The Song of Sparrows (2008): হালাল উপার্জনের গুরুত্ব, ..
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।



মাজিদ মজিদির 'দ্য সং অফ স্প্যারোস' (The Song of Sparrows) বা মূল ফার্সি ভাষায় 'আভাজ-এ গঞ্জেশখ-হা' কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি মানুষের আত্মার এক নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ। এটি এমন এক গল্প যা আমাদের চোখের সামনের পর্দা সরিয়ে দেখিয়ে দেয় কীভাবে শহরের যান্ত্রিকতা, সামান্য লোভ এবং বস্তুবাদ মানুষের ভেতরের শান্ত, সুন্দর আত্মাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয়।আজ আমি এই অসাধারণ মুভিটির গল্প এমনভাবে আপনার সামনে তুলে ধরব, যেন আমরা দুজন বসে মুভিটির প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এবং প্রতিটি হাসি একসাথে অনুভব করছি।
শুরু: শান্ত গ্রামের জীবন এবং একটি অবাধ্য উটপাখি
গল্পের শুরুটা হয় তেহরানের উপকণ্ঠে এক শান্ত, ছিমছাম গ্রামে। আমাদের গল্পের নায়ক করিম একজন অতি সাধারণ, সৎ এবং পরিশ্রমী মানুষ। সে একটি উটপাখির খামারে কাজ করে। করিমের জীবন তার স্ত্রী নার্গিস, দুই মেয়ে এবং এক ছেলে হুসেইনকে ঘিরেই আবর্তিত। তাদের বড় মেয়ে হানিয়ের কানে শোনার যন্ত্র (Hearing aid) একদিন বাড়ির পাশের জলের চৌবাচ্চায় পড়ে হারিয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা মিলে কাদার মধ্যে সেই যন্ত্র খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা করে, যা দেখে বোঝা যায় পরিবারটিতে অভাব থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি নেই।
হানিয়ের যন্ত্রটি পাওয়া গেলেও সেটি আর কাজ করে না। এদিকে খামারে ঘটে যায় এক বিশাল বিপত্তি। করিমের অসাবধানতায় একটি উটপাখি খামার থেকে পালিয়ে যায়। করিম পাগলের মতো উটপাখিটিকে বিস্তীর্ণ অনুর্বর প্রান্তরে খুঁজতে থাকে। উটপাখির ছদ্মবেশ নিয়ে সে দিনের পর দিন খোঁজে, কিন্তু পাখিটি আর ফেরে না। এই ভুলের মাশুল হিসেবে করিমকে তার চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এই ঘটনাটি করিমের জীবনে এক গভীর অনিশ্চয়তা এবং হতাশা নিয়ে আসে।শহরের বুকে পা এবং এক নতুন পথের সন্ধান চাকরি হারানোর পর করিম সিদ্ধান্ত নেয় হানিয়ের নষ্ট হয়ে যাওয়া হিয়ারিং এইডটি ঠিক করার জন্য সে তেহরান শহরে যাবে। নিজের পুরোনো মোটরসাইকেলটি নিয়ে সে শহরের বিশাল যানজট আর কোলাহলের মাঝে এসে পড়ে। শহরের এই বিশৃঙ্খল রূপ করিমের মতো গ্রামের সহজ-সরল মানুষের কাছে একেবারেই অচেনা।রাস্তায় ঠিকানা খোঁজার সময় হঠাৎ এক ব্যবসায়ী তাড়াহুড়ো করে এসে করিমের বাইকের পেছনে বসে পড়ে এবং তাকে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিতে বলে। করিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে পৌঁছে দেয় এবং বিনিময়ে লোকটি তাকে বেশ কিছু টাকা দেয়। করিম বুঝতে পারে, এই শহরে তার মোটরসাইকেলটি দিয়ে সে যাত্রী পরিবহনের কাজ করে ভালো টাকা আয় করতে পারে। এখান থেকেই শুরু হয় করিমের এক নতুন জীবন, আর তার সাথে শুরু হয় তার আত্মার স্খলন।