আত্মকাহিনী-০১ বন্ধু হারানো বেদনা।

আশা করি "আমার বাংলা ব্লগ" পরিবারের সবাই ভালো আছেন। আলহামদুলিল্লাহ, মহান সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে আমিও ভালো আছি।আজ আমি আপনাদের সাথে "আত্মকাহিনী-০১ বন্ধু হারানো বেদনা" শিরোনামে একটি জেনারেল রাইটিং পোস্ট করলাম।

images.jpeg

Source

সময়টা ছিল ২০০৬ সালের বর্ষাকাল।আমি তখন ঝিনাইদহ জেলার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান কাসেমুল উলুম ক‌ওমী মাদ্রাসায় মিজান জামাতের ছাত্র।মিজান জামাতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা আমরা মোট সতের জন বন্ধু ছিলাম।তারমধ্যে চুয়াডাঙ্গা জয়রামপুরের সরোয়ার ছিল আমাদের বন্ধু।সরোয়ারের সাথে আমার সখ্যতা ছিল বেশ ভালো।আমরা ক্লাসে সবসময় পাশাপাশি বসতাম।রাতে পাশাপাশি বিছানায় ঘুমাতাম।বলা যায়,দু'জনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল। আমাদের মাদ্রাসায় নিয়ম ছিল, যাঁরা লজিং খায়, তাঁরা ঝড়বৃষ্টির দিনে বিকেলেই লজিং বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসবে।আমি লজিং খেতাম আর সরোয়ার বোর্ডিংয়ের খাবার খেত।

ঘটনাটি যেদিন ঘটে সেদিন ছিল বুধবার। সারাদিন আকাশে মেঘের ঘনঘটা।আসরের নামাজের পর লজিং বাড়ি থেকে খাবার আনতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।এমন সময় সরোয়ার আবদার করে বললো চলো রেল স্টেশনে যায়।আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম যে,আকাশে প্রচুর মেঘ,তুমি এখন রেল স্টেশনে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলছো তোমার মাথা ঠিক আছে? সরোয়ার তখন উত্তরে বলেছিল, আমার বোনের বাড়ি যশোর। আগামীকাল আমি আমার বোনের বাড়ি বেড়াতে যাবো। সকালের ট্রেন কয়টায় জেনেই চলে আসবো,চলো যায়।আমি তাঁকে না করে দিয়ে লজিং বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম।

লজিং বাড়ি থেকে ফিরে মাগরিবের নামাজ আদায় করে প্রতিদিনের ন্যায় পড়াশোনা শুরু করেছিলাম।এদিকে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল।রাত প্রায় দশটা ,ঘুমানোর সময় হলে হঠাৎ করেই সরোয়ারের কথা মনে পড়েছিল।আরে সরোয়ার যে এখনো ফিরে আসেনি।তখন বন্ধু নাঈমকে বিষয়টি জানালে,নাঈম তাৎক্ষণিকভাবে বোর্ডিংয়ের দায়িত্বে থাকা একজন শিক্ষককে বিষয়টি অবহিত করেছিল।শিক্ষক মহাশয় সরোয়ারকে খুঁজতে আমাদের দুজনকে সেই রাতেই কালীগঞ্জ শহরে পাঠিয়েছিলেন।আমরা দুজন বৃষ্টির মধ্যেই কালীগঞ্জ শহরের পরিচিত অধিকাংশ জায়গায় সরোয়ারকে খুঁজে ব্যর্থ হয়ে মাদ্রাসায় ফিরে গিয়েছিলাম। এদিকে আমাদের শিক্ষক মোবাইলের মাধ্যমে সরোয়ারের বাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়েছিলেন কিন্তু কোথাও সরোয়ারের খোঁজ মেলেনি।

অনেক খোঁজাখুঁজির পরে বন্ধুরা সবাই রাতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। পরেরদিন বৃহস্পতিবার মাদ্রাসা বন্ধ থাকায় ফজরের নামাজের পর আমরা লুডু খেলে সময় কাটাচ্ছিলাম।এমন সময় হুজুর আলী নামে এক মুরব্বি চাচা খবর পাঠিয়েছিলেন,রেল লাইনে একটি মাদ্রাসা ছাত্রের লাশ পড়ে আছে।খবর শুনে যেন আঁতকে উঠেছিলাম।মুখ দিয়ে বের হয়েছিল, সরোয়ার নাতো? সবাই দৌড়ে গিয়েছিলাম লাশ দেখতে।লাশ দেখার পর যেন আকাশ ভেঙ্গে মাথায় পড়েছিল।সব বন্ধুরা যেন দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম।কারণ,এইতো আমাদের প্রিয় বন্ধু সরোয়ারের নিথর দেহ রেল লাইনে পড়ে আছে।

সেদিন সরোয়ারের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করতে চেষ্টা করেছিলাম। আশপাশের বন জঙ্গল কিছুটা এলোমেলো ছিল,যা দেখে মনে হয়েছিল যে,এই বন জঙ্গলের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়েছিল।তারপর প্রশাসন সরোয়ারের লাশ নিয়ে পোস্টমর্টেম করেছিলেন।আমাদের কাছে পোস্টমর্টেমের সেই রিপোর্ট আজ‌ও অজানা। বন্ধু সরোয়ারের মৃত্যুর বিষয়টি আমাদের কাছে আজও রহস্য‌ হয়েই থেকে গেল। সরোয়ারের সেই হৃদয় ছোঁয়া মুচকি হাঁসি এখনো মনে পড়ে।তাঁর সাথে করা প্রতিটি খুনসুটি হৃদয়কে বিগলিত করে।

তাঁর কথা মনে হলেই বের হয়ে আসে, মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকম দান করুন।


আমার আজকের পোস্ট সম্পর্কে আপনার মূল্যবান মন্তব্য আশা করছি।

সকলের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আবারো নতুন কোন পোস্টে দেখা হবে।

Coin Marketplace

STEEM 0.06
TRX 0.32
JST 0.063
BTC 71491.28
ETH 2245.32
USDT 1.00
SBD 0.50