ফিরে দেখা!

চেনা জায়গায় দাঁড়ালেই অতীত যেনো থাবা বসায়! অব্যক্ত মলিন হয়ে যাওয়া যন্ত্রণাগুলো পুনরায় সতেজ হয়ে যায়!
না চাইলেও ফিরে ফিরে আসে সেই সব মুহুর্ত আর মুখগুলো যেগুলো সেই অতীতের পাতায় ফেলে এসেছিলাম!
ভাবনাগুলো মাঝেমধ্যে উস্কে দিয়ে যায়, কিছু মুখ, কিছু মুহুর্তকে!
আজ প্রায় দশ বছর হলো বিজন দেশে ফিরেছে, শহরের চেহারায় পরিবর্তন সুস্পস্ট!
গজিয়েছে নতুন ইমারত, হারিয়ে গেছে পুরোনো কত বাড়ি, কত চেনা গলি, কারণ এখন শহরে ফ্ল্যাট কালচার তাই রাস্তার দিক পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেক জায়গায়।
তবে সেই দশ বছর আগে ফেলে রেখে যাওয়া কৃষ্ণচূড়া গাছটি আজও ফুলে ঢাকা, শহরে ফিরে গত রবিবার বেলুড় মঠ পরিদর্শন করতে গিয়ে মনে মনে এই কথাগুলোই ভাবছিল বিজন!
পার্থক্য একটাই, দশ বছর আগে সে এখানে একলা আসেনি, সঙ্গে ছিল তার ভালোবাসা পর্ণা!
তাদের ভালোবাসার সাক্ষী গিয়ে আজও গাছটিকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বিজনের সেই দিনগুলির কথা মনে পড়ছিল, যখন পর্ণার চুলে এক্ থোকা কৃষ্ণচূড়া ফুল বিজন গুঁজে দিয়েছিল, বেশ লাগছিল সেদিন পর্ণাকে!
তারপর অনেকক্ষণ সেই গাছের নিচে বসে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, আর কত আশার কথা দিয়েছিলাম একে অপরকে!
ভাবনা, পরিকল্পনা আমাদের হাতে থাকলেও সেটির বাস্তবায়নের অনেকখানি বোধকরি থাকে সময় এবং ভাগ্যের হাতে!

আজকে একলা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে, পুরোনো দিনের অনেক মলিন স্মৃতির পাতায় তুলে রাখা প্রথম ভালবাসাকে মনে করছিল বিজন।
সময়ের হাত ধরে কেটে গিয়েছে অনেকগুলো বছর, কিন্তু আজও বিজন একলাই রয়ে গেছে, শেষ দেখা করতে তারা এসেছিল এই কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচেই!
যেদিন পর্না জানিয়েছিল তার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে!
বিজন একটুও অবাক হয়নি, কারণ অনেকদিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে দুজনের কথা চলছিল।
সমবয়সী দুজনেই, কাজেই পর্নার বাবা, মা আগামী দশ বছর মেয়েকে নিজেদের কাছে রাখতে নারাজ।
উন্নত সমাজের আজও একটি গোপন পরিহাস!
বিজন পারেনি পর্নাকে ধরে রাখতে, কারণ দশ বছর আগে সে ছিল ছাত্র, রোজগার ছিল না, ডাক্তারি পড়তে বিদেশ যাবার পরিকল্পনার কথা পর্ণাও জানত, কিন্তু এই দশ বছর নেহাত কম সময় নয়, বিশেষ করে ওর বাবা মায়ের কাছে বড্ডো বেশি মনে হয়েছিল এই সময়সীমা পর্যন্ত নিজের মেয়েকে তাদের কাছে রাখার জন্য।
যদি বিদেশে অন্য মেয়েকে বিয়ে করে বিজন সেখানেই রয়ে যায়? যদি আর কোনোদিন দেশে না ফেরে?
এমন যুক্তি তর্কের মাঝে হেরে গিয়েছিল বিজন আর পর্নার ভালোবাসা।
বিজন একলা বসে ভাবছিল, না জানি কেমন আছে আজ তার প্রথম ভালবাসা! সে কি জানে আজও বিজন তাকে ঘিরেই বেঁচে আছে?
সে কি আমাকে ভুলে গিয়েছে? একবার নিজেকে অপরাধী মনে করলো বিজন! না, না! এসব ভাবতে নেই, আজ সে কারোর স্ত্রী! হতে পারে সন্তানের মা!
মন ভালবাসার ক্ষেত্রে যুক্তি তর্কের ধার ধারে না, তাই পরক্ষণেই বিজন ভাবলো যদি একবার পর্নাকে সে দেখবার সুযোগ পেতো!
লোভী! বিজন তুই লোভী! যে জীবন থেকে চলে যায় সে অতীত, এবার তুই সামনে এগিয়ে চল!
নিজের মনের সাথে শুরু হলো অন্তর্দ্বন্দ্ব।
নিজের মনকে সে বললো, আমি তাকে এবং তার পরিবারকে জানাতে চাই, আমি আজও পর্নাকে ভুলিনি! দেখুন আমি নিজের উদ্দেশ্যে সফল হয়ে ফিরে এসেছি, এত অবিশ্বাস? ছিঃ!
আমি তো তাকে গ্রহণ করতাম, না করলেই বা কি? নিজের সন্তানকে কি নিজের কাছে রাখতে পারতেন না?
লেখাপড়ায় তো পর্না মেধাবী ছিল, বিয়েটাই কি শেষ রাস্তা ছিল!
মাথায় একরাশ প্রশ্নের ভিড় একসাথে জমা হতে শুরু করলো, এবং অবশেষে বিজন ঠিক করলো সে একবার জানবেই কতবড় লায়েক ছেলের হাতে নিজের মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন পর্নার বাবা, মা!

সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে চললো বিজন, দাঁতে দাঁত চেপে একরাশ অভিমান, অভিযোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল বিজন, কিছুদূর এগোনোর পরেই, পাশ থেকে কে যেন তার নাম ধরে ডাকলো, সম্ভিত হয়ে বিজন পিছন ফিরল খানিক দূরে গিয়ে! পড়ন্ত সূর্যের আলোতে যাকে বিজন দেখলো, সে আর কেউ নয় পর্না!
পাথরের মত দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে বিজন তাকিয়ে রইলো পর্নার দিকে, সত্যি কি সে তাকেই দেখছে, নাকি এতক্ষণ ধরে তার কথা ভাবার তার মস্তিষ্ক তাকে ধোঁকা দিচ্ছে!
এক্ পা দু'পা করে কাছে এগিয়ে আসতে দেখে বিজনের বিশ্বাস হলো সে স্বপ্ন দেখছে না, তার ভালোবাসা তার চোখের সামনে।
কি হয়েছিল পর্নার সাথে গত দশ বছরে? সে কি বিয়ে করেছিল? কেনো সে একই দিনে এসেছিল সেই কৃষ্ণচূড়ার কাছে?
যদি এই প্রশ্নগুলো জানতে আগ্রহী থাকেন, চোখ রাখবেন আমার পরবর্তী লেখায়, এই ভালবাসার কি পরিণতি পেয়েছিল?

