অন্তরালের ছায়া সিজন ২, পর্ব ১ : গোধূলির রক্তিম ছায়া
পর্ব ১ : গোধূলির রক্তিম ছায়া
পশ্চিম আকাশে সূর্য এতক্ষণে পরে গিয়েছে, তবুও আকশে সূ্র্যের আলোর কিছুটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে । রাস্তার পাশে একাদ্বারে সারি সারি দাড়ানো পুরোনো সৌরবিদ্যুতের লাইটগুলো কেবলই জ্বলে উঠলো, কিছু কিছু লাইট জ্বলছে, আবার মাঝে একটা দুটো টিম টিম করে জ্বলছে নিভছে, আবার কিছু লাইট পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মাঝে মধ্যে সন্ধ্যার ভাবটা কিছুটা আছঁ করা যাচ্ছে । মহল্লার একটা দুইটা গলির মাথায় আবার একটা দুুটো করে রিক্সাও দাঁড়িয়ে আছে । বর্ষাকাল চলায় তাদের ভাগ্যেও কিছুটা ভাটা পরেছে তা তাদের বসে থাকার অবস্থা দেখেই বুঝা যাচ্ছে স্পষ্টভাবে । তাছাড়াও বিকেল এর পর থেকেই এই জায়গাগুলো একটু বেশিই নিরব হয়ে আসে, আর বিশেষ করে বর্ষার সময় হওয়ায় নিরবতা কিছুটা আগেই হানা দেয় এই এলাকায় । যাইহোক, রাস্তা ধরে কিছুটা এগুলেই মেইনরোড আর তার পাশেই মূল শহর কিন্তু মেইনরোডের আগে অনেকটা জায়গাই আবার পরিত্যক্ত হয়ে আছে বেশ কিছু বছর যাবৎ ।
হাতে একটি সিগারেট জ্বালিয়ে রাস্তার পাশ বরাবর নিরব ভঙ্গীতে, মাথা নিচু করে হেটে যাচ্ছে নাবিল । হালকা হালকা বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে আধা-মেঘলা আকাশ থেকে । নাবিল আপন মনে হেটে যাচ্ছে শহরের দিকে ঠিক তখনই সে লক্ষ্য করলো যে সামনে ময়লার স্তূপ নিয়ে যেন একটি বিশেষ লড়াই তৈরি হয়েছে । না, কোনো মানুষের না । লড়াইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বীরা হলো মহল্লার একদল বিড়াল (যাদের কোনোটির চোখে সমস্যা তো কোনোটির কান নেই অথবা কোনোটির শরীরে ক্ষতের চিহ্ন) ৭-৮ টি কুকুর (তাদের শরীর এর এমন এক অবস্থা চোখ অর্ধেক খোলা রেখেই তাদের শরীরের হাড় গুনা যাবে) আর আছে এক ঝাঁক কালো কাক । তারা লাড়াইয়ে অংশ নেয় নি কিন্তু উপর থেকে কিছু একটার জন্য সুযোগ এর অপেক্ষায় এপাশ উপাশ করছে । নাবিল এই রাস্তার নিয়মিত পথচারী, আর আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রায়ই সে এমন লড়াই দেখতে পায় স্তূপের পাশে, আর সে সাবধানতার সাথে পাশ কাটিয়ে চলে যায় কিন্তু আজকের হানাহানীটা কিছুটা বেশিই, তাই সে আরেকটু সাবধানতার জন্য যখন সে ভালো করে তাকালো স্তূপের দিকে ঠিক তখনেই এর মাঝে একটি কাক অন্য এক বিড়ালের কাছ থেকে কিছু একটা নিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় সেই জিনিসটা এসে পরে তার হাতে থাকা ব্যাগে । সে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে জিনিসটা যখন ফেলতে গেলো তখন তার কাছে হঠাৎ কেমন যেন মনে হলো । এক সেকেন্ড এর মধ্যেই তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে এলো, তার কাছে জিনিসটা খুবই পরিচিত মনে হচ্ছে কিন্তু আসলে বুঝে উঠতে পারছে না । বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করার জন্য সে তার সাথে থাকা মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে যেই না ধরলো তার চোখ নিমিষেই ছানাবড়া হয়ে উঠলো । তার পরিচিত জিনিসটা অন্য কিছু না এটা মানুষের হাতের একটি আঙ্গুল।
