"প্রচলিত প্রবাদ বাক্যের সত্যতা, আমরা আমাদের জীবনের কিছু কিছু পরিস্থিতিতে অনুভব করতে পারি।
![]() |
|---|
Hello,
Everyone,
আজ সন্ধ্যার পর আমিও শুভর সাথে রাজাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আসলে সেদিনের পর থেকে যাবো যাবো ভাবছিলাম, কিন্তু আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। আজ শনিবার ছিলো। শুভ আজ একটু আগেই অফিস থেকে এসেছিলো, তাই ওকে বলেই রেখেছিলাম সন্ধ্যাবেলায় একবার রাজাদের বাড়িতে যাবো। সেই মতোই সন্ধ্যা পূজা দেওয়ার পর, তৈরি হয়ে শুভর সাথে বেরিয়ে রাজাদের বাড়িতে গেলাম।
রাজা তখন ঘরে শুয়েই ছিলো, সাথে ওর বাবাও ছিলো। সকল নিয়ম যেহেতু ছেলে হিসেবে রাজা পালন করছে, তাই রাজা মেঝেতে শুয়েছিলো, আর ওর বাবা খাটের ওপরে শুয়ে ছিলো। আমরা যেতেই রাজা উঠে এসে পাশের ঘরে বসলো। রাজার পরনে পোশাকটা দেখেই কেমন যেন লাগলো। আসলে কয়েকদিন আগে শুভকেও একই পোশাকে দেখেছি বলেই হয়তো, আরও বেশি খারাপ লাগছিলো।
সব বাবা মায়ের কাছেই তার সন্তান অত্যন্ত প্রিয় হয়ে থাকে। আর রাজা যেহেতু একমাত্র সন্তান ছিলো, তাই ওর আদর আরও একটু বেশিই ছিলো। রাজার বাবা কর্মসূত্রে বহু বছর ধরেই বাড়ি থেকে দূরে থাকতেন। তাই বরাবরই কাকিমা ওকে অনেক বেশি আগলে রাখতো। ছেলের কষ্ট হতে পারে এমন কোনো কাজ কখনোই কাকিমা রাজাকে দিয়ে করাননি।
তবে আজ রাজা নিজের মুখেই বললো সকলেরই কম বেশি কাজ শিখে রাখা উচিত। জীবন কাকে কখন, কি রকম পরিস্থিতিতে দাঁড় করাবে তা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। তাই কিছু জিনিস শিখে রাখলে জীবনের কঠিন সেই মুহূর্ত বা পরিস্থিতি গুলো কাটিয়ে ওঠা অনেক বেশি সহজ হয়।
সারা জীবনে যেই ছেলেটাকে কখনো রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়নি, আজ মায়ের মৃত্যুর পর নিয়ম পালন করতে গিয়ে তাকে হবিষ্য রান্না করতে হচ্ছে। যে ছেলেটার জন্য বিভিন্ন রকমের পদ মা রান্না করতো, আজ সেই ছেলেই মায়ের মৃত্যুর পর আঁতপ চালের সেদ্ধ ভাত নিজে রান্না করে খাচ্ছে। সবটাই পরিস্থিতি, যা থেকে পালানোর উপায় জানা নেই কারোরই।
রাজা বরাবর মিষ্টি খেতে ভীষণ পছন্দ করে। তবে আজ বললো এখন মিষ্টি দেখলেই ওর অস্বস্তি হচ্ছে, এমন কি ফল পর্যন্ত খেতে পারছে না। এমনটাই হয়। আসলে শ্বশুর মশাইয়ের সময়ে এই বিষয়টি ভীষণ ভালোভাবে উপলব্ধি করেছি আমি নিজেও।
![]() |
|---|
রাজার কথা শুনে আমারও মনে পড়লো, মা মারা যাওয়ার পর প্রথম আমি যেদিন হবিষ্য রান্না করতে গিয়েছিলাম, সেদিন আমারও রাজার মতো জল শুকিয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু চাল এবং আলু কোনোটাই সিদ্ধ হয়নি। তাই প্রথম দিন আমি একেবারেই খেতে পারিনি।
