খাটাশ
করোনাকালীন সময়কার কথা। গোবিন্দগঞ্জে সেই সময় বুইড়া খাটাশ এক এমপি ছিল,যার নেপথ্যে আজকের এই লেখা।
দেখুন,
আমি আপনার চিন্তাধারা কিংবা দর্শন বদলে দিতে পারব না। তবে আমার সঙ্গে যা ঘটেছিল, এই লেখায় হয়তো শুধু সেটুকুই আলোকপাত করেছি। আপনার ভালো লাগা কিংবা মন্দ লাগার সঙ্গে এই লেখার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। চাইলে পড়তে পারেন, না চাইলে এড়িয়ে যেতে পারেন।
সবেমাত্র থানার সামনের আল-ছাদেক হোটেলের গলিতে প্র্যাকটিস শুরু করেছি। যেহেতু ছোটবেলা থেকেই স্থানীয় এলাকায় বেড়ে ওঠা, তাই পরিচিতির খুব একটা ঘাটতি ছিল না। তার ওপর চেম্বারটাও ছিল নিজেদের বাসার সামনের অংশে। বলা যায়, ওই গলি দিয়ে যারা নিয়মিত যাতায়াত করত, তাদের কমবেশি সবাই চেম্বারে উঁকিঝুঁকি দিত।
বড্ড অভিমানে পেশা ছেড়েছি,সে কথা আর নাইবা বললাম। এখনো পুরোনো রোগীদের অনেকেই ফোন করে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করে। শুধু বলে দিই, ভাই, আমি আর প্র্যাকটিস করি না। সম্ভব হলে অন্য কোথাও দেখিয়ে নিন।
থাক সেসব কথা। মূল কথায় আসি।
সেই বুইড়া খাটাশ এমপি, যে পরবর্তীতে নিজের নামের সামনে মুক্তিযোদ্ধা ট্যাগ বসাতে বহু লম্ফঝম্ফ করেছিল। যদিও সে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিল,এমন অভিযোগ স্থানীয় মানুষের সন্দেহ-সচেতনতায় তখন কম ছিল না।
সেদিন রবিবার। যেহেতু নিজের বাসাতেই চেম্বার, তাই সকালে ঘুম থেকে উঠতেই দেখি, বাসার প্রধান দরজার সামনে এক মহিলার আগমন। তিনি সজোরে, একটানা প্রধান ফটকে ধাক্কা দিচ্ছিলেন।
কোনোরকমে অপ্রস্তুত অবস্থায় দরজা খুলতেই তার প্রথম কথা, আমি দাঁতের এক্স-রে করাতে চাই। ঝটপট এক্স-রে করানোর ব্যবস্থা করুন।
আমি খুব ভদ্রভাবেই বললাম,
দেখুন, এখনো তো চেম্বার খোলার সময় হয়নি। তাছাড়া আপনি কেন এক্স-রে করাতে চাইছেন, সেটাও আগে জানা দরকার। তারপরও যেহেতু এত সকালে এসেছেন, তাই বলি কি, আমি চেম্বারের রিসেপশন রুমটা খুলে দিচ্ছি। দয়া করে সেখানে কিছুক্ষণ বসুন। আমি ফ্রেশ হয়ে এসে আপনার বিস্তারিত সমস্যাটা শোনার চেষ্টা করছি।
রিসেপশন রুম খুলতে না খুলতেই মহিলার তর্ক শুরু ।
আপনি ফ্রেশ হবেন মানে? আগে এক্স-রে করেন।
সকাল সকাল বেশ ভালোভাবেই নিজের সঙ্গে ধৈর্যের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল।
তবুও তাকে ভদ্রভাবে বললাম, আগে আপনার সমস্যাটা শোনা আমার কাছে খুব জরুরি। তারপর যদি প্রয়োজন মনে হয়, সেক্ষেত্রে এক্স-রের কথা ভাবা যাবে।
মূলত এই কথাটাই আগন্তুক মহিলা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। অতঃপর শুরু হলো নিজের পরিচয় জাহির করার পালা।
জানেন আমি কে? আমি এলজিইডির অমুকের বউ। এখানকার এমপি আমার অমুক লাগে। আমি ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক দিনের জন্য এখানে এসেছি। আমার নিজের আত্মীয়দের মধ্যেও অনেক বড় ডেন্টিস্ট আছে।
আপনাকে যেটা বলছি, সেটা করুন।
সকাল সকাল তার এমন কথাবার্তার ধরন একেবারেই ভালো লাগছিল না। তারপরও যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে বললাম, আপনার সম্পূর্ণ সমস্যাটা না জানা পর্যন্ত আমি কোনোভাবেই আপনাকে সেবা দিতে আগ্রহী নই।
এই কথা শেষ হওয়ার আগেই আগন্তুক মহিলা বলা নেই, কওয়া নেই, ব্যাগ থেকে মুঠোফোন বের করে হনহন করে রিসেপশন রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
নিজেকে কোনোরকমে স্থির করে রিসেপশন রুমের দরজা বন্ধ করলাম। এরপর আবার বাসার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছি,ঠিক তখনই দেখি, সিলভার রঙের তিনটি মাইক্রোবাস এসে বাসার গলির সামনে হাজির।
এবার আগন্তুক মহিলা একা নন,সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন।
যারা এসেছিল, তাদের কমবেশি সবাইকেই মুখে চিনি।
এর মধ্যেই আমার মুঠোফোন বারবার বেজেই চলছিল। ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে কড়া মেজাজের কণ্ঠ, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ এবং একের পর এক হুমকি-ধামকি।
এমতাবস্থায় কোনোরকমে ফোন কাটতেই দেখি, আবার বেশ কয়েকজন স্থানীয় সিনিয়র ডাক্তার ফোন করেছে। তাদের ফোন ধরতেই তারা বলে দিলেন,যেভাবেই হোক, এই যাত্রায় পরিস্থিতি ম্যানেজ করো। নইলে কপালে কিন্তু দুঃখ আছে।
যাই হোক, পুনরায় রিসেপশন রুম খুলে সবেমাত্র চেয়ারে বসেছি। এর মধ্যেই পড়িমরি করে ওই আগন্তুক মহিলা সহ আরও আট-দশজন লোক রুমের ভেতরে ঢুকে পড়লেন।
ভাগ্যিস, গায়ে হাত তোলেনি। তবে মুখে যা বলেছে, তাতেই আমার চৌদ্দগোষ্ঠী এমনিতেই উদ্ধার হয়ে গেছে।কতদূর পড়েছি, কোথা থেকে পড়েছি, কার ছেলে, ব্যক্তি জীবনে কী করি,সবকিছুর হিসাব নেওয়া যেন তাদের কোনভাবেই শেষ হচ্ছিল না।
কী যে এক মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সেদিনের সকালটা কেটেছিল, তা কোনোভাবেই ভুলবার নয়।
মনে হচ্ছিল, আট-দশটি অনাহারী কুকুর একযোগে শব্দবোমা ছুড়ছিল আর তাতে বিনা বাধায় আমার ভেতরটা ফালাফালা হয়ে যাচ্ছিল ।
ফোনের অপর প্রান্তের অশ্রাব্য ভাষা, আর রিসেপশন রুমের সেই চিৎকার-চেঁচামেচি,সবকিছু এখনো কানে ভাসে।
বিশেষ করে কানে ভাসে সেই কথাগুলো,তোর মতো দু-পয়সার মানুষকে আমরা রোজ কিনি আর বেচি।
