Lion of the Desert (1981): ইতালীয় উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লিবিয়ার ..
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
"লায়ন অব দ্য ডেজার্ট" (১৯৮১)—সিনেমাটি দেখার পর আমার ভেতরের অনুভূতিগুলো যেনো এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন টাইম মেশিনে করে ফিরে গেছি ১৯২৯ সালের সেই রুক্ষ, তপ্ত লিবিয়ার মরুভূমিতে। একজন সাধারণ মানুষ, যিনি পেশায় একজন শিক্ষক, ছোট ছোট বাচ্চাদের কোরআন শেখান, তিনি কীভাবে একটি প্রতাপশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন, সেই অবিশ্বাস্য অথচ বাস্তব গল্পই সেলুলয়েডের ফিতায় নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই মুভিতে। সিনেমাটি শুধু একটি যুদ্ধের গল্প নয়; এটি ঈমান, আত্মমর্যাদা এবং নিজের মাটির প্রতি শর্তহীন ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক দলিল।
গল্পটা আমি আপনাকে ঠিক সেভাবেই বলছি, যেভাবে আমি পর্দায় দেখেছি এবং আমার হৃদয়ে অনুভব করেছি।
পটভূমি ও ঔদ্ধত্যের শুরু
সিনেমার শুরুতেই আমরা দেখি ইতালির রোম শহর। তখন সেখানে বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট শাসন চলছে। মুসোলিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। কারণ, ইতালি লিবিয়া দখল করেছে প্রায় বিশ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু লিবিয়ার মরুভূমির একদল সাধারণ বেদুইন উপজাতির প্রতিরোধের কারণে তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারছে না। এই প্রতিরোধের নেতৃত্বে আছেন এমন একজন মানুষ, যাকে ইতালীয় বাহিনী 'মরুভূমির সিংহ' বলে ডাকে—তিনি হলেন উমর মুখতার। মুসোলিনি তার সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং দক্ষ জেনারেল রডোলফো গ্রাৎসিয়ানিকে দায়িত্ব দেন যে কোনো মূল্যে এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য। গ্রাৎসিয়ানিকে মুসোলিনি বলেন, "লিবিয়া ইতালির অংশ, আর যারা এর বিরোধিতা করবে তাদের ধ্বংস করে দাও।গ্রাৎসিয়ানি লিবিয়ায় পৌঁছায় এক বিশাল আধুনিক সেনাবাহিনী, ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, এবং যুদ্ধবিমান নিয়ে। তার লক্ষ্য একটাই—উমর মুখতারকে থামানো।একজন কোরআন শিক্ষক যখন সেনাপতি
মুভির সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো উমর মুখতারের চরিত্রটি। বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা অ্যান্থনি কুইন যখন পর্দায় উমর মুখতারের রূপে আসেন, তখন মনেই হয় না তিনি অভিনয় করছেন। মনে হয় যেন ইতিহাসের পাতা থেকে আসল উমর মুখতারই উঠে এসেছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, চোখে চশমা, পরনে সাধারণ আরবীয় পোশাক—অথচ তাঁর চোখের দৃষ্টিতে কী এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা আর প্রশান্তি!উমর মুখতার কিন্তু জন্মগতভাবে কোনো যোদ্ধা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কোরআনের শিক্ষক। তিনি বাচ্চাদের ধর্মশিক্ষা দিতেন। কিন্তু যখন নিজের মাতৃভূমির ওপর বিদেশি আগ্রাসন নেমে এল, তখন তিনি আর শুধু জায়নামাজে বসে থাকেননি। কোরআনের আয়াত বুকে ধারণ করে তিনি ঘোড়ার পিঠে উঠে বসেছেন, হাতে তুলে নিয়েছেন রাইফেল। তাঁর এই সংগ্রাম ক্ষমতার জন্য ছিল না, ছিল কেবল আল্লাহ্র সন্তুষ্টি এবং নিজের মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য।
