বৃষ্টি!

বৃষ্টি যেমন নতুন প্রাণের স্রোত,
তেমনি অতি বৃষ্টি ফসলের ক্ষতির কারণ হয় বন্যার হাত ধরে!
এরকম একটা নাম কেনো যে মা বাবা আমার রাখলেন! একদিকে প্রকৃতির বুকে জলধারা হয়ে শুষ্ক মাটিকে সিক্ত করলে মানুষের আশীর্বাদ পাওয়া যায়, অন্যদিকে অতিরিক্ত জলধারা মানুষের জীবনের অভিশাপ!
হ্যাঁ! আমি বৃষ্টি! মা বাবার একমাত্র কন্যা! এখন আমি লেখাপড়া শেষ করে সবেমাত্র একটি চাকরিতে যুক্ত হয়েছি।
এই তো মাস ছয়েক হয়েছে! আজকে বাড়ি ফেরার সময় বাসে বসে মানুষের নানান কথপোকথন কানে আসছিল!
এ বছর ঠিক ধান কেটে ঘরে তোলবার আগেই, যেভাবে প্রতিদিন ঝড় বৃষ্টির প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, এতে করে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী হবেই!
চাষীরা ধান কাটার সুযোগ পাচ্ছে না, পাকা ধানের গোড়ায় জল জমে ফসল নষ্ট হয়ে যাবার প্রভূত সম্ভবনা!
মধ্যবিত্তদের যে কি অবস্থা হবে কে জানে!
যে সময় প্রখর রোদ্দুর থাকবার কথা, প্রায় প্রতিদিন আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি ক্ষতিগ্রস্থ করবে ফসল এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভোগ করতে হবে মধ্যবিত্ত পরিবারের!
ইশ! ভাগ্যিস বাসের মানুষগুলোর আমার নাম জানা নেই!
প্রকৃতির এই খামখেয়ালী সত্যি সাধারণ মানুষের জীবনে কত সমস্যা বয়ে আনে!
তবে, সত্যি কি এক তরফা প্রকৃতিকে দোষারোপ করা যায়?
নাকি এর পিছনেও রয়েছে মানুষের লোভের থাবা!

অফিস থেকে বাড়ি পৌঁছতে আমার প্রায় ঘন্টা খানেক সময় লেগে যায়!
এই বৃষ্টির হাত ধরে আমার জীবনে এসেছিল কৌস্তভ!
সে এক মজার গল্প! তখন আমার ফার্স্ট ইয়ার, একটা প্রজেক্ট এর কাজে গিয়েছিলাম নবনীতার বাড়িতে, সেখানে প্রথম দেখেছিলাম কৌস্তভ কে!
কৌস্তভ নবনীতার দাদার বন্ধু, আমার সাথে পরিচয় করানোর সময় যেই নিজের নাম বলেছিলাম, সঙ্গে সঙ্গে নবনীতার দাদা বলে উঠেছিল, "এই তাড়াতাড়ি মাথায় ছাতা ধর!"
এত লজ্জা পেয়েছিলাম! অন্য সময় হলে এক কথা, কিন্তু একজন অজানা মানুষের সামনে এমন মজা আমাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছিল!
পরের দিন বলেছিলাম নবনীতাকে!
সেদিন পরিচয় করবার সময় জেনেছিলাম কৌস্তভ বিদেশ যাচ্ছে পিএইচডি করতে কেমিস্ট্রিতে!
এরপর সময় সময়ের মতো কেটে গিয়েছে, আমিও নিজের লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম!

আবারো একটি বৃষ্টির দিনে ইউনিভার্সিটি থেকে কাকভেজা হয়ে বাস ধরবো বলে এগিয়ে চলছিলাম!
হঠাৎ দেখলাম মাথার উপর ছাতা! পাশে চোখ যেতেই ভেজা চশমার কাঁচ, একগাল দাড়ির মধ্যে থেকে মুচকি হাসি নজরে পড়লেও আমি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম!
প্রশ্ন করলাম কে আপনি? উত্তর এলো, বলছি!
আগে ওই সামনে চায়ের দোকানে চলুন!
আমিও মনে মনে ভাবলাম সেটাই ঠিক হবে, দোকানে অনেক লোক ইতিমধ্যেই বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচবার জন্য জড়ো হয়েছে!
আজকাল যা দিনকাল, অচেনা মানুষকে বিশ্বাসের জো নেই!

