মাঝরাতের যাত্রী

মাঝরাতের যাত্রী
অনিমেষ শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিল। কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেছে। শেষ বাস থেকে যখন মোড়ের মাথায় নামল, তখন ঘড়িতে রাত ১১:৪৫। চারপাশ একদম নিঝুম, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
মোড়ের মাথা থেকে ওর বাড়ি যেতে প্রায় কুড়ি মিনিটের পথ। মাঝখানে পড়ে একটা বিশাল পুরোনো অশ্বত্থ গাছ আর একটা মজে যাওয়া পুকুর। স্থানীয়রা বলে, ওই পুকুরঘাটে রাতে নাকি একা যেতে নেই। অনিমেষ এসব বিশ্বাস করে না, হাতে টর্চ নিয়ে সে হাঁটা দিল।
সেই ছায়া
অশ্বত্থ গাছের কাছাকাছি আসতেই অনিমেষের কেন যেন মনে হলো, ওর ঠিক পেছনে কেউ একজন হাঁটছে। ও থামতেই পেছনের শব্দটাও থেমে গেল। ও ভাবল মনের ভুল। কিন্তু পুকুরঘাটের কাছে আসতেই টর্চের আলোয় দেখল— ঘাটের পৈঠায় একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। পরনে ধবধবে সাদা ধুতি, কিন্তু মাথাটা নীচু করা।
অনিমেষ একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, "দাদু, এত রাতে এখানে বসে কেন? শরীর খারাপ নাকি?"
লোকটি কোনো উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে হাতের ইশারায় সামনের অন্ধকার রাস্তাটা দেখিয়ে দিল। অনিমেষ ভাবল, হয়তো বেচারা কথা বলতে পারেন না। সে আবার হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক কদম গিয়েই ওর মনে হলো— লোকটার কোনো ছায়া পড়ছিল না!
হিমশীতল স্পর্শ
ভয়ে বুকটা ধক করে উঠল অনিমেষের। ও পিছন ফিরে দেখল ঘাটটা একদম খালি! কেউ কোথাও নেই। ও আর দেরি না করে দৌড়াতে শুরু করল। ঠিক তখনই ওর কানের কাছে খুব ঠান্ডা একটা ফিসফিসানি ভেসে এল:
"বড্ড তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছ যে খোকা... আমার বিড়িটা তো ধরিয়ে দিয়ে গেলে না..."
অনিমেষ অনুভব করল, ওর কাঁধে একটা বরফের মতো ঠান্ডা হাত চেপে বসেছে। ও চিৎকার করে টর্চ ফেলে দিয়ে দৌড়ে নিজের বাড়ির দরজায় গিয়ে আছাড় খেল। ওর বাবা দরজা খুলে ওকে ওই অবস্থায় দেখে অবাক।
পরদিন সকালে
পরদিন সকালে গ্রামের মোড়ল জানালেন, ঠিক ২০ বছর আগে ওই পুকুরঘাটে এক বৃদ্ধ বিড়ি খেতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে মারা গিয়েছিলেন। প্রতি বছর ঠিক এই দিনটিতেই নাকি তাকে ওই ঘাটে বসে থাকতে দেখা যায়।
অনিমেষের কাঁধে সেই ছোপটা এখনো আছে— একদম হাতের আঙুলের ছাপের মতো নীলচে হয়ে যাওয়া একটা দাগ। ডাক্তাররা বলেন সাধারণ 'ব্রুজ', কিন্তু অনিমেষ জানে ওটা আসলে কিসের চিহ্ন।