কাগজের ফুল!Bougainvillea!

বছরের পর বছর ধরে মানুষের আসা যাওয়া, ব্যস্ত শহর, গাড়ি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া সাদরে গ্রহন করে যখন অভিযোগ ছাড়াই সময়ের সাক্ষী হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে বছরের পর বছর ধরে!
এরপর একদিন আসে, যখন মানুষ নিজেদের উন্নত ব্যবস্থার জন্য এদের উৎখাত করে দেয়, তখন হয়তো এরাও মুচকি হাসি হাসে চিরতরে শায়িত হবার পূর্বে!
উপরের এই অনুভূতি আমার হয়েছিল, এই বছর নববর্ষে যখন মধ্য রাত্রে জমজমাট নিজের শহরের মানুষ নিজেদের আনন্দে মত্ত ছিল, তখন সেই ব্যস্ততা, আনন্দের সাক্ষী হয়ে মানুষের পাশে যেটি নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে ছিল, সেটি হলো, কাগজের ফুলগাছগুলি!

হিন্দিতে পরিচালক গুরু দত্ত, যিনি একজন বাঙালি অভিনেতার পাশাপশি পরিচালক ছিলেন এবং অনেকেই হয়তো জানেন না, তার নির্দেশনায় নির্মিত ছায়াছবি "কাগজ কে ফুল!"
এই ছায়াছবির বিশেষত্ব হলো, এটি ছিল ভারতের প্রথম সিনেমাস্কোপ (Cinemascope) ছায়াছবি!"

সেদিন ওই মধ্যরাতে ফুলগুলোকে দেখে আমার এই ছায়াছবিটি কথা মনে পড়ে গিয়েছিল, আমি ছায়াছবিটি দেখেছি!
এখন আর সেই অর্থে এই ধরনের নস্টালজিক ছায়াছবি কোনো চ্যানেল দেখায় না, যদি ছায়াছবি সম্পর্কে কিছু শিখতে চান, অবশ্যই ছায়াছবিটি দেখবেন, একটি রোমান্টিক কাহিনী কিন্তু অভ্যন্তরীণ বার্তা গভীর!
যাইহোক, এই যে নাম করণ কাগজের ফুল, যাকে আমরা ইংরিজিতে বোগেইনভিলিয়া, (Bougainvillea)
অনেকে বাংলায় বাগান বিলাস নামেও আখ্যায়িত করে!
নানা রঙের ফুলগুলো প্রায় প্রতি বাড়িতেই নজরে পড়ে, তবে সেদিন ওই রাতে আমি কোথাও যেনো এদের একাকীত্বের সাথে নিজের মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম!
বর্ণ রয়েছে, কিন্তু গন্ধহীন! আকৃষ্ট করবার ক্ষমতা নেই সুমধুর গন্ধ দিয়ে, নিজের বর্ণ অব্যাহত রেখে মাথা উঁচু করে একাকী দাড়িয়ে!

অহরহ গ্রহণ করছে কার্বন ডাই অক্সাইড, ফিরিয়ে দিচ্ছে অক্সিজেন!
খারাপ নিয়ে, হাসিমুখে ভালোটা ও নির্দ্বিধায় ফিরিয়ে দেওয়া যায়, এটা তো এদের কাছ থেকেই শিখেছি!
জীবনে আসা যাওয়া তো এদের মত মানুষের ও আছে, তবে পার্থক্য হলো, এদের বিশেষ কোনো প্রত্যাশা নেই, এটাই মানুষের থেকে এদের পৃথক করে।
দৃষ্টিনন্দন করতে হয়তো সক্ষম কিন্তু আকৃষ্ট করতে গোলাপ, জুঁই, রজনীগন্ধার মত অতটা সজ্জার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় না!
তবে, এরজন্যে নিজের প্রতি আক্ষেপ নেই, নিজেকে কোনো অংশে কম ভাবে না এরা, আর অধিক যত্ন ছাড়াই নিজেদের বৃদ্ধি চালিয়ে যায়!
তাই হয়তো অনেকের নজরে সস্তা! মূল্যায়ন ফুলের ক্ষেত্রেও বাজারদর কার কত সেই হিসেবেই তো হয়, তাই না?
কে বলুন তো ভ্যালেন্টাইন্স দিবস উপলক্ষে নিজের ভালবাসার মানুষকে এই কাগজের ফুল উপহার দেয়?
নাহ্! আমি অন্ততঃপক্ষে কখনও দেখিনি! আর যে ছায়াছবির কথা পূর্বে উল্লেখ করেছি, সেই ছায়াছবির মধ্যে একটি জায়গায় গুরু দত্ত (ছবিতে অভিনয় করেছেন, পরিচালনার পাশাপশি), নায়িকা ওয়াহিদা রেহমান কে বলেন, আমি কাক কে ময়ূর পুচ্ছ লাগিয়ে সুন্দর হবার প্রবাদ শুনেছি, কিন্তু এই প্রথম কোনো ময়ূরকে কাকের পুচ্ছ লাগাতে দেখলাম!
অর্থাৎ, ছায়াছবিতে তিনি পরিচালকের অভিনয় করছিলেন এবং নায়িকা হিসেবে তিনি ওয়াহিদা রেহমান কে অভিনয় জগতে আনতে চান, তার সাধারণের মধ্যে অসাধারণ সৌদর্যের জন্য, কিন্তু ছায়াছবিতে একটি পার্টির দৃশ্য রাখা হয়, যেখানে ছায়াছবির নায়িকাকে সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন পরিচালকের ভূমিকায় থাকা গুরু দত্ত!
এদিকে নায়িকা ভাবলেন, পার্টিতে সব আধুনিক মানুষ আসবেন, তাই সে নিজেকে আধুনিক সাজে সজ্জিত করেছিলেন, এবং সেটা দেখেই উপরিউক্ত উক্তিটি করেছিলেন অভিনেতা গুরু দত্ত সেই পার্টির দৃশ্যে!
অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সৌর্ন্দয্য শ্রেষ্ঠ, সেটিকে বিক্রিত করে নিজের গায়ে গন্ধ মেখে অন্যকে আকর্ষিত করবার প্রয়াস করে না


