"চারপাশে পাহাড় দিয়ে ঘেরা ছোট্ট গ্ৰাম লাচুং এ পৌঁছানোর গল্প"

in Incredible India20 hours ago
IMG_20260509_163545.jpg
"লাচুং এ আমরা যে হোমস্টেতে ছিলাম , তার সামনে দাঁড়িয়ে তোলা অপূর্ব পরিবেশের ছবি"

Hello,

Everyone,

সিকিম ভ্রমণের গত পোস্টে আপনাদের সাথে শেয়ার করেছিলাম, নর্থ সিকিমে যাওয়ার সময় পথে দেখা সেভেন সিস্টার্স ওয়াটার ফলস এবং রাস্তার পাশের একটা হোটেলে লাঞ্চ করার অভিজ্ঞতা।

আজকে ঠিক তার পর থেকেই আমাদের যাত্রার গল্প শুরু করছি। আপনাদেরকে আগেও বলেছি নর্থ সিকিমে যাওয়ার রাস্তা বেশ কিছু জায়গায় খুবই খারাপ বলে, আমাদের ড্রাইভার দাদা খুব সকালে গ্যাংটকের হোটেল থেকে রওনা হওয়ার কথা বলেছিলেন।

IMG_20260509_143557.jpg

IMG_20260509_143558.jpg

"নর্থ সিকিমে যাওয়ার সময় কিছুটা রাস্তা ভালো। তারপরেই রাস্তার অবস্থা এমন"

তবে লাঞ্চ করার আগে পর্যন্ত যে সকল রাস্তা পেরিয়ে আমরা গিয়েছিলাম, তা খুব একটা খারাপ মনে হয়নি। কিন্তু লাঞ্চ করার পর কিছুটা এগোতেই যে দৃশ্যগুলো দেখেছি, তা সত্যিই ভয়াবহ। ল্যান্ড স্লাইড এর কারণেই মূলত রাস্তায় এই ধরনের বিপর্যয় চোখে পড়ে।

IMG_20260509_143539.jpg

IMG_20260509_143541.jpg

"সামনে থেকে প্রথমবার ল্যান্ড স্লাইডের ফলাফল দেখার অভিজ্ঞতা বেশ ভয়ংকর"

প্রথমে তো নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে মনে ভয়ও লাগছিলো এইরকম রাস্তা দিয়ে কিভাবে গাড়ি করে আমরা পার হবো‌ সেটা ভেবে। এমনিতেই পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর জন্য ভীষণ দক্ষতার প্রয়োজন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নর্থ সিকিমের দিকে গাড়ি চালানোর জন্য আরও বেশি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। আমাদের যিনি ড্রাইভার দাদা ছিলেন তিনি নিজে ১২ বছর ধরে গাড়ি চালান। তাই তার অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ ছিলো না।

IMG_20260509_142516.jpg

IMG_20260509_142622.jpg

"আমাদের গাড়ির পিছনের সিটে বসে আমি পথের ছবি তুলছিলাম"

সামনের রাস্তা বেরোনোর পর যখন পিছন দিক থেকে ফেলে আসার রাস্তাগুলো দেখছিলাম, তখন মনের মধ্যে ভয় আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠেছিলো। কারণ এই রাস্তা দিয়েই আবার আমাদেরকে ফিরতে হবে। আশাকরি ছবিগুলো দেখে আপনারাও‌ রাস্তার অবস্থা সম্পর্কে খানিকটা আন্দাজ করতে পারছেন।

IMG_20260509_144323.jpg

IMG_20260509_145835.jpg

"ট্যানেলের ভিতর দিয়ে গাড়িতে করে যাওয়ার অনুভূতি বেশ অন্যরকম। বাইরে বেড়িয়ে আমরা দেখলাম বেশ লম্বা গাড়ির লাইন।"

যাইহোক কিছুটা দূর এগানোর পর আমরা একটা টানেল এর মধ্যে প্রবেশ করলাম এবং টানেলটা পার হয়েই বেশ কিছু গাড়ির ভিড় চোখে পড়লো। ড্রাইভার দাদা জানালেন এখান থেকে গাড়ি চেক করা শুরু হয়। আসলে নর্থ সিকিমে যেখানে আমরা থাকবো সেই জায়গার নাম ছিল "লাচুং"। যেখানে প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ। আর ঠিক এই কারণেই লাচুং এ ঢোকার পূর্বে গাড়িগুলো চেক হয়।

IMG_20260509_145636.jpg

IMG_20260509_145658.jpg

"সকল পর্যটকরা এখানেই নিজেদের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল ফেলে যান। তাই তো এতো বোতল জমা হয় প্রতিদিন।"

