গতিপথ!

কখন কার সাথে কার কিভাবে পরিচয় হবে, সেটা কখনও কখনও জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়!
হয়তো কিছু পরিচিতি পূর্ব পরিকল্পিত থাকে সৃষ্টিকর্তার দ্বারা!
যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী নন, তারা আমার কথায় বাধ সাধতে পারেন! কাজেই, সেই বিতর্কিত বিষয়ে গিয়ে লেখার মুল বিষয়টিকে দিক ভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিতে চাইছি না!
আমার মনে হয়, এই যে জীবনের গতিপথের সাক্ষাৎ সেটা কিন্তু বিনা কারণে হয়না।
কেউ এই চলার পথের শেষ সময় পর্যন্ত সঙ্গী হয়ে থাকে, আবার কেউ হারিয়ে যায় মাঝপথে, অনেক ক্ষেত্রে এই চলার পথ হয় স্বল্প পরিসরের।

তবে, এই সাক্ষাৎ এর পিছনে থাকে কিছু না কিছু শিক্ষা, বার্তা আবার অনেক সময় দেখা যায়, একটি আস্ত সম্পর্ক গড়ে ওঠে গতিপথের হাত ধরে।
এমনটাই এ বছর একাধিক জায়গায় ঘুরতে গিয়ে বিজন উপলব্ধি করেছে।
আজ বিজনের বয়স পঁয়তাল্লিশ, স্থল, জল তথা আকাশ সব গতিপথেই একাধিক মানুষের সংস্পর্শে এসেছে বিজন! দেশ হোক কিংবা বিদেশ।
এখনো বিজন পালিয়ে বেড়ায়, কারণ? আজও বিজন নিজেকে অপরাধী মনে করে, তাই কাজের মাঝে ব্যস্ত রেখেছে নিজেকে।

সেদিন পর্নার সাথে দেখা হবার পর, বিজন জানতে পেরেছিল, ঠিক কি হয়েছিল পর্নার সাথে!
বিয়ের ঠিক পাঁচদিন আগে আইবুড়ো ভাত খেতে পর্না গিয়েছিল ওর মাসীর বাড়িতে।
খাওয়া শেষে পর্না অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিল, বাড়ির সকলে বিষয়টিকে সাধারণ ভাবে নিয়েছিল সেদিন, কিন্তু বাড়িতে ফেরার পরেও যখন পর্না সুস্থ্য হলো না, তখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কাছাকাছি পারিবারিক ডাক্তারের কাছে।
ডাক্তার কিছু ব্লাড টেস্ট করতে দিয়েছিল, এবং যখন রিপোর্ট এসেছিল, তখন জানা যায় পর্নার শরীরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে!
ছেলে পক্ষ সাত তাড়াতাড়ি বিয়ে ভেঙে পালিয়েছিল, এবং এরপর দশটা বছর চলেছে পর্নার শারীরিক আর মানসিক লড়াই!

সে লড়েছে কিন্তু রোগের থেকেও একাকীত্বের সাথে!
আর, যেদিন কৃষ্ণচূড়া গাছের কাছ থেকে পুরোনো স্মৃতি আকড়ে অভিমান নিয়ে বিজন ফেরার পথে পর্নাকে দেখেছিল, সেদিন প্রকৃত সত্যিটা জেনেছিল পর্নার মুখ থেকে, মুহূর্তের মধ্যে নিজের অভিমান দিক পরিবর্তন করে নিজের কাছেই ফিরে এসেছিল!
সত্যি তো! সবটা না জেনে কাউকে বিচার করা, কারোর প্রতি একটা ধারণা তৈরি করা তো অন্যায়, আর পর্না তো তার প্রথম ভালবাসা!
সেক্ষেত্রে, যদি সে বিজনকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করেও নিতো, সেটা মেনে নেওয়া, এটাই তো নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক!
আরো একবার নিজের চোখে ছোট হয়ে গিয়েছিল সেদিন বিজন নিজের চোখে, সাথে কেঁদে ফেলেছিল বিজন, তবে পর্না কিন্তু এই চোখের জলের পিছনের প্রকৃত কারণটা বুঝে উঠতে পারেনি, সে ভেবেছিল তার অসুস্থতা বিজনের খারাপ লাগার কারণ।
এরপর বিজন দিনরাত এক্ করে ছিল পর্নার সাথে, তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া, উন্নত চিকিৎসা করবার সর্বোচ্চ প্রয়াস সে করেছে, কিন্তু দশটা বছর পর্না এই রোগের কাছে কার্যত আত্মসমর্পণ করে দিয়েছিল!
এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করবার পরিবর্তে।
তারপর বিজনের সাথে দেখা হবার পর বাঁচতে চেয়েছিল পর্না!
বিজন সর্বশক্তি দিয়ে মাত্র ছয়মাস পর্নাকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল।
![]() | ![]() |
|---|
আজকেও বিজন যেখানেই যায়, সঙ্গে থাকে পর্না!
জীবনের সব গতিপথেই আজও বিজনের মনের অন্তরালে রয়ে গেছে তার প্রথম ভালবাসা।
কখনও ভিড়ের মাঝে আবার কখনও একলা বসে বিজন ভাবে তার ভালোবাসা অসম্পূর্ণ নাকি সম্পূর্ণ?
একটা জীবনে কতকিছু অসম্পূর্ণই রয়ে যায়, আবার অনেক অসম্পূর্ণতা, সারাজীবনের অনেক সম্পূর্ণতা কে চাপিয়ে যায়!
পর্না এবং বিজনের ভালোবাসা সেই অর্থে পরিণতি পায়নি সঠিক, কিন্তু এই যে বিজনের,
পর্নাকে আজও মনের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখে পথচলা, যা আজও তার গতিপথ রুদ্ধ করতে পারেনি এটাই বা কম কি?

এখনো বিজন কোথাও গেলে শারীরিক ভাবে একলা গেলেও মনে করে নিয়ে যায় তার প্রথম ভালবাসাকে, অনেক পরিণতি পাওয়া ভালোবাসা যেটা করতে অক্ষম!
না পাওয়ার যন্ত্রণাই কি ভালবাসাকে বাঁচিয়ে রাখে? পেয়ে গেলে, সময়ের সাথে কি সস্তা হয়ে যায় ভালোবাসা?
এই প্রশ্ন বিজনের নয়, এই প্রশ্ন আমার,
একজন লেখিকা হিসেবে! কালের স্রোতে যখন বহু বছরের একসাথে পথচলা ভালোবাসায় ভাটা পড়ে, সেখানে শুধু স্মৃতি বিজড়িত ভালোবাসা আঁকড়ে বেচে থাকতে পারেন কতজন?
জীবনের গতিপথে আজ হয়তো বিজন একলা কিন্তু তার এই একলা চলার পথে আজও মেরুদণ্ড হয়ে রয়ে গেছে পর্না!