লোভের বীজ এবং আবর্জনার পাহাড় প্রতিদিন করিম গ্রাম থেকে তেহরান শহরে যায় আর বাইকে যাত্রী টানে। শহরের এই জীবনে সে এমন সব মানুষের সংস্পর্শে আসে, যারা সম্পদের পাহাড় গড়তে ব্যস্ত। শহরের বস্তুবাদ, মানুষের লোভ আর চাকচিক্য ধীরে ধীরে করিমের সহজ-সরল গ্রামীণ মনকে বিষাক্ত করে তোলে।সে শুধু টাকাই রোজগার করতে শুরু করে না, বরং শহরের মানুষ যেসব পুরোনো জিনিস ফেলে দেয়—যেমন ভাঙা জানালা, পুরোনো টিভি, ফ্রিজের দরজা, কেবল, অ্যান্টেনা—সেগুলো সে বাইকে করে তার গ্রামের বাড়িতে বয়ে আনতে থাকে। তার সুন্দর, পরিপাটি উঠোনটি ধীরে ধীরে শহরের ফেলে দেওয়া আবর্জনার এক বিশাল স্তূপে পরিণত হয়।এর সাথে সাথে করিমের ভেতরেও পরিবর্তন আসতে থাকে। যে করিম একসময় উদার ছিল, পরিবারের প্রতি যত্নশীল ছিল, সে এখন খিটখিটে, লোভী আর স্বার্থপর হয়ে ওঠে। কেউ তার জমানো আবর্জনা থেকে একটি পুরোনো দরজাও যদি ধার নিতে চায়, সে চরম দুর্ব্যবহার করে। সে তার স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে, সন্তানদের ধমক দেয়। তার ভেতরের সেই হালাল উপার্জনের তৃপ্তি আর অল্পে তুষ্ট থাকার শান্তি পুরোপুরি হারিয়ে যায়। সে যেন আক্ষরিক অর্থেই তার নিজের তৈরি করা সম্পদের (বা আবর্জনার) স্তূপ পাহারা দেওয়া এক যক্ষ হয়ে ওঠে।স্বপ্নের মাছ এবং শিশুদের পৃথিবীএরই মাঝে সমান্তরালভাবে চলতে থাকে করিমের ছেলে হুসেইন আর তার বন্ধুদের এক ছোট্ট, নিষ্পাপ স্বপ্নের গল্প। হুসেইন আর তার বন্ধুরা মিলে একটি নোংরা, কাদাভরা জলাধার পরিষ্কার করে সেখানে গোল্ডফিশ (সোনালী রঙের মাছ) চাষ করতে চায়। তাদের বিশ্বাস, এই মাছ বিক্রি করে তারা একদিন লাখপতি হবে।এই স্বপ্নের জন্য হুসেইন তার বাবার কাছে একটি পুরোনো ড্রাম চায়, কিন্তু লোভী হয়ে ওঠা করিম তার ছেলেকে বকা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। তবুও বাচ্চারা দমে যায় না। তারা তাদের মতো করে লড়াই চালিয়ে যায়। করিমের এই বদলে যাওয়া রূপ আর বাচ্চাদের নিষ্পাপ জেদ—এই দুয়ের মধ্যে এক দারুণ বৈপরীত্য তৈরি করেন পরিচালক।
পতন: ঈশ্বরের এক নীরব সতর্কবার্তা
করিমের এই লোভ আর বস্তুবাদের শেষ কোথায়? মজিদি খুব চমৎকার একটি রূপকের মাধ্যমে এর পরিণতি দেখিয়েছেন। একদিন করিম তার উঠোনে জমানো সেই বিশাল আবর্জনার স্তূপটি গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। সে একটির পর একটি ভাঙা দরজা, লোহার টুকরো আর অ্যান্টেনার ওপর ভর দিয়ে একেবারে চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করে।হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে সেই পুরো আবর্জনার পাহাড়টি ধসে পড়ে করিমের ওপর। যে সম্পদ আর বস্তুবাদের পেছনে সে পাগলের মতো ছুটছিল, শেষ পর্যন্ত সেটাই তাকে আছড়ে ফেলে। এই দুর্ঘটনায় করিমের পা ভেঙে যায় এবং সে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। এই পতন কেবল শারীরিক পতন ছিল না, এটি ছিল ঈশ্বরের এক নীরব সতর্কবার্তা। ঈশ্বর যেন তাকে জোর করে থামিয়ে দিলেন, তাকে ভাবার সময় দিলেন।