কারণ কিছু নিয়ম হবিষ্য রান্নার ক্ষেত্রে রয়েছে, যেখানে আপনি একবার রান্নার ওখানে ঢুকে গেলে বেরোতে পারবেন না। কারোর সাথে কথাও বলতে পারবেন না। এই সব কিছু মিলিয়েই আর প্রথম দিন জলের মাপ বুঝে উঠতে না পারাতে, ঠিকঠাক ভাবে রান্না করতে পারিনি। রাজারও নাকি একই রকম অবস্থা হয়েছিলো। আজ হয়তো সংসারের সমস্ত কাজ সামলে নিতে পারি। তবে মাকে হারিয়েছে আজ থেকে আরও ১৫ বছর আগে, তাই তখন রান্নার ক্ষেত্রে একেবারেই অনভিজ্ঞ ছিলাম।
রাজা আজ কথায় কথায় বলছিলো, কিছু প্রবাদ এমন আছে যার প্রকৃত অর্থ আমরা আমাদের জীবনের কিছু কিছু পরিস্থিতিতেই সবথেকে ভালো উপলব্ধি করতে পারি। কাকিমার কিছু ছবি প্রিন্ট আউট করতে দিয়েছে, সেখান থেকেই এক কপি ছবি বের করে আমাদের দেখতে দিয়ে রাজা বললো,- "আজকে মরলে কালকে দুদিন, এই প্রবাদটি একেবারেই সত্যি। মা মরে গেছে ইতিমধ্যেই তিনদিন অতিক্রম হয়ে গেছে, এ কথা বিশ্বাসই হচ্ছে না।"
ওর এই কথাটা শুনে মনে হলো সত্যিই তো তাই, কাকিমা নেই ইতিমধ্যেই তিনদিন অতিক্রম হয়ে গেছে। আমার শ্বশুরমশাই মারা গেছেন এর মধ্যে প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। এইরকম ভাবে আরও অসংখ্য মানুষ ছেড়ে চলে গেছে আমাকে। কিন্তু তবুও দিব্যি কাটছে জীবন।
একটা সময় রাজার দিনও এরকম ভাবেই পার হয়ে যাবে ওর মাকে ছাড়াই, সে কথা বলতে গিয়েই রাজার গলা ভার হয়ে এলো। ছেলেরা আসলে নিজেদের অনুভূতিগুলো চোখের জল দিয়ে কম ব্যক্ত করতে পারে, যেটা মেয়েদের পক্ষে অনেক বেশি সহজ।
তবে বুঝতে অসুবিধা হলো না মা কে ছাড়া দিন কাটাতে রাজারও খুবই সমস্যা হচ্ছে। তবে ও নিশ্চয়ই অভ্যস্ত হয়ে যাবে এই পরিস্থিতির সাথে। এরকমটা আমাদের সকলের সাথেই হয়। যদি আমরা এই কষ্টগুলো মেনে নিয়ে বাঁচতে না পারতাম আমাদের সকলের জীবনে কোনো না কোনো কাছের মানুষকে হারানোর পর থমকে যেতো।
![]() |
|---|
যাইহোক বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে কাকুর সাথে একটু কথা বলে তারপর বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়িতেও বেশ কিছু কাজ বাকি ছিলো, তাই ফিরে সেগুলোই সম্পন্ন করলাম। শ্বশুরমশাইয়ের বাৎসরিক কাজ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অনেক নিয়মই মেনে চলতে হবে। তবে এই কঠিন সময়ের রাজার পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা নিশ্চয়ই করবো।
শুভ প্রতিদিনই ওর সাথে গিয়ে দেখা করে আসে। তবে আমার পক্ষে প্রতিদিন যাওয়া সম্ভব হয় না। আজ গিয়ে বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে এলাম। জানি রাজার কষ্ট কম করা সম্ভব নয়, তবে সকলে মিলে ওর পাশে আছি এই বিষয়টা ওকে একটু হলেও ভালোলাগা দেয় এ কথা সত্যি।
যাইহোক কাকিমার সম্পূর্ণ কাজ খুব নিষ্ঠার সহিত পালন করছে, আর আগামী দিনগুলো ও এমন ভাবেই পালন করবে, এমনটাই আশা রাখি। ভালো থাকবেন সকলে।
|
|---|



