তো আপনি সেই মুহূর্তটি মনে করতে পারেন। অন্যদিকে সেই সময়ের অসংখ্য সাধারণ দিনের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেছেন। কারণ মস্তিষ্ক প্রতিটি দিনকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করে না; বরং যেসব অভিজ্ঞতার ব্যক্তিগত অর্থ বেশি, সেগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে।নতুনত্বও স্মৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন একই কাজ করতে করতে আমাদের মস্তিষ্ক অনেক বিষয়কে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলে। আপনি প্রতিদিন নিজের ঘরের দরজা খোলেন, একই পথে হাঁটেন, পরিচিত জায়গা দেখেন। এসব কাজের প্রতিটি মুহূর্ত আলাদা করে মনে রাখার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কোনোদিন সেই পরিচিত জায়গায় অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে সেটি আপনার মনে বেশি জায়গা করে নিতে পারে। কারণ নতুন বা অপ্রত্যাশিত ঘটনা মস্তিষ্কের মনোযোগ আকর্ষণ করে।এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রয়োজনীয়তা। কোনো তথ্য ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে বলে মনে হলে মস্তিষ্ক সেটিকে ধরে রাখার দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। আপনি যদি কোনো পরীক্ষার জন্য একটি বিষয় পড়েন, তাহলে সেটি মনে রাখার জন্য বারবার অনুশীলন করেন। একইভাবে কোনো কাজ করতে গিয়ে ভুল হলে এবং সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিলে ঘটনাটি মনে থাকতে পারে। কারণ মস্তিষ্ক বুঝতে পারে, ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতিতে এই তথ্য কাজে লাগতে পারে।এখানে পুনরাবৃত্তির ভূমিকাও অনেক বড়। কোনো তথ্য একবার শুনে ভুলে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু একই তথ্য বারবার মনে করা, ব্যবহার করা বা অনুশীলন করা হলে সেটি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী স্মৃতিতে পরিণত হতে পারে। আপনি ছোটবেলায় বারবার যে কবিতা পড়েছেন, যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে গেছেন কিংবা যে ভাষায় নিয়মিত কথা বলেন—এসব সহজে ভুলে যান না। কারণ পুনরাবৃত্তি মস্তিষ্ককে বোঝায় যে তথ্যটি ব্যবহারযোগ্য এবং ধরে রাখা দরকার।অন্যদিকে যে তথ্য দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয় না, সেটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এটিই আমাদের ভুলে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। আমরা অনেক সময় মনে করি ভুলে যাওয়া মানেই মস্তিষ্কের দুর্বলতা। কিন্তু আসলে ভুলে যাওয়ার ক্ষমতাও আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়। যদি জীবনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি মুখ, প্রতিটি দৃশ্য এবং প্রতিটি ছোট ঘটনা সমানভাবে মনে থেকে যেত, তাহলে নতুন তথ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিষয় খুঁজে বের করাই কঠিন হয়ে যেত।
ভাবুন, আপনি যদি পাঁচ বছর আগে প্রতিদিন রাস্তায় দেখা প্রতিটি মানুষের মুখ, প্রতিটি গাড়ির নম্বর, প্রতিটি দোকানের অবস্থান এবং প্রতিটি কথোপকথন হুবহু মনে রাখতে পারতেন! তাহলে আপনার মস্তিষ্কে তথ্যের পরিমাণ কত বিশাল হতো। প্রয়োজনীয় তথ্যের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় তথ্যও জমে থাকত। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারত। তাই ভুলে যাওয়া অনেকটা মস্তিষ্কের তথ্য ব্যবস্থাপনার একটি স্বাভাবিক উপায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুম। আমরা যখন ঘুমাই, তখন মস্তিষ্ক পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকে না। দিনের শেখা ও অভিজ্ঞতার তথ্যকে মস্তিষ্ক বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করে। কিছু স্মৃতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হতে পারে, আবার কিছু তথ্যের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। তাই কোনো বিষয় ভালোভাবে শেখার পর পর্যাপ্ত ঘুম শেখা তথ্যকে মনে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।