চায়ের দোকান কাছেই ছিল, কাজেই মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম।
এরপর, আমাকে মজা করে সেদিন কৌস্তভ বলেছিল, এই প্রথম কেউ বৃষ্টির মাথায় ছাতা ধরবার সুযোগ পেলো!
আমার একদিকে রাগ হলো, অন্যদিকে অবাক হলাম! এই মানুষটি কে? সে কি আমার নাম জানে?
কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে নাম জানতে চেয়েছিলাম, কৌস্তভ নিজের নাম বলেছিল, কিন্তু এক দিনের সেই পরিচয় আমি মনেই রাখিনি!
নাম শোনবার পরেও আমার মুখের অভিব্যক্তি দেখে সে দিনের ঘটনা, সাথে নবনীতার দাদার কথা উল্লেখ করায় আমার মনে পড়লো, তবে সেদিনের দেখা কৌস্তভ আর আজকের এই কৌস্তভের চেহারায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে!
এরপর, আমার ভীতি খানিক কেটেছিল, কৌস্তভ সেদিন জানিয়েছিল এক বছর হয়েছে সে বিদেশ থেকে ফিরেছে, এখন সে একজন প্রফেসর এবং ব্যাঙ্গালোরে তার পোস্টিং!
ছুটিতে বাড়িতে এসেছে, সেই ফাঁকে নবনীতার দাদার সাথে দেখা করে ফেরার সময় একটি কাজে আমার ইউনিভার্সিটিতে এসেছিল, আর ফেরার পথে আমাকে দেখেই চিনে ফেলেছিল!
এরপর ফোন নম্বর বিনিময়, তারপর কথা শুরু হয়েছিল কৌস্তভের পক্ষ থেকেই!
প্রথম কথা শুরু হয়েছিল গতানুগতিক লেখাপড়া এবং কৌস্তভের গবেষণার সাবজেক্ট দিয়েই!
এইরকম একটি বৃষ্টির বিকেলে নিজের জানালায় বসে বৃষ্টিস্নাত ফুলগুলোকে দেখছিলাম কিভাবে তারা মাথা নেড়ে বৃষ্টিকে স্বাগত জানাচ্ছিল!

আমাদের বাড়ির জানালা গুলো বক্স করা, সেখানে বসে বই পড়তে, চা খেতে আর প্রকৃতিকে উপভোগ করতে আমার বেশ ভালো লাগে!
ফোনের স্ক্রিনে কৌস্তভের নাম ভেসে উঠতেই, ফোন তুলেছিলাম, এবং কৌস্তভ ফোনে বৃষ্টির শব্দ শুনে বলেছিল, সে বৃষ্টিতে ভিজতে চায়!
আমি কিন্তু বিষয়টি বুঝে উঠতে পারিনি, কারণ ব্যাঙ্গালোরে তখন বৃষ্টি হচ্ছিল না, কাজেই আমি তাকে কলকাতায় আসবার কথা বলেছিলাম, প্রত্যুত্তরে সে জানিয়েছিল, সে বৃষ্টিকে সারা জীবনের জন্য নিজের করে পেতে চায়!
সে চায় সারাজীবন বৃষ্টির মাথায় ছাতা ধরে থাকতে, সেদিন আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
সেদিনের কৌস্তভের ভালবাসায় ভেজা কথাগুলো আমাকে অন্তর থেকে সিক্ত করেছিল!
বৃষ্টি আমার জন্য এখনো পর্যন্ত আশীর্বাদ হয়েই এসেছে, তবে বাসের মানুষগুলোর আলোচনা শুনে মনে হলো, সকলের জন্য বৃষ্টি সবসময় আশীর্বাদ হয়ে আসে না!


Curated by: @ahsansharif