উপলব্ধি, আত্মশুদ্ধি এবং স্প্যারোর গান
প্লাস্টার করা পা নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে করিমের প্রতিদিনের ব্যস্ততা হঠাৎ শূন্যতায় রূপ নেয়। সে শুয়ে শুয়ে দেখতে থাকে তার বদলে যাওয়া পৃথিবীতে তার পরিবার কীভাবে সংগ্রাম করছে। তার স্ত্রী নার্গিস তার অবর্তমানে সংসারের হাল ধরেছে। তার মেয়েটি তাকে সেবা করছে, আর প্রতিবেশীরা যারা তার দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছিল, তারাই তাকে দেখতে আসছে, সাহায্য করছে।সিনেমার সবচেয়ে আবেগঘন এবং হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি আসে শেষের দিকে। হুসেইন আর তার বন্ধুরা অনেক কষ্টে বাজার থেকে একটি বড় প্লাস্টিকের ব্যারেলে করে তাদের স্বপ্নের গোল্ডফিশগুলো নিয়ে আসছিল। কিন্তু পথে ব্যারেলের তলা ফেটে যায় এবং সমস্ত পানি আর মাছ রাস্তার ধুলায় ছড়িয়ে পড়ে। মাছগুলো ধুলোর মধ্যে খাবি খেতে থাকে। বাচ্চারা পাগলের মতো কাঁদে আর ছোট্ট পাত্রে জল এনে মাছগুলোকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে।করিম বিছানায় শুয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে এই মর্মান্তিক দৃশ্যটি দেখে। তার নিজের ভেতরেও যেন একটা বাঁধ ভেঙে যায়। সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। এই কান্না ছিল তার অহংকারের পতন, তার লোভের প্রায়শ্চিত্ত। হুসেইন যখন বেঁচে যাওয়া কয়েকটি মাছ পরম মমতায় কুয়োর জলে ছেড়ে দেয়, করিম বুঝতে পারে সম্পদ জমা করার মধ্যে নয়, বরং ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেই আসল শান্তি।সবশেষে করিম তার সেই হারানো আত্মাকে ফিরে পায়। সে আবার সেই আগের সহজ-সরল মানুষটিতে পরিণত হয়। একদিন সে শুয়ে থাকতে থাকতে শুনতে পায় উঠোনে ছোট ছোট চড়ুই পাখি (Sparrow) কিচিরমিচির করছে। এই পাখির গান যেন প্রকৃতির, ঈশ্বরের এক শান্তির বার্তা। সে বুঝতে পারে, হালাল উপার্জনের প্রশান্তি এবং পরিবারের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো সম্পদ এই পৃথিবীতে নেই। মুভিটি শেষ হয় একটি অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যের মাধ্যমে, যেখানে দেখা যায় উটপাখিটি ফিরে এসেছে এবং প্রকৃতির ছন্দে নাচছে।'দ্য সং অফ স্প্যারোস' আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, মানুষ যখন তার শিকড় এবং নীতি থেকে সরে যায়, তখন সে কীভাবে নিজের শান্তির কবর নিজেই খোঁড়ে। এই মুভির আধ্যাত্মিক এবং মানবিক আবেদন যেকোনো পাষাণ হৃদয়কেও গলাতে বাধ্য।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community