"বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড় এর লুকোচুরি দরওয়াজা পরিদর্শনর অভিজ্ঞতা"
![]()
|
|---|
Hello,
Everyone,
কেমন আছেন আপনারা সকলে?
স্কুল কলেজে পড়াশোনা করাকালীন ইতিহাস আমার খুব প্রিয় বিষয় ছিলো না ঠিকই, তবে অদ্ভুত ভাবে এখন যেন ঐতিহাসিক বিষয় গুলো আমাকে আকর্ষিত করে।
আজকাল যে কোনো খাবারের ইতিহাস, যে কোনো পোশাকের, রীতিনীতির পিছনের ইতিহাস, বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক গ্ৰন্থ কিংবা বহু পুরোনো ও বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান গুলো পরিদর্শন করার ইচ্ছা জাগে মনে।
এই বছর তেমনই একটা ইচ্ছাপূরণ হয়েছে আমার। ২০২৬ সালের শুরুর দিনটি একটু অন্যরকম ভাবেই কেটেছিলো। ইতিহাসের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো এবার। ছু্ঁয়ে দেখতে পেরেছি বাংলার পুরোনো রাজধানী গৌড় এর কিছু প্রাচীন ঐতিহ্যকে। আজ তারই অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো আপনাদের সাথে।
সত্যি বলতে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে আজ হয়তো আমরা মন চাইলেই পুরনো দিনের সকল তথ্য সম্পর্কে জানতে পারি, তবে ইতিহাসকে ল্যাপটপে বা ফোনের স্ক্রিনে দেখার থেকেও, সামনাসামনি দেখায় যে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা হয়, তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
আমার লেখা গত বেশ কয়েকটি পোস্ট পড়ে হয়তো আপনারা অনেকেই জানতে পেরেছেন যে, এবার নতুন বছর শুরু হয়েছিল মালদায়। আর "মালদা" নামটা শুনতেই যেন ইতিহাসের কিছু কথা আমাদের মাথায় আসে।
![]()
|
|---|
মালদার বিখ্যাত স্থান গৌড়ের ইতিহাস বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মৌর্য্য যুগ থেকে শুরু করে সুলতানি আমল পর্যন্ত গৌড় বাংলার রাজধানী ছিলো। যেটা শশাঙ্ক, সেন রাজবংশ ও মুসলিম সুলতানদের শাসনের সময়কালে আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। বর্তমানে "গৌড়" মালদা জেলার এক ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে।
এটি পরাক্রমশালী রাজা শশাঙ্কের সময়কালে কর্নসূবর্ণ নামেও পরিচিত ছিলো। পাল ও সেন রাজবংশের শাসনকালেই গৌড়, শিল্পকলা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বিশেষ করে সেন বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা লক্ষণ সেনের আমলে। এই বছরের শুরুর দিনে আমরাও পৌঁছে গিয়েছিলাম মালদার সেই বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান "গৌড়" এ।
এয়োদশ শতকের শুরুতে বখতিয়ার খিলজির হাতে সেন রাজবংশের পতন হলে, গৌড় মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসে। এরপর শেরশাহের সময় এটা অনেক বেশি সমৃদ্ধ ছিলো। পরবর্তীতে ইলিয়াস শাহ, হোসেন শাহ এর মতন সুলতানরা এটির আরো বিকাশ করেন।
![]()
|
|---|
নতুন বছরে এই গৌড়ে গিয়ে সেখানকার বিখ্যাত বারোদুয়ারী মসজিদ বা বড় দরজা মসজিদ, চিকি মসজিদ, গুমতি দরওয়াজা এবং আরো অন্যান্য জিনিস দেখার সুযোগ হয়েছিলো। তবে সবথেকে যেটা মন কেড়েছিলো সেটি হলো,- "লুকোচুরি দরওয়াজা বা শাহী দরওয়াজা"।
![]()
|
|---|
সেখানে পৌঁছে একটা পুকুর পাড়ে গাড়ি রেখে, আমরা কিছুটা পায়ে হেঁটে, এই লুকোচুরি দরওয়াজা পার করেই প্রবেশ করেছিলাম গৌড় এর ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান গুলো পরিদর্শন করতে। ভিতরে যদিও বা গাড়ি পার্ক করার সুব্যবস্থা আছে তবে একবার ভিতরে রাখলে বেরোনোর সময় অনেক জ্যামের মুখে পরতে হয়। তাই আমরা বাইরেই গাড়ি রেখেছিলাম।
