শিল্পী এবং শিল্প!

in Incredible India2 days ago

1000066807.jpg

দু'দিন আগে কথা বাজারে যাবার সময় বাড়ির কাছাকাছি যে গলিটা কে আমি প্রায়শঃই বেছে নি, সেখান থেকে যাবার সময় কানে ভেসে এসেছিল রেওয়াজের সুর!

মনটা অতীতে চলে গেলেও বেশ গর্বিত হয়েছিলাম এটা ভেবে এটাই তো আমার শহরের কালচার!

সত্যি বলতে শৈশব থেকেই দেখেছি একটি না একটি বাদ্য যন্ত্র বাঙালির ঘরে থাকতে।
আমি যে পাড়ায় বড় হয়েছি, প্রতি বছর আমাদের ঠিক পাশের বাড়ির মাঠে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হতো।

দেবযানী দি, যে ছিল বাংলার স্বনামধন্য গায়ক রাম কুমার চট্টোপাধ্যায় এর ছাত্রী!
যারা পুরোনো গান শুনতে ভালবাসেন তারা হয়তো,"কাদের কুলের বউ গো তুমি!" এই গানটা শুনে থাকবেন, যেটি রাম কুমার চট্টোপাধ্যায় এর গাওয়া!

কাজেই, আসে পাশের পরিবেশ ছিল শিল্প এবং শিল্পীতে ভরা।
স্কুলে শেখানো সেলাই, হাতের কাজ করতে আমার ভালই লাগতো, কিন্তু কখনই সেগুলো করতে গিয়ে মনে হয়নি, আদেও কি সেগুলো ভবিষ্যতে কোনো কাজে আসবে?

শেখার আগ্রহ বোধহয় এমনটাই হতে হয়, যেখানে বিনিময়ে কি পাওয়া যাবে, এর চাইতেও সেই শিল্পের প্রতি আগ্রহ এবং নতুন কিছু শিখতে পারার আনন্দ অধিক গুরুত্ব পায়।

1000066719.jpg

কলকাতা শহর যখন কোনো উৎসবে মেতে ওঠে তখন বোঝা যায়, এই শহরের জেলায় জেলায় রয়েছে তাবড় তাবড় শিল্পী!

কি অপূর্ব হাতের কাজ! কি অসাধারণ ভাবে পুরোনো ঐতিহ্যিকে তারা ফুটিয়ে তোলে তাদের শিল্পী সত্তা দিয়ে!

একজন শিল্পী যে অন্তরালে থেকে এই সৃষ্টিগুলো করেন, তাদের মধ্যে মুষ্টিমেয় মানুষ তার প্রতিভার যথাযোগ্য মর্যাদা পান!

শিল্প, বিশেষ করে পুরোনো হাতে তৈরি জিনিসের মূল্যায়ন আজকাল বিশেষ হয়না বটে, কারণ অনেকের মনে হয়, সময় বাঁচিয়ে অধিক উৎপাদন প্রাধান্য পাওয়া উচিত।
তাই, শিল্পের ক্ষেত্রে এখন যন্ত্রের প্রাধান্য হাতের চাইতে বেশি, বিশেষ করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আসার পর তো এটি আর অধিক চোখে পড়ে।

আগে যদি ডুয়েট গান গাইতে হতো, তাহলে উভয় শিল্পীকে স্টুডিও তে একসাথে, এক্ সময় হাজির থাকতে হতো!

আর এখন? প্রযুক্তি আজ এতটাই উন্নত যে, আলাদা করে একটি শিল্পী গেয়ে যায়( সুর কিংবা বেসুর সেই বিতর্কে যাচ্ছি না!) এরপর সুর সংযোগ করে গান রিলিস করা হয়।

1000066716.jpg

আবেগ, ভালোবাসা, আন্তরিকতা কতখানি এই শিল্পের পিছনে থাকে, সে নিয়ে আমি এখন বেশ সন্দিহান!

এটা খানিক ওই দায়সারা আর বাণিজ্যিক বিষয় হয়ে গেছে।
এখনো বহু জেলার অলিতে গলিতে পুরোনো দিনের শিল্পী তথা তাদের শিল্পের দক্ষতা নজর কাড়ে!

অনেকের হয়তো মনে থাকবে বেনারস থেকে ঘুরে আসার পর, আমি হাতে বোনা শাড়ির ছবি সহ এক্ শিল্পীর ছবি নিজের লেখায় ভাগ করে নিয়েছিলাম!

একটা শাড়ি তৈরি করতে কমপক্ষে একমাস সময় লাগে, কে দেবেন এত সময়? কার কাছে এত বিনিয়োগের সদিচ্ছা আছে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার?

সত্যি ভীষণ খারাপ লাগা কাজ করে এটা ভেবে, আগামীতে এদের পরের প্রজন্ম থাকবে কিনা!
পেটের দায় বড় দায়, সেখানে ভালো লাগার থেকেও কাজ করে বেঁচে থাকার প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ!

বছরে একটি নির্দিষ্ট সময়ের কাজ দিয়ে তো গোটা বছরের খরচ তোলা সম্ভব নয়, তাই সেটা যেকোনো দেশ হোক না কেনো, আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়, আধুনিকীকরণের সাথে যদি ঐতিহ্যকে সমানভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তাহলে শিল্পে হয়তো একটা ভারসাম্য বজায় থাকলেও থাকতে পারে।

1000066774.jpg

পুরনোদের যদি শেখানোর সুযোগ করে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো নব প্রজন্মের একাংশ শেখার আগ্রহ দেখাতে পারে, যেমনটি লেখার শুরুতে উল্লেখ করছি, অনেকেই লাভ ক্ষতির ঊর্ধ্বে শেখাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে, সেরকম কিছু নবীন এখনো আছে হয়তো সমাজে, সুযোগ এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে হয়তো তারা বিষয়টি নিয়ে এগোতে পারছে না, কে বলতে পারে!

আজকে লেখায় যে ছবিগুলো তুলে ধরেছি, সেখানে দেখতে পারবেন কি অভূতপূর্ব হাতের কাজ, কিন্তু দূর্ভাগ্য যে আজও অনেক দেশে, প্রকৃতি শিল্পের কদর খুব কম মানুষ করতে জানেন!

এটাই হয়তো শিল্প তথা কিছু শিল্পীর বিড়ম্বনা যে তারা চাইলেও এগিয়ে যেতে অক্ষম!

1000066784.jpg

আমরা যদি ঘর সাজাতে, কিংবা পরিধানের ক্ষেত্রে হস্ত শিল্পকে প্রাধান্য দিতে শুরু করি, তাহলে হয়তো উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও পেতে পারে।

যেমন পশ্চিমবঙ্গে যে পরিমাণ পাট উৎপাদিত হয়, সেটা দিয়ে একাধিক মেলায় দেখা যেতো জুটের ব্যাগ, গহনা, আর অনেক কিছু, কিন্তু যেখানে সস্তা প্লাস্টিক পরিবেশের ক্ষতি করছে, সেদিকে মানুষের আগ্রহ দেখা গেলেও এই প্রকৃতির অবদান তথা শিল্পের দিকে আজ মানুষ উদাসীন!

রইলো বাকি শিল্প, সেটি এখন নকল প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল! শিল্প আর শিল্পী উভয়কে যদি সঠিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তাহলে সেটা কেবলমাত্র যন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করে রাখলেই চলবে না বলে আমার ব্যাক্তিগত অভিমত! আর আপনাদের?

1000010907.gif

1000010906.gif