১৫ মিনিট আগেও যে এলাকা ছিল নীরবতায় ঢাকা, মুহূর্তের মধ্যেই তা জনসমুদ্রে পরিণত হলো । পুলিশ এসেছে, DB এসেছে, তদন্তকারী দলসহ আরো বেশ কয়েকটি ইউনিট এসেছে একে একে । তাছাড়া কৌতূহলরত মানুষ তো আছেই । ময়লার স্তুপ যেখানে ছিলো সেটা ছিলো একটি প্রাইভেট প্রোপার্টি, কাজেই পুলিশ সেই প্রোপার্টিসহ ক্রাইম স্পট তাদের অধীনে নিয়ে নিয়েছে ।
পুলিশ এসে লাশকে উদ্বার করেছে, আপাদত লাশকে সনাক্ত করার মতো অবস্থাতে নেই । কুকুর বিড়ালে মিলে লাশের অনেকটাই ক্ষতি করেছে । এর মধ্যে আবার একটি চোখ উপ্রে ফেলা হয়েছে খুব সম্ভবত এই কাজটা কাক এর করা । হাতের এবং পায়ের মিলিয়ে সর্বমোট ৪টি আঙ্গুল ছিড়ে ফেলা হয়েছে যার মধ্যে কেবল একটি লাশের পাশে এবং একটি নাবিলের দ্বারা উদ্বার হয়েছে । তাছাড়া ময়লা আবর্জনার ফলে লাশের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পরেছে।
পাশেই দারোগা সাহেব এবং তদন্ত দলের কিছু লোক নাবিলের জবানবন্দি নিচ্ছেন । নাবিল নির্দোষ থাকলেও তো আর তাকে সন্দেহের বাহিরে রাখা যায় না । নাবিল তাদের সাথে কথা বলছেন কিন্তু এত বড় একটি ঘটনার পরে সে কোনোভাবেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না । এক কনস্টেবল তাকে পানি খাওয়ায় এবং আবার জবাবদিহি শুরু হয় । নাবিল সামনের শহরেই একটি এটিএম বুথে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করেন রাতের সাময়ে । তাই সে এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন এই যাওয়া আসা করে, সে বিষয়টি আরো খুলে বলে যে এখানে ময়লার কাছে প্রায় সবসময়ই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় কুকুর বিড়ালদের কিন্তু কাক খুবই কম সময় আসে । আজকে এর ব্যতিক্রম হয় নি । সে আরো বিস্তারিতভাবে সম্পূর্ণ ঘটনা তাদের বলে । এরই মাঝে ফতুল্লাহ্পুর থানার (বর্তমান ঠিকানা) ওসি এসে উপস্থিত হন । নতুন নতুন পোস্টিং হয়েছে এবং বয়সের ছাপটাও তেমন পরেনি এখনো । উপযুক্ত বয়স হলেও এখনো সেই যৌবনের রেশ রয়ে গেছে, নাম তার মতিউর । যাইহোক, উনি উপস্থিত হয়ে সম্পূর্ণ ঘটনার একটি ব্রিফিং নিলেন একজন অফিসারের কাছ থেকে এবং তিনি নাবিলকে বিদায় দিয়ে দেন আর বলেন,
— নাবিল সাহেব শুনছেন!
— জ্বী স্যার?
— আপনাকে এখন যেতে দিচ্ছি বলে এই না যে আপনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে গিয়েছেন, এমনও হতে পারে ঘটনাটা আপনিই করে তার পর গল্প তৈরি করেছেন একটা ।
নাবিলের ভয়ে গলা শুকিয়ে এসেছে । সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো—
— আজ্ঞে স্যার আমি তো একজন সাধারন সিকিউরিটি গার্ড, স্যার আমি মানুষ মারতে যাবো কেন?
