গোধূলির ডায়েরি || পর্ব-৩: প্রাচীরের আড়ালে কান্নাহাসি
আজকের সন্ধ্যাটা এক অদ্ভুত মায়াবী অন্ধকারে ঢাকা। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোটা কুয়াশার চাদর ভেদ করে দাদুর জীর্ণ ডায়েরির ওপর এসে পড়েছে। দাদু আজ ডায়েরিটা খুললেন না। কেবল একটা শুকনো পাতা ডায়েরির ভাঁজ থেকে বের করে খসখস শব্দে ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিলেন। তার চোখের কোণায় এক ফোঁটা জল চকচক করে উঠল, যা তিনি চট করে চশমাটা মুছে লুকিয়ে ফেললেন।
আমার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন,
"শোনো ছোকরা, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কী জানো? আমরা সবাই একাকীত্বের ভয়ে মরি, অথচ একা থাকার সব আয়োজন আমরা নিজেরাই করি।"
দাদু বলতে লাগলেন, “মানুষ বড় বিচিত্র জীব। সে চায় কেউ তাকে ভীষণভাবে ভালোবাসুক, তার নীরবতা বুঝে নিক, তার ক্ষতগুলো ছুঁয়ে দিক। কিন্তু একই সাথে সে চরম ভীত। সে ভয় পায়, কেউ যদি তার ভেতরের অন্ধকারটা দেখে ফেলে, তবে হয়তো তাকে ঘৃণা করবে। এই ভয়ের তাড়নায় মানুষ নিজের চারপাশে এক অদৃশ্য, দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে তোলে। নিজেকে লুকিয়ে ফেলে এক মিথ্যে অহংকারের আবরণে।”
বৃদ্ধ একটু থামলেন, একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে আকাশের দিকে চাইলেন।
“তারপর কী হয় জানো? সেই প্রাচীরের অন্ধকার কোণে বসে মানুষটা প্রতিদিন একা একা কাঁদে। সে অপেক্ষা করে, কেউ একজন এসে তার এই কঠিন প্রাচীরটা ভেঙে ফেলুক। কিন্তু বাইরের মানুষ তো শুধু বাইরের দেয়ালটাই দেখে, ভেতরের কান্নাটা শুনতে পায় না। মানুষ আসলে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে বাঁচে—সে চায় কেউ তাকে খুঁজে পাক, অথচ সে নিজেই নিজেকে এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখে যেখানে আলোও পৌঁছায় না। আমরা ভালোবাসার কাঙাল, কিন্তু বিশ্বাসের দেউলিয়া।”
দাদু আবার ডায়েরিটা হাতে নিলেন। বাতাসটা যেন আরও ঠাণ্ডা হয়ে এলো।
"তাই বলছি ছোকরা, যদি কাউকে ভালোবাসতেই হয়, তবে তার দেয়ালটা ভাঙার অপেক্ষা করো না। বরং তার দেয়ালের ওপাশে লুকিয়ে থাকা ভীত শিশুটাকে আলতো করে ডাক দিও। কারণ এই শহরে সবাই আলো খোঁজে, অন্ধকারের সঙ্গী হতে কেউ চায় না।”