গাড়ির ভিতর বা নিজেদের ব্যাগে যদি এই ধরনের প্লাস্টিকের কোনো বোতল থাকে, তা আপনাকে এই নির্দিষ্ট জায়গাতে ফেটে যেতে হবে। অন্যথায় ৫০০০ টাকা ফাইন দিতে হবে। তাই আমরাও আমাদের কাছে থাকা কেনা জলের বোতল, কোল্ড ড্রিংকসের বোতল সবকিছু ফেলে দিয়েছিলাম। শুধু উন্নত মানের প্লাস্টিকের বোতলগুলো ছিলো আমাদের কাছে।

IMG_20260509_152633.jpg
"লাচুং এ‌ প্রবেশের আগে এই চেকপোস্টে সবার পারমিট জমা দিতে হয়।"

সেখান থেকে সিকিউরিটি পারপাস লাচুং চেকপোস্টে আমাদের প্রত্যেকের পারমিট জমা দিতে হলো। সেগুলো অবশ্য আগে থেকেই করে রেখেছিলেন আমাদের ড্রাইভার দাদা। তাই সেখানে সেগুলো জমা দিয়ে আমরা লাচুং এর উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম।

IMG_20260520_214046.jpg

IMG_20260509_151330.jpg

"দুর থেকে দেখা গুরুদুয়ারার ছবিটি তুললাম, কারনটা লেখাতেই উল্লেখ করেছি।"

ওপরে শেয়ার করা ছবিটাতে আপনারা হয়তো বুঝতে পারছেন গুরুদুয়ারার একটা বিল্ডিং চোখে পড়ছে। ড্রাইভার দাদা বললেন ২০২৩ সালে ল্যান্ড স্লাইডের কারণে যখন প্রচুর পর্যটকেরা এখানে আটকে পড়েছিলেন, তখন সেই সকল পর্যটকদের এই গুরুদুয়ারাতেই থাকা, খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে তাদেরকে এখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিলো।

IMG_20260520_214425.jpg

IMG_20260519_151502.jpg

"ওয়াটার ফলসের নামটা ঠিক মনে নেই, তবে সৌন্দর্য্যটা কিন্তু এখনও স্পষ্ট মনে আছে।"

তাই গাড়ির মধ্যে থেকেই দূরের ছবিটা তোলার চেষ্টা করেছিলাম। লাচুং চেকপোস্ট অতিক্রম করার পর ড্রাইভার দাদা একটা আরও একটা ওয়াটার ফলস এর কাছে আমাদের গাড়ি দাঁড় করালেন। তখন বিকেল প্রায় চারটের কাছাকাছি বেজে গিয়েছিলো। আবহাওয়াও সেখানে যথেষ্ট ঠান্ডা ছিলো। গাড়ি থেকে নেমে সেটা আমরা আরও বেশি অনুভব করেছিলাম।

IMG_20260509_154219.jpg

IMG_20260509_154518.jpg

"ওয়াটার ফলসের সামনে দাঁড়িয়ে তোলা ছবি। তখন ভীষণ ঠান্ডা লাগছিলো।"

একেই তো সেখানকার আবহাওয়া ঠান্ডা, তার ওপর বরফ গলা জল গুলো যখন ওয়াটার ফলসের মাধ্যমে নিচে এসে পাথরের উপর পড়ে, চারিদিকে ছিটকে যাচ্ছিলো, তখন সেই জল গুলো গায়ে এসে লাগাতে আরও বেশি ঠান্ডা অনুভুত হচ্ছিলো। কিন্তু তবুও কিছু স্মৃতি ছবির মাধ্যমে ধরে রাখার জন্য, সেই ঠান্ডাকে উপেক্ষা করেই আমরা সকলেই সেখানে কমবেশি ছবি তুলেছি। আশাকরি আমাদের ছবি দেখে বুঝতে পারছেন, কি পরিমানে হাওয়া ছিলো তখন সেখানে। আমাদের চুল রীতিমতো উড়ছিলো।

IMG_20260509_154132.jpg

IMG_20260509_154137.jpg

"ওয়াটার ফলসের চারপাশের পরিবেশ অসম্ভব সুন্দর ছিলো।"

ওয়াটার ফলসটা তো সুন্দর ছিলোই, তার পাশাপাশি আশেপাশের সম্পূর্ণ প্রকৃতিও ততক্ষণে আরও সুন্দর হয়ে উঠেছিলো। মেঘের কারণে যেন মনে হচ্ছে আমরা মেঘের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে দেখতে পারবো এমন‌ মনে হচ্ছিলো।

IMG_20260509_161156.jpg
"লাচুং এর প্রবেশ পথ"

আরও কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর একটা গেট দেখতে পেলাম যেখানে লেখা ছিল "ওয়েলকাম টু লাচুং"। বুঝতে পারলাম আমরা আমাদের গন্তব্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি।