— আচ্ছা যাইহোক সেটা তদন্তের পরেই জানা যাবে । আপাদত এখন আর দেশের বাহিরে যাবেন না, কিছু ইনফরমেশন এর জন্য আপনাকে থানায় আসতে হতে পারে । কল দিলে চলে আসবেন ।
— আচ্ছা স্যার ঠিক আছে । আর এমনিতেও আমার বাড়ি ছাড়া যাওয়ার আর কোনো জায়গাও নাই স্যার ।
— এত কথা বলেন কেন? যা বলা হয়েছে তা শুনেন । (রাগ হয়ে)
— জ্বী স্যার ।
সকল ফরমালিটিস এর পর পুলিশ লাশ গ্রহন করলো, আর পাঠিয়ে দেওয়া হলো পোস্টমর্টেম এর জন্য । অফিসে বসে বসে মতিউর কেস ফাইলটাতে নজর বোলাচ্ছে । সে স্পট থেকে সংগ্রহকৃত আলামতগুলো খুব নজর দিয়ে দেখছে আর ঘটনাটি আঁচ করার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই ধাঁধা মিলাতে পারছে না । কারণ লাশকে তারা যে অবস্থায় পেয়েছে, তাতে মামলাটির নিষ্পত্তি করা সহজ হবে না । এর সাথে আছে আরো অনেক ক্ষত যা লাশকে আরো করে তুলেছে বিভৎস । লাশের চোখ একটি ওপড়ানো হাতে পায়ে শরীরে অসংখ্য স্পট, তাছাড়া হাতের এবং পায়ের আঙ্গুলে ক্ষতসহ আরো অনেক আলামত । তবে মতিউরের পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে ধারনা করতে পারছে যে এখানে সকল ক্ষতি কুকুর বিড়াল এই কেবল করে নি কিছু পূর্বেরও রয়েছে । এর উপরে, এখন পর্যন্ত থানায় কোনো ডায়েরিও হয়নি, যাতে কেসটা একটু এগোতে পারে । অর্থাৎ লাশ এখনো বেওয়ারিশ হয়েই আছে । লাশের একটি সাধারণ পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসেছে তবে সেটি দিয়ে তেমন কোনো কাজ হচ্ছে না কেসটিতে । সব মিলিয়ে মতিউরের মাথায় এক বিরাট হট্টগোল তৈরি হতে লাগলো । সে আর প্রেসার নিতে না পেরে মনে মনে চিন্তা করলো যে —
— আর পারছি না এখন, এবার বাসায় যেতে হবে, বাসায় গিয়ে রেস্ট নেওয়া দরকার ।
এই কথা মনে মনে চিন্তা করে সে অফিস থেকে বেরিয়ে গেলো । আর বের হতে হতে ডিউটি অফিসারকে বললো—
— রফিক সাহেব, আমি গেলাম মেইন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে খবর দিবেন ।
— জ্বী স্যার ।
সকাল ৭ টায় হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে মতিউরের । ফোন হাতে নিয়ে দেখলো ডিউটি অফিসার রফিকের কল এসেছে । সে কল রিসিভ করলো—
— হ্যালো!
— আসসালামু আলাইকুম স্যার ।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম । রফিক সাহেব? বলুন কি বলবেন ।
— স্যার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসে গিয়েছিল রাত ২ টা ৩০ মিনিটে, সিভিল সার্জন স্যার মিটিং এর মধ্যে থাকায় রাতে রিপোর্ট আসতে দেরি হয় । সকালে তদন্ত অফিসার এসে রিপোর্ট চ্যাক করে আর অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পায় । আপনি যদি এখন একটু আসতে পারতেন তবে ভালো হতো ।
— কি বলেন আপনি? আমাকে আরো আগে কল দিবেন না! আচ্ছা রাখেন আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি ।
— জ্বী স্যার, আসসালামু আলাইকুম ।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম ।
