সম্পর্কের খোঁজে!

একদিন নবীন বাবুর মনে হলো, প্রতিদিন তো বাজার থেকে এত এত জিনিষ ব্যাগ ভরে নিয়ে আসি, আজকে আরেকটু বড় ব্যাগ নিয়ে বের হবো!
চাকরি থেকে এই বছর অবসর নিয়েছেন নবীন বাবু, খেতে ভীষণ ভালবাসেন, তাই এখনও নিজেই প্রতিদিন বাজার করেন।
একাই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের অধিকাং সময়, গত বছর নবীন বাবুর মা গত হয়েছেন, এখন তিনি একলাই থাকেন পৈতৃক বাড়িতে।
যতদিন মা বেঁচে ছিলেন, ততদিন সারাক্ষণ বিয়ে নবীন বাবুর বিয়ের জন্য প্রয়াস করে গেছেন!
আমি না থাকলে তোকে কে দেখবে? এই প্রশ্ন দিয়ে প্রতিদিন নবীন বাবুকে বোঝানোর প্রয়াস করতেন তার মা, খাবার সময় পাশে বসে।
অনেক চিন্তা ভাবনা করে, আজকে রবিবার নবীন বাবু ঠিক করেছেন, বাজার থেকে তিনি ব্যাগ ভরে সম্পর্ক কিনে আনবেন।

যেমন ভাবনা, তেমন কাজ! বাজারে সকলেই নবীন বাবুকে চেনেন! প্রথমে তিনি গেলেন মাছ বাজারে, সেখানে যে বৃদ্ধ মাছ কাটে, তাকে গিয়ে নবীন বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, তার বাড়িতে কে কে আছেন?
মাছওয়ালা জানালেন তার পাঁচ ছেলে আর দুই মেয়ে!
তবে, কেউ তার এবং তার স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ রাখে না!
নবীন বাবু জানতে চাইলেন কেনো? উত্তর এলো, এই মাছের ব্যবসা করে সব সন্তানকে লেখাপড়া করিয়েছেন তিনি, কিন্তু এখন তারা বড় চাকরি করে, মেয়েদের শ্বশুর বাড়ি ধনী! তাই, বাবার পরিচয় দিতে দ্বিধাবোধ করে!

এরপর, সেখান থেকে নবীন বাবু গেলেন ডিম বিক্রি করেন যে মাঝ বয়সী লোক তার কাছে।
অনেকবার নবীন বাবু লক্ষ্য করেছেন, ওই দোকানের একটি দেওয়ালে দোকানির সাথে একটি ছেলের বাঁধানো মলিন ছবি ঝোলানো।
নবীন বাবু, জানতে চাইলেন ডিমের দোকানির থেকে, ছবিতে ওনার সাথে কে ওই ছেলেটি?
দোকানী জানায়, তার সাথে তার একমাত্র ছেলের ছবি, যে একটি পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছে, আর সেই শোকে তার স্ত্রী শয্যাশায়ী হয়ে, অবশেষে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন!
দুই জায়গা থেকে নবীন বাবুর সম্পর্ক কেনা হলো না!
অগত্যা তিনি পৌঁছলেন সবজি বিক্রেতার কাছে।
সেখানে গিয়ে তিনি একটি ছোট ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এই বয়েসে লেখাপড়া না করে সবজি বিক্রি করছো!

![]() | ![]() |
|---|
উত্তরে, ছেলেটি জানায়, সে লেখাপড়া করে রাতের বেলায়, তার বাবা এবং মা গত হয়েছে, মামার বাড়িতে থাকে, তাদের সংসারে টাকা দিতে এবং নিজের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে তাকে এই কাজ করতে হয়!
সাত সতেরো ভাবতে ভাবতে নবীন বাবুর নজরে পড়লো, একজন বিধবা বয়স্ক মহিলা ফুল বিক্রি করছেন!
তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এটা তো বিশ্রাম করবার বয়স, কেনো এখনো তিনি এই কাজ করেন?
দাঁত বিহীন মুখে একগাল হাসি হেসে জানালেন, ছেলে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, এখন তার স্বামীর বাড়িতে ছেলে আর ছেলের বউ থাকেন, আর ফুল বিক্রি করে, স্টেশনে বৃদ্ধার দিন কাটে।

এত সব সম্পর্কের পরিভাষা, সম্পর্কের পরিণতি জেনে, তিনি শূন্য হতে বাড়ি ফিরলেন, আর বাড়ির কাজের মহিলাকে বললেন, এক্ কাপ চা দিতে!
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে, আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বর্গীয় মাকে জানালেন, এই পৃথিবীতে সত্যি সম্পর্ক প্রায় বিলীন, আর যেটুকু হয়তো ছিল, সেটুকুও তোমার মত ইহলোক ত্যাগ করেছে!
আজ গিয়েছিলাম বাজারে কিছু সত্যি সম্পর্কের সন্ধানে, কিন্তু খালি ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফিরেছি!
আসল সত্যি হলো, জীবন যাত্রায় আমাদের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে কিছু মানুষ জীবনের সাথে সংযুক্ত হয়;
এর মানে এই নয়, সেই সম্পর্ক নির্ভেজাল, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে আবৃত।
বাজারে পণ্যের মত এখন সম্পর্কেও ভেজালের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকখানি, তাই এই একলা জীবনে নিঃসঙ্গতা সেই সকল মানুষের নিঃসঙ্গতার চাইতে অনেক কম, যারা সবচাইতে কাছের সম্পর্ক হারিয়েছেন, আবার কাউকে সেই সম্পর্ক পরিত্যাগ করে দিয়েছে প্রয়োজন শেষে!
নাহ্! নবীন বাবু ঠিক করেছেন, ওই বৃদ্ধাকে এবং ছেলেটি যদি তার বাড়িতে থাকতে চায় তাহলে তিনি তাদের তার কাছে রাখবেন, একেবারে ব্যাগ খালি থাকার চাইতে এই বেশ ভালো!