মস্তিষ্ক আবার পুরোনো স্মৃতি ও নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে। আপনি কোনো নতুন তথ্য যদি আগে জানা কোনো বিষয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন, তাহলে সেটি মনে রাখা সহজ হতে পারে। ধরুন, আপনি নতুন একটি জায়গার নাম শুনলেন, আর নামটি আপনার পরিচিত কোনো জায়গার নামের সঙ্গে মিল আছে। মস্তিষ্ক সেই সম্পর্ক ব্যবহার করে নতুন তথ্যটিকে আগের জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। এভাবেই আমাদের স্মৃতির জাল ক্রমে বড় হতে থাকে।তবে স্মৃতি সবসময় নির্ভুল নয়। কোনো ঘটনা যতবার আমরা মনে করি, ততবারই সেটি সামান্য পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ থাকে। আমরা অনেক সময় নিজের বর্তমান জ্ঞান, অনুভূতি ও পরবর্তী অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোনো স্মৃতিকে মিশিয়ে ফেলি। ফলে বহু বছর আগের কোনো ঘটনা সম্পর্কে আমাদের আত্মবিশ্বাস খুব বেশি থাকলেও স্মৃতির প্রতিটি অংশ যে হুবহু সঠিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ মস্তিষ্ক স্মৃতিকে শুধু সংরক্ষণ করে না; প্রয়োজনের সময় সেটিকে পুনর্গঠনও করে।আরেকটি চমৎকার ব্যাপার হলো, কোনো স্মৃতি কখনো সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে বলে মনে হলেও পরে কোনো শব্দ, গন্ধ, ছবি বা জায়গা সেটিকে হঠাৎ মনে করিয়ে দিতে পারে। একটি পুরোনো গান শুনে শৈশবের কোনো দুপুর মনে পড়ে যাওয়া, পরিচিত কোনো গন্ধে পুরোনো কোনো জায়গার কথা মনে পড়া কিংবা বহু বছর পর কোনো মানুষের মুখ দেখে হঠাৎ একটি ঘটনা মনে পড়ে যাওয়া—এসবের পেছনে স্মৃতির সঙ্গে বিভিন্ন অনুভূতির সংযোগ কাজ করতে পারে।তাহলে মস্তিষ্কের কাছে “গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি” বলতে আসলে কী বোঝায়? সাধারণভাবে যেসব তথ্য আমাদের কাছে অর্থপূর্ণ, আবেগপূর্ণ, নতুন, বারবার ব্যবহৃত বা ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়—সেগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। আর যেসব তথ্যের সঙ্গে আমাদের মনোযোগ, ব্যবহার বা ব্যক্তিগত অর্থের সম্পর্ক কম, সেগুলো সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।তবে মস্তিষ্কের এই বাছাই কোনো নিখুঁত তালিকা অনুযায়ী চলে না। কখনো এমন একটি ঘটনা আমরা ভুলে যাই যা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আবার এমন একটি তুচ্ছ বিষয় মনে থেকে যায় যার কোনো বিশেষ প্রয়োজন নেই। কারণ মানুষের স্মৃতি কোনো কম্পিউটারের ফাইলের মতো কাজ করে না। এখানে আবেগ, মনোযোগ, ঘুম, অভিজ্ঞতা, পুনরাবৃত্তি এবং ব্যক্তিগত অর্থ—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে।সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, ভুলে যাওয়া আমাদের স্মৃতির শত্রু নয়; বরং স্মৃতির স্বাভাবিক অংশ।মস্তিষ্ক যদি সবকিছু জমিয়ে রাখত, তাহলে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও তথ্যের বিশাল ভিড়ে হারিয়ে যেত। ভুলে যাওয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্ক অনেক অপ্রয়োজনীয় তথ্যের গুরুত্ব কমিয়ে দেয় এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য জায়গা তৈরি করে।তাই কোনো পুরোনো ঘটনা আজও কেন মনে আছে, আর গতকাল কী খেয়েছিলেন তা কেন মনে নেই—এর উত্তর শুধু “মনে রাখার ক্ষমতা” দিয়ে বোঝানো যায় না। আপনার মস্তিষ্ক প্রতিটি মুহূর্তে নীরবে বিচার করছে—কোন তথ্যের সঙ্গে আবেগ জড়িত, কোনটি বারবার প্রয়োজন হচ্ছে, কোনটি নতুন, কোনটি ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে এবং কোনটি আর তেমন দরকার নেই।

শেষ পর্যন্ত আমাদের স্মৃতি আসলে আমাদের জীবনের একটি বাছাই করা গল্প। প্রতিটি মুহূর্ত সেখানে জায়গা পায় না। কিছু ঘটনা থেকে যায়, কিছু ঝাপসা হয়ে যায়, কিছু হারিয়ে যায়, আবার কিছু বহু বছর পর হঠাৎ ফিরে আসে। আর এই বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই মস্তিষ্ক আমাদের অতীতকে এমনভাবে সাজিয়ে রাখে, যাতে আমরা বর্তমানকে বুঝতে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে পারি।হয়তো তাই ভুলে যাওয়া নিয়ে আফসোস করার আগে একবার ভাবা উচিত—মস্তিষ্ক হয়তো কোনো স্মৃতি মুছে ফেলছে না; সে শুধু ঠিক করছে কোন স্মৃতিকে সামনে রাখবে আর কোনটিকে পেছনে সরিয়ে রাখবে। কারণ সবকিছু মনে রাখা নয়, বরং প্রয়োজনের সময়ে প্রয়োজনীয় জিনিস মনে রাখতে পারাটাই মানুষের স্মৃতির সবচেয়ে আশ্চর্য ক্ষমতাগুলোর একটি।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png