ডিউটি অফিসারের কন্ঠে যে আতংক দেখা গিয়েছিলো সেটিতে মতিউর একদমে ঘাবড়ে যায় নি । মতিউর এর আগে এমন কেস আরো দেখেছে এবং সফলভাবে শেষও করেছে, আর তাই সে জানে এইরকম কেসে এমন অনেক আচমকা ঘটনা ঘটে যাওয়া স্বাভাবিক । সে চিন্তা করলো অফিসে গিয়ে একটি বিশেষ কমিটি তৈরি করতে হবে এই বিষয়ে । যাইহোক, সে ঠান্ডা মাথায় রেডি হয়ে থানায় আসে। অফিসে বসেই তদন্ত অফিসারসহ বাকি গুরুত্বপূর্ণ সকলকে তার রুমে তলব করলো । সকলকে একত্রে করে প্রথমেই সে কেস সম্পর্কে কথা শুরু করল এবং তার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে কিছু ধারনাও দিলো, আর পরবর্তীতে সে বিশেষ কিছু চৌকস অফিসারদের নিয়ে একটি আলাদা কমিটি গঠন করলো । এবার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেখার পালা । সে তদন্ত অফিসারকে উদ্দেশ্য করে বললো—
— নিজাম সাহেব রিপোর্টটা আমাকে দিন আমি একটু দেখি, আর আপনি কি কি খোঁজে পেলেন একটু বলেন ।
— জ্বী স্যার, ছেলেটির মৃত্যু হয়েছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এর ফলে । লাশের ঊরু আর হাতের মেনই নার্ভস কাটা হয়েছে । ক্ষত দেখে বুঝা যাচ্ছে এগুলো কোনো সাধারণ চুরি বা এই জাতীয় কোনো অস্ত্র দিয়ে কাটা হয়নি ধারনা করা হচ্ছে এগুলো সার্জিক্যাল নাইফ দিয়ে আঘাত করা হয়েছে । তাছাড়া শরীরের যে আরো কিছু বিশেষ ক্ষত লক্ষ্য করা গিয়েছে সেগুলো মৃত্যুর প্রায় ৪-৬ ঘন্টা পরের অর্থ্যাৎ সেগুলো ক্রাইম স্পটে হয়েছে ।
ফাইলে চোখ বোলাতে বোলাতে মতিউর বললো—
— হুমমম, অর্থ্যাৎ কুকুর বিড়াল দ্বারা হয়েছে ।
— জ্বী স্যার । কিন্তু আরেকটি অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে লাশের জিহ্বা কাটা, একেবারে দুই টুকরো ভাবে পেয়েছে মুখের ভিতরেই ।
হঠাৎ করে ফাইল থেকে মাথা তুলে ব্রু কুঁচকে মতিউর বলে উঠলো —
— কি বলেন? তাই নাকি!
— জ্বী স্যার । কিন্তু স্যার, যখন আমরা গিয়ে লাশ সংগ্রহ করেছি তখন তো আমরা বুঝতে পারি নি ।
— হ্যাঁ তার মানে খুনি যখন তার জিহ্বা কেটেছে তখন হয়তো সে জীবিত ছিলো অথবা মারার সাথে সাথেই এই কাজটি করেছে আর তার পরেই সে বডির মুখকে আবার বন্ধ করেছে কোনো ভিন্ন উপায়ে ।
— হতে পারে স্যার, তবে বডির জিহ্বাকে পরিক্ষা করার জন্য হেডঅফিসে পাঠানো হয়েছে । সেই রিপোর্ট আসলেই বুঝা যাবে জিহ্বা আগে কাটা হয়েছে কি-না পরে ।
— হ্যা ঠিক বলেছেন।
কিছুক্ষনের জন্য রুম পিনড্রপ সাইলেন্ট হয়ে আছে, আর সবাই এভিডেন্সগুলো ভালো করে যাচাই বাচাই করছে । সকলেই সর্বোচ্চ মনযোগ দিয়ে নিজ নিজ কাজ করে যাচ্ছে, যেন কোথাও কোনো কিছু ছুটে না যায় । হঠাৎ বাহিরে কিছু একটা হয়েছে বলে কমিটির এক সদস্য মনে করেন এবং বাহিরে আসেন । এসে দেখতে পেলেন শহরের মেয়র এসেছেন আর কথা বার্তা বলছেন । ক্ষমতার জোরে যেন সেই জ্ঞান টুকুও হারিয়ে গিয়েছে যে কোথায় এসে কেমন আচরণ করতে হয় । যাইহোক, ওই পুলিশ সদস্য আবার মেয়র সাহেবকে খুব মান্য করেন ওনি মতিউরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে গেলেন মেয়রের কাছে আর সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
— আপনি এখানে স্যার, কোনো সমস্যা হয়েছে কি?
