যামিনীর সহচরী শশী!

আমি যামিনী তুমি শশী হে
ভাতিছ গগন মাঝে!
উপরিউক্ত প্রসিদ্ধ বাংলা গানটি অনেকেই শুনেছেন হয়তো, যেটি বাংলা ছায়াছবি 'এন্টনী ফিরিঙ্গী' এবং গানটির রচয়িতা কিংবা লেখক হলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।
তবে, গানটি এত জনপ্রিয়তা লাভ করে ছায়াছবিতে উত্তর কুমারের অভিনয়ের থেকেও স্বনামধন্য গায়ক মান্না দের জন্য!
আজও পুজো প্যান্ডেলের কোথাও কোথাও গানটি কানে ভেসে আসে আর আমি গানের সুর ধরে হারিয়ে যাই সেই সময় যখন বাংলা গানের একটি আলাদা গুরুত্ব ছিল গোটা ভারতে।
আজকের লেখার শুরুতেই তাই গানের দুটি লাইন লেখার শীর্ষক হিসেবে বেছে নিয়েছি, সঙ্গে গানটি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ভূমিকা বেঁধে লেখার সূত্রপাত করছি!
দিনের কদর যামিনীর চাইতে মানব সমাজের কাছে অধিক!
রাত সদাই অসুরক্ষিত, ভয়ংকর কিংবা ভয়ে জর্জরিত, আরেক দিকে বিশ্রামের সময়!
এরকম একাধিক বিশেষণ নিয়ে রাত যুগ যুগ অতিবাহিত করে দিয়েছে, এবং এখনো কিন্তু তার অন্যথা হয়নি!
নীরবতার সৌন্দর্য উপভোগ করতে যে মানস চক্ষু প্রয়োজন সেটি বোধকরি তখনই সম্ভব যদি উপরিউক্ত বিশেষণগুলোকে উপেক্ষা করা যায়!
একটা সময় এই রাত ছিল আমার প্রত্যহ সঙ্গী, যখন মাঝ রাতে উঠে প্রতিদিন অফিস পথে রওনা হতাম, বিভিন্ন ঋতুতে দেখেছি রাতের ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য!

অবাক করবার বিষয় হলো, সেই মধ্য রাতেও কত মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য আমারই মতন এই যামিনীকে আস্বাদন করতেন প্রাণ ভরে।
অন্ধকার, জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ! জীবনের ভালো দিকটিকে আমরা দিনের আলো এবং উজ্জ্বলতা কিংবা সুখের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করি;
অপরপক্ষে রাত সর্বদাই দুঃসময়ের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে!

তবে, আমার মত যারা নিঃসঙ্গ জীবন অতিবাহিত করছেন, তারা জানেন দিনের আলোয়, মানুষের ভিড়ে যে অনুভূতি প্রকাশ করা যায়না, রাতের আধার সেই সমস্ত কষ্টকে নিজের মধ্যে ধারণ করে, তার একমাত্র সাক্ষী থাকে এই যামিনী!
সেইজন্য হয়তো যামিনী নিজের পছন্দের রং হিসেবে কালো রঙকেই বেছে নিয়েছে;
যাকে খানিক আলোকিত করতে হাজির হয় শশী! অবশ্য সময়ের পরিহাসে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আকার নিয়ে সেটাও অপরিবর্তিত সত্য।
ঠিক মন খারাপ যখন যেমন থাকে,
ঠিক জীবনের অভিযোগ নিজের পাশাপশি পরিস্থিতির প্রতি যেমন হয়,
তমসার আকার যেনো শশীর হাত ধরে তেমন
সময়ের সাথে সাথে কমবেশি হতে থাকে!
রাতের মন ভালো করতে শশী আসে, সকলের জমা অভিমান, অভিযোগ একসাথে জড়ো হলে, তাকে খানিক কম করতেই বোধহয়! কে জানে? হয়তো গগন এর সদুত্তর দিতে সক্ষম!
আকাশ যে সুখ, দুঃখের সাক্ষী;
তার একদিকে দিন, যে সূর্যের তাপের সাথে আলোকিত করে শহর সাথে সাক্ষী হয়ে থাকে ব্যস্ততার! অন্যদিকে, রাত সাক্ষী থাকে মানুষের সংঘর্ষের শেষের নীরবতার!
কিছু মানুষের নীরবতার আড়ালের অব্যক্ত কষ্টের!
দিনশেষে মানুষের ক্লান্তিকর দেহে ঘরে ফেরা একাধিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। এরপর, নিজেকে পরের দিনের জন্য উৎজীবিত করা বিশ্রামের হাত ধরে, এই সবকিছুর সাক্ষী হয়ে থাকে যামিনী!
আমি, আমাকে খুঁজে পাই রাতের অন্ধকারে;
নিজেকেই নিজে বলি তাই বারে বারে...
এখন আমি দিনের আলোয় আবেগ
লুকোতে শিখে গিয়েছি,
বাকিরাও যেটা অবলীলায় পারে।
এই বেশ ভালো! নিজের সবচাইতে কাছের বন্ধু নিজে হলে বোধহয় ভালো থাকা যায়, সেখানে কেউ প্রবেশ করলেই ঝামেলা!

প্রত্যাশা, অনুভূতি, ইত্যাদি বাড়তে বাড়তে শেষমেশ হাতে পড়ে থাকে নিরাশা!
কত মানুষকে পাশে পাওয়ার প্রত্যাশা করেছি অনেক মানসিক লড়াইয়ের সময় কিন্তু সে প্রত্যাশা বাহানার হাতে বলি হয়ে গিয়েছে!
আজ আর ব্যাক্তিগত পরিসরে কারোর থেকে কিছু প্রত্যাশা নেই, কারণ এখন প্রবেশের দ্বার রুদ্ধ!
মনে কারোর জায়গা নেই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত! মানুষের দ্বিচারিতা দেখতে দেখতে, সুবিধাবাদী মনোভাব সবটাই আমাকে প্রথম প্রথম খুব কষ্ট দিয়েছে সেটা অনস্বীকার্য কিন্তু পরে বুঝলাম, তাদের এই আঘাত দেবার সুযোগ আমি তাদেরকে করে দিয়েছি!
এই ধরনের মানুষদের একটা নির্দিষ্ট সীমার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেবার ভুল আমি করেছি!
আর, এর পরিণতি স্বরূপ অনেকখানি অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পেয়েছে বটে, কিন্তু তার খেসারত আমার হৃদয়কে বইতে হয়েছে!
অনেক চোখের জলের সাক্ষী এই যামিনী, অনেক জেগে থাকা রাতের সাক্ষী এই যামিনী!
তাই, দিনের পাশাপশি রাতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে আমার জীবনে!
দিনের থেকেও আমার আমিকে
খুঁজে পেয়েছি এই রাতে;
দিনের সংঘাত মনোমালিন্য
একাধিক সংঘাতে!
আঁধারে একাকী দাড়িয়ে
অশ্রুসিক্ত নয়নের সাক্ষী যখন শশী;
অদ্যবধি যা কিছু প্রাপ্তি
আমি কি একলাই সবটার দোষী?
সুখ পেতে গিয়ে যেমন দিনের আলোকে স্বাগত জানাতে হয়, তেমনি আঁধারকে আলিঙ্গন করতে হয়,
কষ্টগুলোকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করবার জন্য।