অসম যুদ্ধ এবং ঈমানি কৌশল
এরপর সিনেমায় শুরু হয় দুই পক্ষের লড়াইয়ের দৃশ্য। এই লড়াই বড্ড অসম। একদিকে ইতালীয় বাহিনীর আকাশে উড়ছে বোমারু বিমান, মাটিতে গর্জায় ট্যাংক। আর অন্যদিকে উমর মুখতারের বাহিনীর সম্বল কেবল ঘোড়া, পুরনো রাইফেল আর বুকের ভেতরের অটুট ঈমান।
উমর মুখতার জানতেন, সরাসরি যুদ্ধে তিনি আধুনিক ইতালীয় বাহিনীর সাথে পারবেন না। তাই তিনি বেছে নিলেন গেরিলা যুদ্ধের কৌশল। মরুভূমির প্রতিটি ধূলিকণা ছিল তাঁর পরিচিত। তারা অতর্কিতে ইতালীয় কনভয়ে হামলা করত, ক্ষতিসাধন করত এবং ইতালীয়রা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মরুভূমির দিগন্তে মিলিয়ে যেত। উমর মুখতারের রণকৌশল দেখে ইতালীয় জেনারেলরাও হতবাক হয়ে যেত।মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত সিনেমাটিতে একটি দৃশ্য আছে যা আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। এটি ইসলামিক যুদ্ধনীতির এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। একবার একটি খণ্ডযুদ্ধে উমর মুখতারের বাহিনী জয়লাভ করে এবং এক তরুণ ইতালীয় সেনাকে বন্দি করে। বন্দি সেনার চোখেমুখে মৃত্যুর ভয়। একজন আরব যোদ্ধা তরুণটিকে হত্যা করতে উদ্যত হলে উমর মুখতার তাকে থামান।যোদ্ধাটি ক্ষোভের সাথে বলে, "তারা তো আমাদের বন্দিদের হত্যা করে, তাহলে আমরা কেন তাকে ছেড়ে দেব?"উমর মুখতার অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেন, "তারা আমাদের শিক্ষক নয়।" অর্থাৎ, ইতালীয়রা যদি অন্যায় করে, নিষ্ঠুর হয়, তার মানে এই নয় যে আমাদেরও তাদের মতো নিষ্ঠুর হতে হবে। আমাদের ধর্ম, আমাদের রাসূল (সা.) আমাদের বন্দিদের সাথে এমন আচরণ করতে শেখাননি। তিনি বন্দি ইতালীয় সেনাকে একটি ইতালীয় পতাকা দিয়ে সসম্মানে মুক্তি দেন। এই দৃশ্যটি দেখে যেকোনো দর্শকের চোখে পানি আসতে বাধ্য। এটি প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন যোদ্ধাই ছিলেন না, ছিলেন মানবিকতার এক বিশাল স্তম্ভ।গ্রাৎসিয়ানির নিষ্ঠুরতা ও কাঁটাতারের বেড়া গ্রাৎসিয়ানি বুঝতে পারে, উমর মুখতারকে সরাসরি ময়দানে হারানো সম্ভব নয়। কারণ উমর মুখতারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সাধারণ মানুষের সমর্থন। সাধারণ বেদুইনরা তাকে খাবার দেয়, তথ্য দেয় এবং আশ্রয় দেয়।তাই গ্রাৎসিয়ানি এক চরম নিষ্ঠুর পথ বেছে নেয়। সে লিবিয়ার সাধারণ মানুষদের, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জোর করে ধরে নিয়ে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি করতে শুরু করে। মাইলের পর মাইল এলাকা জুড়ে সে এক বিশাল কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে, যা লিবিয়াকে মিশর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল উমর মুখতারের রসদ এবং বাইরের সাহায্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া।ক্যাম্পের ভেতরের দৃশ্যগুলো মুভিতে অত্যন্ত হৃদয়বিদারকভাবে দেখানো হয়েছে। খাদ্যাভাব, রোগ আর অত্যাচারে প্রতিদিন শত শত সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে। ইতালীয় বাহিনী ফসলের মাঠ পুড়িয়ে দিচ্ছে, কুয়াগুলো পাথর দিয়ে বুজিয়ে দিচ্ছে। উমর মুখতারের কাছে এই খবরগুলো যখন পৌঁছায়, তার হৃদয় ভেঙে যায়। কিন্তু তারপরও তিনি হাল ছাড়েন না। তিনি তার সঙ্গীদের বলেন, "আমরা আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। আমরা আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ে যাব।"