— আরে সমস্যা হইবো না তো কি, জ্বালা কি আর একটা নাকি? এলাকায় খুন হয়ে গেলো, পুরো শহর রেখে লাশ ফেলে গেলো আমার ফেক্টোরির সামনেই, আমার ছেলেটা গেছিলো পাহাড়ে ঘুরতে কালকে সকাল তাইকা ওর লগে কথা কইবার পারতাছি না । তোমার ওসি স্যার কই? ডাকো ওনারে ।
— জ্বী আপনি বসেন আমি স্যারকে জানাচ্ছি।
এই বলে সেও ভিতরে চলে গেলো, আর গিয়ে দেখলো লাশ নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে আর দরকারি কথা হচ্ছে । মতিউর জিজ্ঞেস করেছিলো যে আগামিকাল থেকে আজকে পর্যন্ত ২৫-৩০ বছরের মধ্যে কি কোনো নিখোঁজ ডাইরি হয়েছে আমাদের বা আমাদের আসেপাশে কোনো থানায়? পাশ থেকে আরেক অফিসার বলে উঠলো—
— না স্যার আপনি আসার আগেই আমি খোঁজ নিয়েছিলাম, কিন্তু এমন কোনো ডাইরি এখনো হয়নি ।
— স্যার মেয়র সাহেব এসেছেন, আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন । কথায় কথায় বললো তার ছেলেকে নাকি কাল থেকে ফোনে পাচ্ছে না ।
— ওনাকে বসতে বলেন আমি আসছি । (কিছুটা সন্দেহ নিয়ে)
মতিউর কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিলে রাখা সকল ডকুমেন্টস গুছিয়ে সকলকে বিদায় দিয়ে দিলেন তার রুম থেকে । সবাই বের হয়ে আসার ৩ মিনিট পরে উনিও বের হয়ে আসলেন এবং মেয়র সাহেবের কাছে গিয়ে উপস্থিত হলেন । উনি মনযোগ দিয়ে প্রথমে মেয়র কে লক্ষ্য করলেন এবং তিনি দেখলেন মেয়র বেশ কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছেন ফলে সম্পূর্ণ মুখে এক অদ্ভুত কালো ছায়া নেমে এসেছে । যাইহোক মতিউর মেয়রের সামনে গিয়ে বসলেন । বসতেই মেয়র হুঁশে এলো আর জিজ্ঞেস করলো—
— কি ওসি সাহেব দিনকাল কেমন যাচ্ছে? চাপ কি খুব বেশি নাকি! আপনাকে দেখা যায় না যে তেমন!
— এইতো আছি আরকি । গতকালকের কেসটা একটু জটিলও বটে তাই আরকি চাপে আছি কিছুটা । তো আপনি বলুন কেন আসতে হলো হঠাৎ?
— আরে ভাই আর কইয়েন না, লাশে ত আমারে ঝামেলায় ফালাইয়া দিলো । আজকে আমার ফ্যাক্টোরি থাইকা বড় চালান যাওয়ার কথা এখন আপনেরা এইনো সিনগালা করে দেওয়ায় আমার মালডি বাহিরও হইতে পারতাছে না ।
— এখন কি করতে পারি আপনার জন্য?
— দেখেন না একটু কোনোভাবে মালগুলা নি বাহির করা যায়! পরে আবার আপনেরা আপনাদের কাজ করতে থাকলেন অসুবিধা নাইতো । (মুখে মুচকি হাসি নিয়ে)
— কি বুঝাতে চাচ্ছেন আপনি? স্পটে এখনো অনেক আলামত রয়েছে যা আমাদের প্রয়োজনে দরকার হতে পারে আর এর মাঝে আমি আপনাকে..........!
— দেখেন না ভাই একটু উপরে নিচে দিয়া নি..... (হাসির মাত্রা আরো বারিয়ে এবং আরেকটু কাছে গিয়ে)
— ভাই দেখেন আমাদেরকে আমাদের কাজ করতে দেন, আর আমি এটা কখনো হতে দিবো না, অযথা কথা বলে লাভ নাই । আরো কোনো কথা থাকলে বলেন নয়তো আসতে পারেন ।
— ওইলো ঠিক আছে, নতুন আইছেন তো তাই আরকি আন্তাজ করতে পারতাছেন না, আচ্ছা সমস্যা নাই দেখামনে আপনের বিষয়ডা পরে । (কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে)
— আচ্ছা ঠিক আছে ভাই ।
মেয়র উঠে হাঁটা শুরু করেছে পিছন থেকে আবার ওসি মতিউর বলে উঠলো—
— মেয়র সাহেব, দাড়ান একটু ।
— জ্বী....
— আসেন বসেন আরেকটা কথা আছে ।
— বলেন যলদি আমার কাম আছে আরো ।
— শুনতে পেলাম আপনার ছেলের সাথে নাকি যোগাযোগ হচ্ছে না আপনার গতকাল থেকে ।
— হ পাহাড়ে ঘুরতে গেছে এর জন্যই মনে হয় নেটওয়ার্ক পাইতাছে না । (মুখে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে)
— আমরা কালকে যে লাশটা পেয়েছি সেটা কি আপনি দেখছেন একবা....