IMG_20260509_163533.jpg

IMG_20260509_163538.jpg

"লাচুং এ এই হোমস্টেতেই আমরা দুদিন ছিলাম।"

লাচুং হলো চারিদিকে পাহাড় দিয়ে মোরা ছোট্ট একটা গ্রাম, যার সৌন্দর্য্য আসলেই লিখে প্রকাশ করা যাবে না। খানিকটা দূর এগিয়ে যখন গাড়ি থামলো "ওম গ্রিন টরটয়েজ" হোমস্টের সামনে, তখন বুঝলাম এটাই আমাদের সেদিনকার ঠিকানা।

IMG_20260509_163602.jpg

IMG_20260509_163545.jpg

"হোমস্টের চারপাশের পরিবেশ। আশাকরি ছবি দেখে কিছুটা হলেও সেখানকার সৌন্দর্য্য বুঝতে পারছেন।"

গাড়ি থেকে নামার হোমস্টের দাদারা আমাদের লাগেজ গুলো রুমে নিয়ে যাচ্ছিলো। তবে আমরা যেন চারিদিকের প্রকৃতির সৌন্দর্য্য থেকে চোখ ফেরাতেই পারছিলাম না। দূর থেকে মেঘে ঢাকা পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরে পড়া ঝর্না, বারংবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলো।

IMG_20260509_164217.jpg

IMG_20260509_164529.jpg

"লাচুং এ আমাদের রুম, রুমের জানালা দিয়ে দেখা বাইরের দৃশ্য।"

কিন্তু ফ্রেশ হওয়ার প্রয়োজন ছিলো, তাই রুমে গিয়ে প্রথমে সকলেই ফ্রেশ হয়ে নিলাম। রুমটা দারুন সুন্দর ছিলো, বেশ ভালো জায়গা ছিলো রুমের ভিতরে। আমরা সেখানে গিয়ে ফ্রেশ হওয়ার পাশাপাশি, জানলা দিয়ে বাইরের প্রকৃতিকে দেখার চেষ্টা করলাম।

IMG_20260509_164554.jpg

IMG_20260509_164642.jpg

IMG_20260509_164706.jpg

IMG_20260509_164644.jpg

"রুমের ভিতরে দাঁড়িয়ে বাইরে সৌন্দর্য্য দেখতেই ব্যস্ত ছিলাম আমরা।"

যার ভিউ অসাধারণ ছিলো। যদিও মেঘে ঢাকা পাহাড় গুলো দেখেই আমরা খুশি হয়েছিলাম, তবে এটা জানতাম পরদিন সকালে যদি রোদ্দুর ওঠে তাহলে সেই দৃশ্য আরও অনেক বেশি ভালো‌ হবে।

সন্ধ্যেবেলার চা হোমস্টে থেকেই দেবে বলেছিলো, কিন্তু ততক্ষণ ঘরের ভেতরে বসে থাকতে মন চাইছিলো না। তাই প্রত্যেকেই একটু ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম এই ছোট্ট গ্রামটা পায়ে হেঁটে দেখবো বলে। বাইরে তখন টুপটাপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে, কিন্তু বৃষ্টিতে আমাদের ঘোরা বন্ধ হবে এমনটা তো হতে পারে না।তাই হাতে ছাতা নিয়ে সকলে মিলেই বেরিয়ে পড়লাম লাচুং গ্রামটা ঘোরার জন্য।

IMG_20260509_171036.jpg
"লাচুং ঘুরে দেখার জন্য আমরা সকলে তৈরি হয়ে নিয়েছিলাম।"

নিচে নামতেই দূর থেকে ভেসে আসলো লাচুং নদীর বয়ে চলার আওয়াজ, যেটা গ্ৰামের সৌন্দর্য্যকে যেন আরও বাড়িয়ে তুলেছিলো। সন্ধ্যা নেমে আসছে পাহাড়ের কোল বেয়ে, শীতের আমেজ ততক্ষণে বেশ অনুভব করতে শুরু করেছিলাম। মেঘেদের বয়ে চলা তার সাথে টুপটাপ বৃষ্টি, সব মিলিয়ে সে এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি হয়েছিলো।

যাইহোক লাচুং ঘুরে আমাদের কেমন লাগলো, সে অনুভূতিটা পরবর্তী পোস্টে শেয়ার করবো। তবে লাচুং পৌঁছানোর এই জার্নিটা আপনাদের কেমন লাগলো তা অবশ্যই মন্তব্যের মাধ্যমে জানাবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করে আজকের মত পোস্ট লেখা এখানেই শেষ করছি।

ভালো থাকবেন প্রত্যেকে। শুভরাত্রি।