Fetih 1453 (2012): সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ .....

in আমার বাংলা ব্লগ4 days ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।



"ফেতিহ ১৪৫৩" (Fetih 1453) মুভিটি দেখার অভিজ্ঞতা ঠিক কয়েক কথায় বলে বোঝানো কঠিন। স্ক্রিনের সামনে বসে মনে হচ্ছিল, আমি যেন পঞ্চদশ শতাব্দীর সেই ধুলোমাখা রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছি। এক অদম্য তরুণ সুলতান, তার দুর্জয় সাহস এবং একটি ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী কীভাবে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিয়েছিল, তার এক মহাকাব্যিক চিত্রায়ণ এই মুভিটি। মুভিটি শেষ হওয়ার পরও এর ঘোর যেন কাটতে চায় না। চলুন, আমি আপনাকে সেই অসাধারণ সিনেমাটিক জার্নির গল্প শোনাই, ঠিক যেভাবে আমি পর্দায় দেখেছি এবং আমার শিরায় শিরায় রোমাঞ্চ অনুভব করেছি। একটি পবিত্র ভবিষ্যদ্বাণী সিনেমার শুরুটা হয় এক অসাধারণ আধ্যাত্মিক আবহ দিয়ে। সালটা ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ, মদিনা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি বিখ্যাত হাদিস বর্ণনা করছেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু আইয়ুব আল-আনসারি (রা.)। তিনি বলছেন, "কনস্টান্টিনোপল একদিন অবশ্যই বিজিত হবে। কতই না চমৎকার সেই সেনাপতি, আর কতই না চমৎকার সেই সেনাবাহিনী!"এই একটিমাত্র বাক্য, একটি পবিত্র ভবিষ্যদ্বাণী—যাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে পুরো সিনেমার গল্প। এই ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের স্বপ্ন বুকে নিয়ে শত শত বছর ধরে অনেক মুসলিম সেনাপতি চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কনস্টান্টিনোপলের দুর্ভেদ্য প্রাচীর কেউ ভাঙতে পারেনি। এক তরুণ সুলতানের উত্থান ও স্বপ্নএরপর দৃশ্যপট পালটে যায়। সময়টা ১৪৫১ সাল। অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ মারা গেছেন এবং তার ২১ বছর বয়সী ছেলে দ্বিতীয় মুহাম্মদ (যিনি পরে 'আল-ফাতিহ' বা বিজয়ী হিসেবে পরিচিত হন) সিংহাসনে বসেছেন। তরবারি চালানোর চেয়ে বই পড়া, বিজ্ঞান চর্চা, মানচিত্র আঁকা আর রণকৌশল সাজাতেই তার বেশি মনোযোগ। মুভিতে তাকে অত্যন্ত জ্ঞানী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একজন মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে।সিংহাসনে বসার পর তার চোখের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তার একটাই লক্ষ্য—বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী, রোমানদের অহংকার, হাজার বছরের পুরনো শহর কনস্টান্টিনোপল জয় করা। তিনি ছোটবেলা থেকেই ওই হাদিসটি শুনে বড় হয়েছেন এবং তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, তিনিই সেই 'চমৎকার সেনাপতি' যাকে মহান আল্লাহ এই বিজয়ের জন্য মনোনীত করেছেন। তার উজির-নাজিররা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে এই শহর জয় করা অসম্ভব, কিন্তু সুলতান মুহাম্মদের এক কথা—"হয় আমি কনস্টান্টিনোপল নেব, নয়তো কনস্টান্টিনোপল আমাকে নেবে।"প্রস্তুতি: তোপধ্বনি ও রণসাজ সুলতান মুহাম্মদ জানতেন, শুধু আবেগ দিয়ে এত বড় শহর জয় করা যাবে না। চাই নিখুঁত বিজ্ঞান এবং আধুনিক প্রযুক্তি। মুভির এই অংশটি অসাধারণ। তিনি বসফরাস প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে 'রুমেলি হিসার' নামে এক বিশাল দুর্গ নির্মাণ করেন।