"কিছু ঘটনার অভিজ্ঞতা,আমাদের জীবনের প্রতি থাকা সকল অভিযোগকে অর্থহীন করে তোলে"

in Incredible India4 days ago (edited)
IMG_20260310_224622.jpg
"আকাশের মতো উদার আর ফুলের মতো পবিত্র, মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ আজ খুঁজে পাওয়া কঠিন।"

Hello,

Everyone,

আমাদের জীবনে যখনৈ কোনো সমস্যা আসে তখন আমরা খুব সহজেই ভেঙে পরি। কখনো কখনো সেই সমস্যাগুলির সাথে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে‌ পরি। তবে কিছু মানুষ এমনও আছেন, যাদের লড়াই গুলো আজীবন ধরে লড়ে যেতে হয়। কারণ সেই লড়াই থেকে পালানোর মতো কোনো উপায় থাকে না।

আমরা যারা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করি, তাদেরও জীবন নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তবে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা প্রতিনিয়ত অনেক প্রতিবন্ধকতার সাথে জীবন পার করছেন, অথচ তাদের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি অভিযোগ নেই, কিংবা থাকলেও তারা তা প্রকাশ করতে পারে না।

এমনই একটা ঘটনার সাক্ষী রইলাম ব্যক্তিগত কাজে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে। গতকালকের পোস্টে আপনাদেরকে জানিয়েছিলাম কি কারণে আমি পুলিশ স্টেশনে গিয়েছিলাম। যখন আমরা সেখানে গিয়েছি তখন বেশ কিছু মানুষের উপস্থিতিতে কোনো একটা বিষয় নিয়ে সেখানে কথাবার্তা চলছিলো। তাই আমাদেরকে কিছুক্ষণ বাদে যেতে বলেছিলো। তাই সেই ফাঁকেই আমরা বাইরে বেরিয়ে খাওয়া দাওয়া করেছিলাম।

তারপর যখন পুনরায় সেখানে গেলাম, তখন দেখলাম একজন বয়স্ক লোক ও তার স্ত্রী ছোট্ট একটা বাচ্চাকে নিয়ে একটা পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আর অন্য দিকের বেঞ্চে বসে আছে একটা কম বয়সী বিবাহিত মেয়ে। যার কাছে দু তিনটে জামা কাপড়ের ব্যাগ রয়েছে।

যদিও কারোর কাছেই কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিনি, তবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকার সুবাদে যতটুকু বুঝতে পারলাম, একদিন আগেই ঐ‌বয়স্ক লোকটি ও তার স্ত্রী পুলিশ স্টেশনে এসে নিজেদের মেয়েকে খুঁজে না পাওয়ার জন্য ডাইরি করেছিলেন।

তবে আজ তারা নিজের মেয়েকে খুঁজে পেয়েছেন। তাই মেয়েকে সাথে নিয়েই সোজা পুলিশ স্টেশনে এসেছেন সেই ডাইরিটা তুলে নেওয়ার জন্য। তবে দুঃখের বিষয় মেয়েটি বোবা এবং কালা। আর যে ছোট্ট বাচ্চাটিকে নিয়ে ওনরা দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেটা ওনাদের নাতী অর্থাৎ মেয়ের একমাত্র ছেলে। বাচ্চাটিও মায়ের মতন কানে শুনতে পায় না এবং কথা বলতে পারে না। বাচ্চাটি এবং ওর মায়ের সাথে বয়স্ক লোকটি ও তার স্ত্রী দুজনেই ইশারায় কথা বলছিলেন বলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হলো।

শ্বশুরবাড়িতে হয়তো মেয়েটার উপরে মানসিক অত্যাচার চলে, কিংবা হয়তো শারীরিকও। অথবা‌ অন্যান্য আরও কোনো কারনে মেয়েটি শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। তবে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা শুধুমাত্র তার বাবা-মাকে সেই সংবাদটাই দিয়েছে, তবে মেয়েটিকে এবং বাচ্চাটিকে খোঁজার কোনো চেষ্টা তারা করেনি। অথচ মেয়েটির মা বললো, বিয়ের সম্বন্ধ করার সময় তারা তাদের মেয়ের সমস্যার কথা জানিয়েই কিন্তু বিয়ে দিয়েছিলেন।

তবে মেয়েটি শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে বাপের বাড়িতে আসেনি বলেই ওনরা আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ যেহেতু মেয়েটা কথা বলতে পারে না, তাই কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে যাবে সেই কারণেই তারা এসে পুলিশ স্টেশনে বিষয়টি জানিয়েছে। তবে একদিন বাদেই মেয়েটি‌ বাড়িতে চলে এসেছে। কিন্তু পুলিশ যাতে ওকে খুঁজে আর নিজেদের সময় নষ্ট না করে, সেই কারণেই বাবা-মা দুজনেই মেয়েকে এবং নাতিকে নিয়ে পুলিশ স্টেশনে এসেছে বিষয়টি জানানোর জন্য।