এই লুকোচুরি দরওয়াজা মুঘল আমলের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য, যেটি গৌড়ের একটি প্রবেশদ্বার ছিলো। শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে এটিকে শাহি দরওয়াজাও বলা হয়ে থাকে। আনুমানিক ১৬৫৫ সালে শাহ সুজা এটা তৈরি করেন।
![]()
|
|---|
এটি তৈরি করতে মূলত ব্যবহার করা হয়েছিল ইট, চুন ও সুরকি। এই প্রবেশ দ্বারটি তিন তলা উচ্চতা বিশিষ্ট, এখনও পর্যন্ত পুরনো সেই ঐতিহ্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। গুগল থেকে জানতে পারলাম এর উচ্চতা ৬৫ ফিট, চওড়া ৪২ ফিট। প্রবেশদ্বারের দুই পাশেই প্রহরীদের জন্য আলাদা করে ঘর নির্মিত ছিলো, যার ধ্বংসাবশেষ আজও সেখানে বিদ্যমান।
![]()
|
|---|
একেবারে উপরের দিকে যে তিনটি জানালা আছে, অনুমান করা হয় সেটি ছিল নহবাদখানা অর্থাৎ বিশিষ্ট বাদ্যযন্ত্র সেই জানালাতে বসেই বাজানো হতো। এই প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে ঢুকে আমরা আরও বিভিন্ন মসজিদ, সমাধি, দেখেছিলাম। যা সেই সময়কার ঐতিহ্যের কথা আমাদেরকে স্মরণ করিয়েছে।
![]()
|
|---|
![]()
|
|---|
বর্তমানে প্রবেশদ্বারের দুই পাশে মাটি দিয়ে উঁচু ঢিবির মতন করা আছে, যেখানে গিয়ে মানুষ ছবি তোলেন। সব থেকে অবাক হলাম সেখানকার একটু তেঁতুল গাছ দেখে। গাছটি কত বছরের পুরনো তা কোথাও উল্লেখ করা নেই ঠিকই, তবে এটিও যে প্রাচীন ইতিহাসের ঐতিহ্য বহন করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
![]()
|
|---|
![]()
|
|---|
ইটের গাঁথনি গুলো তৎকালীন সময়ে কেমন ছিলো তা প্রবেশদ্বারের খুব কাছাকাছি গিয়ে দেখা সম্ভব হয়েছে। এই ধ্বংসাবশেষ গুলি তাদের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বহন করে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সামনাসামনি এগুলোকে দেখার উপলব্ধি বোধহয় লেখার মাধ্যমে আপনাদেরকে বোঝানো সম্ভব হলো না।
তবে মৌর্য্য যুগ থেকে শুরু করে সুলতানি আমল পর্যন্ত ইতিহাসের সাক্ষী এই লুকোচুরি দরওয়াজা দেখার অনুভূতি একেবারেই অনন্য। চাইলে আপনারাও একবার ঘুরে দেখে আসতে পারেন এই ঐতিহাসিক স্থানটিতে। এক অপূর্ব ভালোলাগায় আপনার মন ভরে উঠবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
![]()
|
|---|
বর্তমানে এই সকল স্থান ভারত সরকারের ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ এর মতো সরকারি সংস্থা বা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তর, এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের ওপর বর্তায়, যারা এর সকল স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বজায় রাখতে, সেগুলো মেরামত করতে ও সেখানকার পরিবেশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কাজ করেন।
![]()
|
|---|
বছর পর্যটকদের জন্য খোলা থাকলেও শীতকালে বেশিরভাগ মানুষ এখানে পিকনিক করতে আসেন। আর পর্যটকদের ভীড়ের কারনে বিভিন্ন ধরনের দোকানও বসে। ফলতো দেখে মনে হয় যেন, পুরো জায়গা জুড়ে মেলা বসেছ।
যাইহোক পরবর্তীতে আমরা আরও বিভিন্ন ঐতিহাসিক জায়গা ঘুরে দেখেছি, যেগুলো সম্পর্কে পরবর্তী পোস্টে আলোচনা করবো। আজকের লেখাটা এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকবেন সকলে।












Thank you for your support @memamun. 🙏