একই সময়ে, আরবান (Urban) নামের এক হাঙ্গেরিয়ান অস্ত্র নির্মাতার আগমন ঘটে। আরবান এমন এক বিশাল কামান বানানোর প্রস্তাব দেন, যা কনস্টান্টিনোপলের হাজার বছরের পুরনো দেয়াল গুঁড়িয়ে দিতে পারবে। সুলতান তাকে অর্থ ও লোকবল দিয়ে সাহায্য করেন। তৈরি হয় ইতিহাসের অন্যতম বড় কামান—'শাহি তোপ' (Basilica Cannon)। মুভিতে এই কামান ঢালাই করার দৃশ্যটি এতই জীবন্ত যে, কামানের গলে যাওয়া উত্তপ্ত লোহা যেন স্ক্রিনের এপার থেকেও অনুভব করা যায়।এখানে মুভিতে আরেকটি সুন্দর উপকাহিনী আছে—সুলতানের বিশ্বস্ত সেনাপতি উলুবাতলি হাসান এবং আরবানের পালিতা কন্যা এরার মধ্যকার এক পবিত্র ভালোবাসার গল্প। যুদ্ধ ও ধ্বংসের মাঝে এই গল্পটি সিনেমায় এক স্নিগ্ধ মানবিক প্রলেপ দিয়েছে।দুর্ভেদ্য কনস্টান্টিনোপল ও অহংকারী শত্রুপক্ষঅন্যদিকে কনস্টান্টিনোপলের ভেতরে বাইজেন্টাইন সম্রাট একাদশ কনস্টান্টিন চরম অহংকারে মত্ত। তার ধারণা, থিওডোসিয়ান দেয়াল (Theodosian Walls) ভেদ করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো মানুষের নেই। তাছাড়া গোল্ডেন হর্ন (Golden Horn) বা শহরের পেছনের সমুদ্রপথে ঢোকার রাস্তা এক বিশাল লোহার শিকল দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে অটোমান জাহাজ ঢুকতে না পারে। সম্রাট ভাড়া করে আনেন সেসময়ের সেরা ইতালীয় ভাড়াটে সেনাপতি গিউস্তিনিয়ানি (Giustiniani)-কে কনস্টান্টিনোপলের দেয়ালের ওপরে তাদের দাম্ভিক পায়চারি আর বিশাল প্রস্তুতি দর্শকদের মনেও একটা সংশয় তৈরি করে দেয়—সত্যিই কি তরুণ সুলতান এই দুর্ভেদ্য দেয়াল ভাঙতে পারবেন?অবরোধ শুরু: রক্ত আর বারুদের গন্ধ ৬ এপ্রিল, ১৪৫৩। শুরু হয় কনস্টান্টিনোপল অবরোধ। সুলতান মুহাম্মদের নির্দেশে শাহি কামান গর্জে ওঠে। কামানের গোলার বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে বাইজেন্টাইন দেয়াল। মুভিতে এই যুদ্ধের দৃশ্যগুলো হলিউডের যেকোনো মাস্টারপিসকে টেক্কা দেওয়ার মতো। আকাশে উড়ন্ত জ্বলন্ত তীর, তলোয়ারের ঝনঝনানি, আর সৈন্যদের চিৎকার—সব মিলিয়ে এক নার্ভ-কাঁপানো অবস্থা।কিন্তু বাইজেন্টাইন দেয়ালগুলো এতই মজবুত এবং তাদের প্রতিরক্ষা এতই শক্তিশালী ছিল যে, বারবার আক্রমণ করেও অটোমানরা ব্যর্থ হতে থাকে। তাছাড়া ইতালীয় সেনাপতি গিউস্তিনিয়ানি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভাঙা দেয়াল মেরামত করে ফেলছিল। অন্যদিকে সমুদ্রেও অটোমান নৌবাহিনী চরমভাবে ব্যর্থ হয়। গোল্ডেন হর্নের সেই বিশাল লোহার শিকল পার হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। সুলতান মুহাম্মদ হতাশায় ভেঙে পড়েন। তার নিজের শিবিরের ভেতরের লোকেরাই তার সমালোচনা শুরু করে।অসম্ভবকে সম্ভব করা: পাহাড়ের ওপর দিয়ে জাহাজ পারাপার এই সিনেমার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং গায়ে কাঁটা দেওয়া দৃশ্যটি আসে ঠিক এরপর। সমুদ্রে পথ বন্ধ। সুলতান মুহাম্মদ তার তাঁবুতে বসে গভীরভাবে চিন্তা করছেন। হঠাৎ তার মাথায় এক পাগলাটে কিন্তু জিনিয়াস বুদ্ধি আসে। সমুদ্রপথে যখন যাওয়া যাচ্ছে না, তখন তিনি জাহাজগুলো মাটির ওপর দিয়ে নিয়ে যাবেন! হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন। সুলতান নির্দেশ দিলেন গালাতা পাহাড়ের ওপর দিয়ে কাঠের গুঁড়ি বিছিয়ে তার ওপর প্রচুর চর্বি ও তেল মাখিয়ে জাহাজ টেনে গোল্ডেন হর্নে নামাতে হবে। রাতের অন্ধকারে, মশাল জ্বেলে হাজার হাজার সৈন্য দড়ি দিয়ে টেনে টেনে বিশাল বিশাল যুদ্ধজাহাজ পাহাড়ের ওপর দিয়ে পার করছে—এই দৃশ্যটি দেখার সময় আমি আক্ষরিক অর্থেই সিটের প্রান্তে চলে এসেছিলাম। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর সৈন্যদের আকাশ-বাতাস কাঁপানো "আল্লাহু আকবার" ধ্বনি এক অবিশ্বাস্য উন্মাদনা তৈরি করে। সকালে বাইজেন্টাইন সম্রাট আর গিউস্তিনিয়ানি ঘুম থেকে উঠে যখন দেখেন তাদের সুরক্ষিত উপসাগরে অটোমান যুদ্ধজাহাজ ভাসছে, তখন তাদের চেহারার সেই আতঙ্কিত অভিব্যক্তি জীবনে ভোলার মতো নয়।