— আরে থামেন ত মিয়া, কিছু কইতাছি না দেইখা আবুল তাবুল কওয়া শুরু করছেন । ছেলে পাহাড়ে গেছে বেড়াইতে আইসা পরবো কালকে । আপনি আপনার কাম করেন । (মতিউরের কথা আটকিয়ে)
এই বলে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো মেয়র ।
এভাবেই কেটেগেলো একটি দিন । পরের দিন বিকালে আবার মেয়র হাজির । এবার আর তেমন কোনো হাঁক ডাক নেই শান্তভাবে এসে চলে গেলেন মতিউরের রুমে । হঠাৎ মেয়রকে দেখে সেও কিছুটা ইতস্তত বোধ করে । পরে আবার শান্ত হয়ে মেয়রের দিকে তাকালো । আজকে যেন তার মুখটা একটু বেশিই বিষন্ন । চেয়ারে বসে হুট করে বলে উঠলো —
— ভাই ছেলেডার সাথে ২ দিন যাবৎ যোগাযোগ নাই । আজকে সব বন্ধু বান্ধব আইসা পরার কথা, সব বন্ধুরা আইসা গেছে কিন্তু আমার ছেলে আসে নাই । ওদেরকে জিজ্ঞেস করসি পরে জানতে পারসি যে আমার ছেলে নাকি ওদের সাথে যাই এই নাই ।
— কি বলেন এইসব? তো কি করবেন এখন চিন্তা করেছেন কিছু? আপনি তাহলে এখন প্রথমে একটা সাধারণ ডায়রি করেন আর আপনার ছেলের বয়স কত?
— আচ্ছা ভাই, আমার ছেলের বয়স ভাই ২৬ বছর ।
— আচ্ছা আপনি এখন ডায়রিটা করেন আর আমার সাথে মর্গে চলেন যদি না কিছু মনে করেন । কারণ আপনার প্রোপার্টিতে লাশটি পাওয়া গিয়েছে আর লাশটিও বেওয়ারিশ তাই আপনাকে বলছি ।
— আচ্ছা ভাই ঠিক আছে ।
মেয়র থানায় ডায়রি করে মতিউরকে নিয়ে বের হতে হতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে । মতিউর ওনাকে নিয়ে ডুকলেন মর্গে । কেবল একটা হলুদ আলো জ্বলছে একপাশের দেয়ালে আর রুমের মধ্যে রাখা আছে ২ টি লাশ । এর মধ্যে মেয়রের সম্পত্তি থেকে আনা সেই লাশ থেকে কাপড় সড়াতেই মেয়র সাহেব হাউমাউ করে উঠলেন ।
— বাবা!!! হায় হায় এ কি হলো, বাবা তুই এইনে পইরা আছোস? বাবা আমি তরে বাহিরে খোঁজতেছি বাবা । বাবা কেমনে কি হইয়া গেলো রে........ ।
মতিউর বিষয়টি আগেই কিছুটা বুঝতে পারলেও কিছু বলে নি । যাইহোক মতিউর এখন আর মেয়র সাহেবকে তেমন কিছু বলছে না, তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে মেয়র সাহেবকে নিয়ে বের হয়ে আসলেন । তারপর সকল ফরমালিটি শেষ করে লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হলো রাতে ।
পরেরদিন সকালে মতিউর রুমে বসে ফাইল দেখছে, ওমনি এক কনস্টেবল হাতে রিপোর্ট নিয়ে ঢুকলো, যেটা হেড অফিস থেকে এসেছে । মতিউর রিপোর্ট নিয়ে দেখা শুরু করলো, আর তখনই দেখতে পেলো জিহ্বাটি আসলে কাটা হয়েছে সে জীবিত থাকা অবস্থাতেই । সম্পূর্ণ রিপোর্ট পড়ে শেষ করার আগেই তার মোবাইলে কল আসলো । বাজারের খালের পাশে ট্রলার মেরামতের এক দোকানের পাশে আরেকটি অর্ধ-গলিত লাশ পাওয়া গিয়েছে ।
চলবে...
অন্তরালের ছায়া সিজন ১, শেষ পর্ব : প্রতিশোধের রক্তঝরা নীরবতা

Twitter
https://x.com/BokhtiarMr90788/status/1958825256782541212?t=IS91mRgN2bW5HVRFov2RAw&s=19
https://x.com/pussmemecoin/status/1958760646218326474?t=IS91mRgN2bW5HVRFov2RAw&s=19
https://x.com/BokhtiarMr90788/status/1958825514035970483?t=IS91mRgN2bW5HVRFov2RAw&s=19
https://coinmarketcap.com/community/post/367224341
অন্তরালের ছায়া সিজন ২, পর্ব ২ : তরঙ্গিনী