মেয়েটাকে দেখে খারাপই লাগছিলো।‌দেখতে যথেষ্ট সুন্দর, কিন্তু এই শারীরিক অক্ষমতাটুকুই বোধহয় তার সমস্ত ভালো গুণগুলোকে ঢেকে দিয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে কম বেশি সকল মেয়েকেই অ্যাডজাস্ট করতে হয়। কিন্তু যে নিজের অভিব্যক্তি কাউকে বলে বোঝাতে পারে না, তার ক্ষেত্রে অ্যাডজাস্টমেন্টের মাত্রাটা অনেকটাই বেশি হয়। তবে উল্টো দিকের মানুষগুলো যদি মেয়েটার দিকে একটু মানবিকতার দৃষ্টি দিয়ে দেখতো, তাহলেই কিন্তু সম্পর্কের পরিভাষাটা অন্যরকম হলেও হতে পারতো।

তবে আজকালকার দিনে বোধহয় সেই ধরনের মানসিকতায় সম্পন্ন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তা না হলে ওইটুকু একটা বাচ্চা সহ তার মা রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হতো না। একজন মেয়ে হিসেবে এই বিষয়টা খুব ভালো করে বুঝি যে, আমরা মেয়েরা নিজের জন্য অনেক সময় ভুল পদক্ষেপ নিতে পারি। রাগে, অভিমানে, জেদে অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু সেই মেয়ে যখন একজন মা হয়ে ওঠে, তখন সন্তানের ভালোর জন্য আরৈ অনেক কঠিন সময় পার করতে পারে। এই মেয়েটিও হয়তো চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি।

আগামী জীবনটা তার কিভাবে কাটবে জানিনা। তবে ওর বাবা-মায়ের দায়িত্ববোধ আমাকে মুগ্ধ করেছে। পুলিশ যাতে অযথা তাদের মেয়েকে খুঁজে না বেড়ায়, তাই তিনি মেয়েকে পাওয়ার আনন্দ অনুভব করার চাইতেও, সেই সংবাদটা পুলিশ স্টেশনে এসে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেছেন সবার আগে।

এর পরবর্তীতে মেয়েটার জীবনে কি হবে তা হয়তো আমার পক্ষে আর জানা সম্ভব হবে না। কিন্তু ওর জীবনের লড়াইটা নিয়ে ভাবতে গেলেই নিজের ভিতর থেকে একটা কষ্ট অনুভব করছিলাম। সারা জীবনে হয়তো নিজের অনুভূতিগুলো সেটা সুখের হোক কিংবা দুঃখের, শব্দের দ্বারা অন্যের কাছে প্রকাশ করার সুযোগ হয়নি। নিজের বাবা-মাকেও হয়তো বলে বোঝাতে পারবে না ও কি সহ্য করেছে, বা কি পরিস্থিতিতে বাড়ি থেকে বেরোতে বাধ্য হয়েছে।

এই সমস্তটাই হয়তো অন্যরকম হতো যদি ও নিজের অনুভূতির প্রকাশ করতে পারতো। যখন মেয়েটি বাকি সকলের সঙ্গে ইশারায় কথা বলার চেষ্টা করে সকলকে সবটা বোঝাতে চাইছিলো। ওর দিকে তাকিয়ে নিজেকেই খুব অসহায় বোধ হচ্ছিলো। ও‌ চেষ্টা করছে সকলকে নিজের পরিস্থিতি বোঝানোর, তবে হয়তো ওইখানে দাঁড়িয়ে ওর বাবা মা ছাড়া আমরা কেউই তেমনভাবে বিষয়টাকে উপলব্ধি করতেই পারিনি।

যাইহোক পরবর্তীতে নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম এবং অফিসারের রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে ওদেরকে আর দেখতে পাইনি। হয়তো সকলে মিলে বাড়ির পথে রওনা করেছে, ঠিক যেমনভাবে আমরাও কাজ মিটিয়ে রওনা করেছিলাম। তবে প্রত্যেকেই পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে নিজেদের গন্তব্যে যাত্রা করলেও, জীবন যুদ্ধটা কিন্তু প্রত্যেকেরই আলাদা।

পুলিশ স্টেশন মানেই সেখানে বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা মানুষের হয়ে থাকে। তবে আমার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতাটা এতটা হৃদয়স্পর্শী যে তা আজীবন মনে থাকবে।

হয়তো মেয়েটিকে আমি চিনি না, জীবনে আর কখনো দেখাও হবে না, কিন্তু আমি চাই ওকে ওর মতন করে বুঝতে পারে এমন একজন ওর জীবনে আসুক, যার কাছে অনুভূতিগুলি প্রকাশ করার জন্য কোনো ভাষার প্রয়োজন হবে না। চোখের ভাষাই‌ হবে যথেষ্ট।

আমার এই প্রার্থনাটুকু ঈশ্বর যেন শোনেন এটুকুই কাম্য। বাকি আপনাদের কারোর জীবনে এইরকম কোনো ঘটনার সাক্ষী থাকার অভিজ্ঞতা আছে কিনা, সেটা মন্তব্যের মাধ্যমে অবশ্যই জানাবেন।

সকলে ভালো থাকবেন। শুভরাত্রি।

Sort:  
Loading...


image.png
Curated by: @pandora2010

 3 days ago 

Thank you for your support 🙏.

Coin Marketplace

STEEM 0.06
TRX 0.30
JST 0.054
BTC 70872.28
ETH 2078.95
USDT 1.00
SBD 0.51