চূড়ান্ত আক্রমণ: এক বীরের শাহাদাত ২৯ মে, ১৪৫৩। চূড়ান্ত আক্রমণের দিন। সুলতান মুহাম্মদ তার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন ভাষণ দেন। তিনি বলেন, "আজ আমাদের একটাই পথ, হয় গাজী হয়ে ফিরব, নয়তো শহীদ হব।"শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ। মুভির ক্লাইম্যাক্স এটি। এক ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী লড়াই। তলোয়ার, বর্শা, আর কামানের গোলায় চারপাশ অন্ধকার। ইতালীয় সেনাপতি গিউস্তিনিয়ানি যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে যায়, যা বাইজেন্টাইনদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দেয়।ঠিক তখনই মুভির সবচেয়ে আইকনিক এবং ইমোশনাল দৃশ্যটি আসে। সুলতানের বিশ্বস্ত সেনাপতি উলুবাতলি হাসান একটি অটোমান পতাকা হাতে নিয়ে দেয়ালের দিকে ছুটে যান। তাকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো তীর মারা হচ্ছে। তার বুকে, পিঠে, পায়ে অসংখ্য তীর বিদ্ধ হয়। শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু হাসান থামেন না। তিনি হামাগুড়ি দিয়ে দেয়ালের একেবারে চূড়ায় ওঠেন এবং শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগে কনস্টান্টিনোপলের দুর্গের ওপর অটোমানদের বিশাল চাঁদ-তারা খচিত পতাকাটি সজোরে গেঁথে দেন। দূর থেকে সুলতান মুহাম্মদ এবং পুরো অটোমান বাহিনী যখন সেই উড়ন্ত পতাকাটি দেখে, তখন তাদের মাঝে এক নবজাগরণের সৃষ্টি হয়। তারা প্রবল বেগে আক্রমণ করে এবং দেয়াল ভেঙে শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে।বিজয় এবং এক মহানুভব সুলতান কনস্টান্টিনোপল এখন অটোমানদের হাতে। সম্রাট কনস্টান্টিন যুদ্ধে মারা গেছেন। শহরের সাধারণ খ্রিষ্টান নাগরিকরা ভয়ে আয়া সোফিয়া (Hagia Sophia) গির্জায় আশ্রয় নিয়েছে। তারা ভাবছে, এবার হয়তো তাদের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হবে।সাদা ঘোড়ায় চড়ে একজন বিজয়ী বীরের বেশে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ শহরে প্রবেশ করেন। তিনি সোজা আয়া সোফিয়ার দরজায় যান। ভারী কাঠের দরজা খোলা হয়। ভেতরের আতঙ্কিত নারী-পুরুষ ও শিশুরা ভয়ে কুঁকড়ে আছে। কিন্তু মুভির এই শেষ দৃশ্যটি সুলতান মুহাম্মদের বিশালত্ব এবং ইসলামের প্রকৃত মানবিক সৌন্দর্য তুলে ধরে।সুলতান ঘোড়া থেকে নামেন, অত্যন্ত শান্ত পায়ে ভেতরে ঢোকেন। তিনি একটি ছোট খ্রিষ্টান বাচ্চাকে কোলে তুলে নেন এবং সবার উদ্দেশ্যে বলেন, "ভয় পেয়ো না। আজ থেকে তোমাদের জীবন, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের ধর্ম সম্পূর্ণ নিরাপদ। তোমরা স্বাধীন।" তার এই কথা শুনে গির্জার ভেতরে থাকা মানুষের চোখে স্বস্তির পানি নেমে আসে। আটশো বছর আগের রাসূল (সা.)-এর সেই পবিত্র ভবিষ্যদ্বাণী অবশেষে সত্য হয়।
   "ফেতিহ ১৪৫৩" মুভিটি শেষ হওয়ার পর আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম। একটি সাম্রাজ্যের পতন এবং একটি নতুন যুগের সূচনা কীভাবে ঘটেছিল, তা এত নিখুঁতভাবে এই সিনেমায় তুলে ধরা হয়েছে যা অভাবনীয়। সুলতান ফাতিহ-এর ভিশন, তার অটুট বিশ্বাস, বীর হাসানদের আত্মত্যাগ, আর যুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর কৌশল—সবকিছু মিলিয়ে এটি এক মাস্টারপিস। ইতিহাসকে যারা ভালোবাসেন, যারা জানতে চান কীভাবে ইচ্ছা আর বিশ্বাস দিয়ে অসম্ভবকে জয় করা যায়, তাদের জন্য এই মুভিটি একটি অসাধারণ অনুপ্রেরণা।

সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Coin Marketplace

STEEM 0.07
TRX 0.30
JST 0.056
BTC 74377.85
ETH 2344.46
USDT 1.00
SBD 0.50