সময় থাকতে সময়ের মূল্য দাও
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
মানুষের জীবনে সময়ের গুরুত্ব কতখানি, তা বলে শেষ করা সম্ভব নয়। আমরা আমাদের চারপাশে তাকালে দেখি কেউ অনেক সফল, আবার কেউ ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। এই সফল আর ব্যর্থ মানুষের মধ্যে তফাৎ গড়ে দেয় কেবল 'সময়'। সময় এমন এক অদ্ভুত জিনিস যা কারোর জন্য এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করে না। ঘড়ির কাঁটা তার আপন গতিতে চলে যায়, আর আমাদের জীবন থেকে একেকটি মুহূর্ত চিরতরে হারিয়ে যায়। টাকা-পয়সা বা ধন-সম্পদ হারালে তা কঠোর পরিশ্রমে ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু জীবনের হারানো সময় পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ দিয়েও এক মুহূর্তের জন্য ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই বলা হয়, সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশ ফোঁড়।
আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো 'প্রোক্রাস্টিনেশন' বা কাজ জমিয়ে রাখা। আমরা মনে করি, "আজ তো অনেক সময় আছে, কাজটা কাল করলেই হবে।" এই 'কাল' শব্দটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু। কাল আসলে কোনোদিন আসে না। প্রতিটি দিন তার নিজের সুযোগ আর সম্ভাবনা নিয়ে আসে। যখন আমরা আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখি, তখন আগামীকালের কাজের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে কোনো কাজই আর নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয় না। অলসতা আমাদের মগজে এমনভাবে বাসা বাঁধে যে আমরা বুঝতেও পারি না কখন আমরা জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো অবহেলায় পার করে দিয়েছি। যারা অলসতায় দিন কাটায়, সময় একসময় তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
ছাত্রজীবনে সময়ের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এই সময়টা হলো বীজ বপন করার সময়। এই সময়ে যে ছাত্র সময়ের সঠিক ব্যবহার করে প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করে, সেই ভবিষ্যতে সাফল্যের শিখরে পৌঁছায়। অন্যদিকে, যে ছাত্র মনে করে পরীক্ষার আগে পড়ে সব শেষ করে ফেলবে, সে আসলে নিজেকেই ফাঁকি দিচ্ছে। শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে হয়তো পরীক্ষায় পাস করা যায়, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হয় না। জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য যে প্রস্তুতির প্রয়োজন, তা কেবল সময়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। কেবল ছাত্রজীবন নয়, কর্মজীবনেও সময়ানুবর্তিতা অত্যন্ত জরুরি। একজন দায়িত্বশীল মানুষ কখনোই তার কর্মক্ষেত্রে দেরি করেন না। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা কেবল পেশাদারিত্ব নয়, এটি একজন মানুষের চরিত্রের সততার বহিঃপ্রকাশও বটে।
সময়ের মূল্য কেবল ক্যারিয়ার বা টাকা উপার্জনের জন্য নয়, আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখার জন্যেও এটি জরুরি। আমরা ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়ে অনেক সময় পরিবারকে সময় দিতে ভুলে যাই। আমরা ভাবি, আগে প্রতিষ্ঠিত হই, তারপর বাবা-মা বা সন্তানদের সময় দেব। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। আপনি যখন প্রতিষ্ঠিত হবেন, তখন হয়তো আপনার বাবা-মা আর বেঁচে নেই, কিংবা আপনার সন্তান বড় হয়ে নিজের আলাদা জগত তৈরি করে ফেলেছে। তখন আপনার হাতে অনেক সময় থাকলেও সেই পুরনো মুহূর্তগুলো ফিরে পাওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোনো বিশেষ দিন বা সময়ের দরকার নেই; প্রিয় মানুষকে প্রতিদিন অল্প একটু সময় দেওয়াটাই হলো বড় উপহার। মানুষ পাশে থাকতে তার কদর করা শিখতে হয়।
প্রকৃতির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই তারা কতটা সময়নিষ্ঠ। সূর্য প্রতিদিন ঠিক সময়ে উদিত হয় এবং অস্ত যায়। ঋতুগুলো নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসে। যদি প্রকৃতি তার সময় মেনে না চলত, তবে এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত। আমরা প্রকৃতির অংশ হয়েও কেন সময়ের অবহেলা করি? আমাদের গড় আয়ু খুবই সীমিত। এই ক্ষুদ্র জীবনে আমাদের অনেক কিছু করার থাকে, অনেক স্বপ্ন পূরণের থাকে। যদি আমরা দিনের অর্ধেক সময় ঘুমিয়ে বা অহেতুক আড্ডায় নষ্ট করি, তবে আমাদের সেই স্বপ্নগুলো কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে। প্রতিটি সফল মানুষের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তারা ঘুমের চেয়ে তাদের কাজকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তারা জানতেন যে প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব তাদের দিতে হবে।
অনেকেই অভিযোগ করেন যে তারা কাজ করার পর্যাপ্ত সময় পান না। কিন্তু আসল সমস্যা সময়ের অভাব নয়, সমস্যা হলো সময়ের অপচয়। আধুনিক যুগে স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সময়ের বড় একটা অংশ কেড়ে নিচ্ছে। আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা ফেসবুক বা ইউটিউবে স্ক্রল করে কাটিয়ে দিই, যা আমাদের জীবনে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না। দিনের শেষে যখন আমরা হিসাব করি, তখন দেখি কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমাদের উচিত প্রতিদিনের একটি রুটিন বা পরিকল্পনা তৈরি করা। কোন কাজটা বেশি জরুরি আর কোনটা পরে করলেও চলবে, তা আগে থেকে নির্ধারণ করে নিলে সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয়।
সময়ের সঠিক ব্যবহার মানেই সারাদিন কেবল রোবটের মতো কাজ করা নয়। বিশ্রাম, বিনোদন এবং নিজের শখের কাজ করার জন্যও সময়ের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সবকিছুই হওয়া উচিত নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে। অতি বিনোদন যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতি বিশ্রাম মানুষকে কর্মবিমুখ করে তোলে। সময়কে যে বশ করতে পারে, সেই আসলে পৃথিবী জয় করতে পারে। সময়ের সদ্ব্যবহার মানুষকে মানসিক শান্তি দেয়। যখন আপনি জানেন যে আপনার আজকের কাজগুলো আপনি সফলভাবে শেষ করেছেন, তখন আপনার মনে এক ধরণের আত্মতৃপ্তি কাজ করবে। এই তৃপ্তি আপনাকে পরের দিনের কাজের জন্য নতুন শক্তি যোগাবে।
পরিশেষে, আমাদের মনে রাখা উচিত যে মৃত্যু আমাদের খুব কাছে। যেকোনো মুহূর্তে আমাদের জীবনের প্রদীপ নিভে যেতে পারে। এই ছোট জীবনে আফসোস নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। "যদি সেদিন কাজটা করতাম" বা "যদি তখন সময়টা নষ্ট না করতাম"—এই আক্ষেপগুলো বড় কষ্টের। অতীত নিয়ে পড়ে থেকে কোনো লাভ নেই, কারণ অতীত মৃত। বর্তমানই আমাদের একমাত্র সম্পদ। বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্তকে যদি আমরা সম্মানের সাথে কাজে লাগাই, তবে ভবিষ্যৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উজ্জ্বল হবে। সময় থাকতে সময়ের মূল্য দেওয়াটাই জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা। আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করুন, একটি মুহূর্তও আর নষ্ট করবেন না। কারণ সময় বয়ে যায় এবং তা কারোর জন্যই ফিরে আসে না। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং দেশের জন্য সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই হোক আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


