পবিত্র কুরআনের তাফসির সিরিজ:পর্ব১ সুরা বাকারার আয়াত ১৭

ভুমিকা: সুরা বাকারা হলো পবিত্র কোরআন এর সবচেয়ে বড় সুরা। মহান আল্লাহ তায়ালা এই সুরার ১৭ নং আয়াতে মোনাফিকদের শোচনীয় অবস্থা বর্ণনা করেছেন। আসুন এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা জেনে নেয়।

মুল আয়াত:مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَّا يُبْصِرُونَ

অনুবাদ:মোনাফেকদের উপমা হলো ঐ ব্যক্তির মতো যে অন্ধকারে আলো প্রজ্বলিত করে। অতঃপর যখন তার চারপাশ আলোকিত হয়ে যায়। তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের জ্যোতি নিয়ে যান আর তাদের নিবিড় অন্ধকারে ছেড়ে দেন ফলে তারা কিছুই দেখতে পারে না।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা:

১)ইশতেকাক (اشتقاق) - শব্দমূল বিশ্লেষণ

استوقد (ইস্তাওকাদা): মূল ধাতু 'و-ق-د' (ওয়াকদ)। ইস্তাফ'আল (استفعাল) বাব থেকে আসার কারণে এর অর্থ—চেষ্টা ও শ্রম দিয়ে আগুন জ্বালানো। অর্থাৎ মুনাফিকরা ঈমানের মেকি আলো পেতে অনেক চেষ্টা করে।

أضاءت (আদাআত): মূল ধাতু 'ض-و-ء' (দউ)। এর অর্থ হচ্ছে তীব্র উজ্জ্বলতা।

يبصرون (ইউবসিরুন): মূল ধাতু 'ব-স-র' (ب-ص-ر)। এর অর্থ কেবল চোখে দেখা নয়, বরং উপলব্ধিসহ দেখা।

২)ইলমুল মাআনী (معاني) - বাক্যতত্ত্ব
এই আয়াতে বাক্যের গঠন ও শৈলী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:

تشبيه تمثيلي (উপমা): এখানে কোনো একক বস্তুর সাথে তুলনা করা হয়নি, বরং একটি অবস্থার সাথে অন্য একটি অবস্থাকে তুলনা করা হয়েছে। মুনাফিকদের অবস্থা সেই ব্যক্তির মতো যে আলো জ্বালিয়েও অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

التعبير بالماضي (অতীতকালের ব্যবহার): আয়াতে ‘استوقد’ (আগুন জ্বালালো) এবং ‘ذهب’ (নিয়ে গেলেন) শব্দগুলো অতীতকালীন ক্রিয়া। এটি নিশ্চিত করে যে, মুনাফিকদের এই দুর্গতি সুনিশ্চিত এবং অবধারিত।

حذف المفعول (কর্ম উজ্জ্ব রাখা): ‘لا يبصرون’ (তারা দেখে না) এর পরে কী দেখে না তা উল্লেখ করা হয়নি। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, তারা কোনো সঠিক পথই দেখতে পায় না—এটি তাদের চরম বিভ্রান্তির প্রতীক।

৩)ইলমুল বয়ান (بيان) - বর্ণনাশৈলী
এখানে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যণীয় হলো তামসীল (تمثيل) বা রূপক বর্ণনা:

النور (আলো): এটি ঈমান ও হিদায়াতের রূপক।

الظلمات (অন্ধকার): এটি কুফর, নিফাক এবং আযাবের রূপক।

জ্যোতি বনাম আগুন: লক্ষ্য করুন, শুরুতে ‘نار’ (আগুন) বলা হয়েছে কিন্তু পরে ‘নূর’ (আলো) কেড়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আগুনের দুটি গুণ—আলো ও দহন। আল্লাহ তাদের ‘আলো’ (উপকার) কেড়ে নিয়েছেন কিন্তু ‘দহন’ (আজাব) অবশিষ্ট রেখেছেন।

৪)ইলমুল আরুজ (عروض) ও ক্বিরাত
কুরআন কোনো কবিতা নয়, তাই এতে ছন্দের মাত্রা বা 'বাহার' (Meter) খোঁজা হয় না। তবে এর ক্বিরাত ও তিলাওয়াতের মধ্যে একটি স্বয়ংক্রিয় ছন্দময়তা রয়েছে।

আয়াতের শেষে 'লা ইউবসিরুন' (لَا يُبْصِرُونَ) এর যে সুর, তা পরবর্তী ১৮ নম্বর আয়াতের 'লা ইয়ারজিউন' (لَا يَرْجِعُونَ) এর সাথে মিলে একটি চমৎকার অন্ত্যমিল তৈরি করে, যা পাঠকের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে।

আশা করি সুরা বাকারার ১৭ নং আয়াতের এই ছোট্ট ব্যাখ্যাটি আপনাদের উপকারে আসবে। আমাদের সকলের উচিত পবিত্র কুরআনের এই শিক্ষাগুলোকে নিজ জীবনে প্রতিফলন ঘটানো এবং মুনাফিকি থেকে দূরে থাকা।

আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আপনার একটি গঠনমূলক মন্তব্য আমাকে পরবর্তী পোস্ট লিখতে উৎসাহিত করবে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

ধন্যবাদান্তে,
মুফতি নাজিমুদ্দিন হাসান

Sort:  
Loading...

Coin Marketplace

STEEM 0.06
TRX 0.30
JST 0.055
BTC 74180.35
ETH 2343.17
USDT 1.00
SBD 0.52