নিঃশব্দ শহরের মানুষটা

in Tron Fan Clublast month (edited)

Gemini_Generated_Image_iq4t43iq4t43iq4t.png

শহরটা কখনো ঘুমাতো না।
রাতে আকাশে তারা কম, কিন্তু আলো বেশি।
তবুও শহরের ভিড়ের মাঝেও মানুষ একা হতে পারে—এটা বুঝেছিল আরিফ খুব দেরিতে।

আরিফের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। সে থাকে ঢাকা শহরের এক ছোট্ট ভাড়া বাসায়। চাকরি করে একটি প্রাইভেট অফিসে। প্রতিদিন সকাল ৯টায় বের হয়, রাত ৮টার আগে ফেরে না। বাইরে থেকে দেখলে তার জীবন খুব সাধারণ—একটা চাকরি, কিছু সহকর্মী, মাঝে মাঝে ফেসবুকে হাসিমুখের ছবি।

কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে ছিল এক বিশাল শূন্যতার বাসিন্দা।

বৃষ্টির রাত

সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল।
বৃষ্টি মানেই আরিফের মনে পড়ে যেত অতীত।

একসময় তার জীবনে ছিল মায়া নামে একটি মেয়ে। মায়া খুব হাসত।
তার হাসিতে এমন এক উষ্ণতা ছিল, যেন শীতের সকালে প্রথম রোদ।

কিন্তু মানুষ সবসময় এক থাকে না।
সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, সম্পর্ক বদলায়।

মায়া বিদেশে চলে গেল উচ্চশিক্ষার জন্য। প্রথমে কথা হতো, ভিডিও কল হতো, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকা হতো। তারপর একদিন কথা কমে গেল। তারপর আরো কম।
শেষমেশ শুধু "ভালো থেকো" শব্দটা থেকে গেল।

আরিফ সেদিন প্রথম বুঝেছিল—
বিদায় শব্দটা ছোট, কিন্তু তার ভিতরে এক মহাসমুদ্র লুকানো থাকে।

নীরবতার সঙ্গে বন্ধুত্ব

মায়া চলে যাওয়ার পর আরিফ নিজের সঙ্গে কথা বলা শিখল।
বাসার ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।

সে মাঝে মাঝে ভাবত—
মানুষ কি সত্যিই একা জন্মায় আর একাই মরে?
মাঝের সময়টা কি শুধু ভরসার অভিনয়?

তার ফোনে অনেক কন্ট্যাক্ট ছিল, কিন্তু মাঝরাতে কাউকে ফোন দেওয়ার সাহস ছিল না।
কারণ সে জানত—
সবাই ব্যস্ত, সবাই নিজের জীবন নিয়ে ছুটছে।

একদিন অফিস থেকে ফিরে সে দেখল তার ঘরটা খুব চুপচাপ।
এতটাই চুপচাপ যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও ভারী লাগছিল।

সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলল—
“তুই ভালো আছিস?”

উত্তর আসেনি।

পুরনো চিঠি

একদিন আলমারি গোছাতে গিয়ে সে মায়ার লেখা একটা পুরনো চিঠি পেল।
সেখানে লেখা ছিল—
“যদি কোনোদিন আমি না থাকি, তবুও বিশ্বাস করো, তোমার জীবনে আবার আলো আসবে।”

আরিফ চিঠিটা পড়ে হালকা হাসল।
কারণ সে জানত—
আলো আসতে হলে জানালা খুলতে হয়।
আর সে অনেকদিন জানালা বন্ধ রেখেছে।

পরিবর্তনের শুরু

পরদিন সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল—
জীবনকে আবার একটু সুযোগ দেবে।

অফিসের পর সরাসরি বাসায় না গিয়ে সে গেল হাতিরঝিল।
জলের ধারে বসে মানুষজনকে দেখছিল। কেউ হাঁটছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ প্রেম করছে, কেউ একা বসে আছে—তার মতোই।

হঠাৎ সে বুঝল—
একাকিত্ব মানে একা থাকা না।
একাকিত্ব মানে নিজেকে হারিয়ে ফেলা।

সে নিজের জন্য ছোট ছোট কাজ শুরু করল।
পুরনো গিটারটা ঝেড়ে পরিষ্কার করল।
ডায়েরি লেখা শুরু করল।
মায়ের সাথে প্রতিদিন অন্তত দশ মিনিট কথা বলা শুরু করল।

এক নতুন উপলব্ধি

কয়েক মাস পর একদিন অফিসের নতুন সহকর্মী নীলা তাকে বলল,
“আপনি সবসময় এত চুপচাপ কেন?”

সে একটু ভেবে বলল,
“চুপচাপ মানুষরা অনেক কিছু অনুভব করে।”

নীলা হাসল।
আরিফ অনেকদিন পর কারো হাসিতে আবার একটু উষ্ণতা অনুভব করল।

সে বুঝল—
জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না।
একজন চলে গেলে পৃথিবী শেষ হয় না।
কিন্তু নিজেকে যদি আটকে রাখি, তখনই পৃথিবী থেমে যায়।

শেষ কথা

এক রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে আরিফ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আমি একা নই। আমি শুধু নিজের সঙ্গে আছি।”

বাতাস হালকা ছিল।
মনে হলো শহরটা একটু কম নির্দয়।

একাকিত্ব তাকে ভাঙেনি।
বরং তাকে শিখিয়েছে—
নিজেকে ভালোবাসতে।

গল্পের বার্তা

একাকিত্ব কখনো শাস্তি নয়।
এটা একটা সময়—যেখানে মানুষ নিজের ভিতরের মানুষটার সঙ্গে দেখা করে।
যে নিজেকে খুঁজে পায়, সে আর কখনো পুরোপুরি একা থাকে না।

Coin Marketplace

STEEM 0.06
TRX 0.32
JST 0.064
BTC 67570.99
ETH 2063.87
USDT 1.00
SBD 0.48