তিন বন্ধুর তারাপীঠ ভ্রমণ

গত ১৪ই নভেম্বর আমরা তিন বন্ধু মিলে তারাপীঠ গিয়েছিলাম মায়ের পুজো দিতে। আমি যথেষ্ট অসুস্থ ছিলাম কিন্তু যেহেতু আগের থেকে টিকিট কাটা ছিল তাই আর ক্যান্সেল করিনি। হাওড়া থেকে সকাল ১১টা ৫ মিনিটের কবিগুরু এক্সপ্রেস ধরে রামপুরহাট স্টেশনে পৌঁছাই বিকেল ৪টের পরে। ট্রেন যথেষ্ট লেট করেছিল। তারপর স্টেশন থেকে টোটো করে তারাপীঠ পৌঁছাতে আরও ২০-২৫ মিনিট সময় লাগলো।
তারাপীঠ পৌঁছে প্রথমে আমরা একটা দোকান থেকে ৪টে করে কচুরি খেলাম কারণ আমাদের তিনজনেরই যথেষ্ট খিদে পেয়ে গিয়েছিল। তারপর বেশ কয়েকটা হোটেলে দরদাম করে বলাকা নামে একটা হোটেলে গিয়ে আমরা উঠলাম। দুইদিনের জন্য একটা নন এসি রুম গিজারের ফেসিলিটি সহ ভাড়া নিয়েছিল ১৫০০ টাকা। একটা ২০ লিটারের মিনারেল ওয়াটারের জারের দাম নিয়েছিল ১০০ টাকা যেটা কলকাতায় ৩৫-৪০ টাকায় পাওয়া যায়। সব তীর্থস্থানেই অবশ্য এইভাবে তীর্থযাত্রীদের গলা কাটে।

একটু বিশ্রাম নিয়ে আমি, সুব্রত আর ইন্দ্রনীল ঘুরতে বের হলাম। আমরা তিনজন ছোটবেলার বন্ধু। আমরা প্রথমে তারাপীঠ শ্মশানে গেলাম। পুরো শ্মশানটা ইচ্ছাকৃত ভাবে অন্ধকার করে রাখা আছে আর এখানে খালি পায়ে ঢুকতে হয়। তাই আমরা শ্মশানে প্রবেশের আগে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলে নিলাম। তারপর আমরা শ্মশানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম আর ওখানে বামাখ্যাপা যেখানে বসে ধ্যান করতেন সেই স্থান দর্শন করলাম।

তারপর মন্দিরের রাস্তায় কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে মায়ের মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তোলা হলো, মন্দিরের গেট অবশ্য ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর রাত ১০টা নাগাদ আমাদের হোটেলের ঠিক উল্টোদিকে ত্রিনয়নী হোটেলে আমরা তিনজন ডিনার করে নিলাম। এই হোটেলের খাবার যথেষ্ট সুস্বাদু আর এদের মিল সিস্টেম মানে মেন পদ বাদে আনলিমিটেড ভাত, ডাল আর তরকারী পাবেন আর এর জন্য কোনও অতিরিক্ত টাকা লাগবে না। এরপর হোটেলরুমে ফিরে আমরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম কারণ কালকে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে তারামার মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য আর শনিবার এখানে অস্বাভিক ভীড় হয়। আমার যদিও সেদিন সারারাত ঘুম হয়নি আমার দুই বন্ধুর নাক ডাকার আওয়াজে।


পুজো দেওয়ার দিন ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে স্নান করতে গিয়ে দেখি যে গিজার কাজ করছে না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা তিনজন ঠাণ্ডা জলে স্নান করে নিলাম। তারপর পরিষ্কার জামাকাপড় পড়ে পুজাসামগ্রী কিনে নিয়ে যখন পুজো দেওয়ার লাইনে দাঁড়ালাম তখন ৬টা বেজে ৩০ মিনিট হয়েছে। তখনই লাইনে আমাদের সামনে হাজারখানেক লোক দাঁড়িয়ে পুজো দেওয়ার জন্য। তারাপীঠে মায়ের পুজো দেওয়ার আরেকটা উপায় আছে। জনপ্রতি ৫০০ টাকার বিনিময়ে ভিআইপি লাইনে পুজো দেওয়া। আমরা তিনজনই এই ব্যাপারটা সমর্থন করিনা বলে জেনারেল লাইনে দাঁড়িয়েছি। যদিও আমি অস্বীকার করবো না যে আমি যখন বেশ কিছু বছর আগে পুজো দিয়েছিলাম তখন ভিআইপি লাইনের মাধ্যমেই পুজো দিয়েছিলাম।

সকাল ১১টার পরও দেখলাম যে মন্দির কমিটি ভিআইপি লাইনের লোকদের খালি ঢুকতে দিচ্ছে আর জেনারেল লাইন একদম একই জায়গায় আটকে আছে। এদিকে দুপুর ১২টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তারামায়ের অন্নভোগের জন্য মায়ের দর্শন বন্ধ থাকে। তাই ১২টা বাজার একটু আগে আমরা আমাদের পান্ডাকে ডেকে গর্ভগৃহের বাইরে থেকে মায়ের দর্শন করে আর পুজো দিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। তারপর ত্রিনয়নী হোটেলে গিয়ে আমরা লাঞ্চ করলাম। হোটেলের মালিক আবার মন্দিরে ভান্ডারা চালান। উনি আমাদের বললেন যে আমাদের জন্য মায়ের অন্নভোগ রেখে দেবেন।

দুপুরে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা বিকেলবেলায় কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম। সুব্রত আবার পশুপ্রেমী আর ওর পকেটে সবসময় ওষুধ থাকে। শ্মশানে একটা কুকুরের মাথায় ঘা হয়েছে দেখে ও আমায় একটা রসগোল্লা কিনে আনতে বললো ওষুধটা মিষ্টির সাথে মিশিয়ে খাওয়াবে বলে আর সাথে মাথায় কি ওষুধ স্প্রে করবে, আমার কোনো আইডিয়া নেই এইসব ব্যাপারে। আমি মিষ্টি নিয়ে শ্মশানে গিয়ে ওকে কোনোমতে খুঁজে পেলাম বামাখ্যাপার সমাধিক্ষেত্রর সামনে যদিও সমাধিক্ষেত্রটা আমার দেখা হলো না। কুকুরকে ওষুধ দেওয়ার পর আমরা হোটেলে ডিনার করতে গেলাম। ওখানে প্রথমে আমাদের মায়ের অন্নভোগ প্রসাদ দেওয়া হলো। তারপর আমরা ডিনার করে নিয়ে হোটেলে গিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম কারণ পরের দিন সকালে ৭টা ৫০ মিনিটের ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধরে কলকাতায় ফিরবো। আমার অবশ্য সেই রাতেও ঘুম হয়নি। পরপর দুই রাত আমি না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি।


পরের দিন সকাল ৭টা ৩০ মিনিটের মধ্যে আমরা রামপুরহাট স্টেশনে পৌঁছে যাই। এই ট্রেনটা ঠিক সময়ে আমাদের হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দেয় আর আমরা তিনজন দুপুর ২টো বাজার আগেই যে যার বাড়ীতে পৌঁছে যাই। আমার শরীর ভালো থাকলে আমি বেশ কিছু ছবি তুলতাম তারাপীঠে কিন্তু এইবার আমি প্রায় কোনো ছবিই তুলিনি। সবই মায়ের ইচ্ছে।

X share: https://x.com/PijushMitra/status/1993370186515419249
Curated By: @damithudaya
@damithudaya, thank you for your cordial support.