শেষ বৃষ্টির শহর
“মেঘ জমলে গল্প হয়… আজও আকাশ ভিজে আছে শব্দে।”
🌧️ শেষ বৃষ্টির শহর
শহরটা আগে এমন ছিল না।
এই শহরে একসময় মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি ডাকত। এখন মানুষ বৃষ্টিকে ভয় পায়।
রাহাত জানালার পাশে বসে ছিল। জানালার কাঁচে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ। ঢাকার মতো কোলাহলপূর্ণ শহরও যেন আজ থেমে গেছে। আকাশ কালো, বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ—মাটি আর স্মৃতির মিশ্রণ।
তিন বছর আগে এই শহরেই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো কেটেছিল। আর এই শহরেই সে হারিয়েছে নীহারিকাকে।
নীহারিকা বৃষ্টি ভালোবাসত। সে বলত,
“বৃষ্টি মানে নতুন শুরু, পুরোনো কষ্ট ধুয়ে যাওয়া।”
রাহাত হাসত। সে বিশ্বাস করত না এসব। তার কাছে বৃষ্টি মানে ছিল ট্রাফিক জ্যাম, কাদা, আর বিরক্তি। কিন্তু ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়। ধীরে ধীরে সেও বৃষ্টিকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছিল।
প্রথম দেখা
তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল এক বর্ষার দুপুরে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল। সবাই ছুটে আশ্রয় নিচ্ছিল। নীহারিকা ছাতা ছাড়া দাঁড়িয়ে ছিল, মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
রাহাত অবাক হয়ে বলেছিল,
“আপনি ভিজছেন কেন?”
নীহারিকা হেসে বলেছিল,
“সবাই বৃষ্টি থেকে পালায়। কেউ তো বৃষ্টিকে স্বাগত জানাবে!”
সেই হাসিটাই রাহাতকে থামিয়ে দিয়েছিল।
প্রেমের দিনগুলো
তারা দুজনেই বই পড়তে ভালোবাসত। বিকেলে ক্যাম্পাসের পুরোনো গাছটার নিচে বসে গল্প করত। নীহারিকা স্বপ্ন দেখত—একটা ছোট লাইব্রেরি খুলবে, যেখানে সবাই ফ্রি বই পড়তে পারবে।
রাহাত স্বপ্ন দেখত বড় চাকরি, বড় বাড়ি, বড় গাড়ি।
তাদের স্বপ্ন আলাদা ছিল, কিন্তু হৃদয়টা এক ছিল।
বৃষ্টি হলেই তারা ছাদে উঠত। নীহারিকা হাত মেলে দাঁড়াত। রাহাত তাকে দেখত। মনে হতো, পৃথিবীর সব শান্তি যেন এই মেয়েটার ভেতরে লুকিয়ে আছে।
সেই রাত
সবকিছু বদলে গেল এক ঝড়ের রাতে।
সেদিনও প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। নীহারিকা অসুস্থ ছিল, কিন্তু রাহাতকে দেখতে বের হয়েছিল। সে বলেছিল,
“তুমি ছাড়া বৃষ্টি ভালো লাগে না।”
রাস্তায় হঠাৎ একটা দ্রুতগামী গাড়ি। ব্রেকের শব্দ। চিৎকার।
তারপর শুধু নীরবতা।
রাহাত যখন হাসপাতালে পৌঁছায়, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বৃষ্টি তখনও থামেনি।
তিন বছর পর
রাহাত এখন একটা বড় কোম্পানিতে চাকরি করে। বড় অফিস, এয়ার কন্ডিশনড রুম, মোটা বেতন—সব আছে। কিন্তু শান্তি নেই।
বৃষ্টি নামলেই সে অস্থির হয়ে ওঠে।
আজও তাই হয়েছে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সে পুরোনো ক্যাম্পাসে এসেছে। গাছটা এখনও আছে। বেঞ্চটা এখনও আছে। শুধু নীহারিকা নেই।
সে ধীরে ধীরে গাছের নিচে বসে পড়ে। বৃষ্টির ফোঁটা পাতার ফাঁক দিয়ে তার গায়ে পড়ছে।
হঠাৎ তার চোখে পড়ে একটা ছোট্ট বোর্ড—
“নীহারিকা মুক্ত পাঠাগার”
সে অবাক হয়ে উঠে দাঁড়ায়। পাশেই একটা ছোট ঘর। ভেতরে তাকিয়ে দেখে কয়েকজন শিশু বই পড়ছে।
একজন বয়স্ক মহিলা এগিয়ে এসে বললেন,
“তুমি কি রাহাত?”
রাহাত চমকে ওঠে।
“জি… আপনি?”
“আমি নীহারিকার মা।”
তার বুক কেঁপে ওঠে।
মহিলা মৃদু হাসলেন।
“মরার আগে ওর একটা ইচ্ছে ছিল। ওর সেভ করা কিছু টাকা ছিল। আর আমরা বাকিটা যোগ করে এই ছোট লাইব্রেরিটা করেছি। ও বলত, বৃষ্টি যেমন মাটি ভিজিয়ে নতুন গাছ জন্মায়, তেমনি বই মানুষের ভেতরে নতুন জীবন জন্মায়।”
রাহাত কথা বলতে পারছিল না।
চিঠি
নীহারিকার মা একটা খাম এগিয়ে দিলেন।
“এটা তোমার জন্য রেখে গিয়েছিল।”
রাহাত কাঁপা হাতে খাম খুলল।
চিঠিতে লেখা—
“রাহাত,
যদি কখনো আমি না থাকি, তুমি বৃষ্টি থেকে পালিও না। আমি জানি তুমি শক্ত। তুমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করবে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—জীবন শুধু বড় হওয়া না, ভালো হওয়াও জরুরি।
যদি পারো, আমার লাইব্রেরির স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রেখো।
বৃষ্টি নামলে আকাশের দিকে তাকিয়ো। আমি সেখানেই থাকব।”
চোখ ঝাপসা হয়ে যায় রাহাতের।
নতুন শুরু
সেদিনের পর রাহাত বদলে যায়।
সে তার বেতনের একটা অংশ নিয়মিত লাইব্রেরিতে দান করতে শুরু করে। সপ্তাহে একদিন এসে শিশুদের পড়ায়। তাদের গল্প শোনায়।
বৃষ্টি নামলে এখন সে আর লুকায় না। বরং লাইব্রেরির টিনের চালের নিচে দাঁড়িয়ে শিশুদের হাসি শোনে।
একদিন এক ছোট মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“আঙ্কেল, আপনি বৃষ্টি পছন্দ করেন?”
রাহাত আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“হ্যাঁ, খুব পছন্দ করি।”
“কেন?”
সে উত্তর দিল,
“কারণ বৃষ্টি মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।”
শেষ দৃশ্য
আজ আবার প্রবল বৃষ্টি।
লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে রাহাত আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
তার মনে হয়, কোথাও একটা হাসি ভেসে আসছে।
হয়তো নীহারিকা খুশি।
শহরটা এখনও একই আছে। কোলাহল আছে, ব্যস্ততা আছে। কিন্তু রাহাতের ভেতরের শহর বদলে গেছে।
বৃষ্টি এখন আর তার কাছে কষ্টের স্মৃতি নয়।
বৃষ্টি এখন তার কাছে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি।
কারণ কিছু মানুষ চলে যায়,
কিন্তু তাদের স্বপ্ন থেকে যায়।
আর সেই স্বপ্নই একদিন একটা শহর বদলে দেয়।
“এটাই ছিল আজকের মেঘের গল্প। আবার দেখা হবে অন্য এক বৃষ্টিতে…” 🌥️