সিংহের পতন
দিন গড়াতে থাকে। রসদ নেই, অস্ত্র নেই, চারপাশের মানুষগুলো মারা যাচ্ছে। বয়সের ভারে উমর মুখতার নিজেও ক্লান্ত। একদিন এক অতর্কিত হামলায় ইতালীয় বাহিনী তাকে ঘিরে ফেলে। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে উমর মুখতারের ঘোড়াটি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায়। মাটিতে পড়ে যান সেই বৃদ্ধ সিংহ। তার চশমাটি ছিটকে পড়ে বালুর ওপর। ধুলোমাখা সেই চশমা আর বন্দি উমর মুখতারের দৃশ্যটি সিনেমার অন্যতম আইকনিক শট। তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেই শিকল পরা অবস্থাতেও তার মাথা ছিল একদম উঁচু। তার চেহারায় কোনো ভয়ের লেশমাত্র ছিল না।গ্রাৎসিয়ানি বনাম উমর মুখতার: আদর্শের সংঘাতমুভির সবচেয়ে দুর্দান্ত অংশ হলো বন্দি উমর মুখতার এবং জেনারেল গ্রাৎসিয়ানির মধ্যকার কথোপকথন। গ্রাৎসিয়ানির অফিসে উমর মুখতারকে আনা হয়। গ্রাৎসিয়ানি এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে এই বৃদ্ধকে দেখতে থাকে, যে মানুষটি তাদের বিশ বছর ধরে নাকানিচুবানি খাইয়েছে!গ্রাৎসিয়ানি তাকে প্রস্তাব দেয়, "তুমি যদি তোমার লোকদের যুদ্ধ থামাতে বল, আমি তোমাকে মুক্তি দেব। ইতালীয় সরকার তোমাকে মোটা অঙ্কের ভাতা দেবে। তুমি শান্তিতে বাকি জীবন কাটাতে পারবে।"
উমর মুখতার তার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলেন, "আমি কখনোই যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দেব না। আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়ব, যতক্ষণ না আমরা তোমাদের আমাদের মাটি থেকে বের করে দিচ্ছি, অথবা আমরা সবাই মারা যাচ্ছি।"গ্রাৎসিয়ানি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো, এই সামান্য বাহিনী নিয়ে তুমি ইতালির মতো শক্তির বিরুদ্ধে জিততে পারবে?"উমর মুখতার কোরআনের শিক্ষার আলোকে উত্তর দেন, "আমাদের আয়ু আল্লাহ্র হাতে নির্ধারিত। আমি জানি আমি মারা যাব। কিন্তু আমরা আত্মসমর্পণ করি না। হয় আমরা জিতি, নয়তো আমরা মরি। আর ভেবো না এখানেই সব শেষ। আমাকে মারার পর আমার পরবর্তী প্রজন্মের সাথে তোমাদের লড়তে হবে, তারপর তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সাথে। আর আমি? আমার জীবনকাল আমার ফাঁসি কার্যকর করা জল্লাদের চেয়েও দীর্ঘ হবে।"এই একটি ডায়লগ যেন পুরো মুভির নির্যাস। মুসোলিনির ক্ষমতার অহংকার উমর মুখতারের ঈমানি শক্তির কাছে ওই ঘরের ভেতরেই পরাজিত হয়েছিল।
প্রহসনের বিচার ও ফাঁসির মঞ্চ
ইতালীয়রা লোক দেখানো এক সামরিক বিচারের আয়োজন করে। বিচারে স্বাভাবিকভাবেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারের রায় শুনে উমর মুখতারের চেহারায় কোনো আফসোস ছিল না। তিনি শুধু পবিত্র কোরআনের সেই বিখ্যাত আয়াতটি উচ্চারণ করেন, "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহ্র জন্য এবং আমাদের তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে)।
সিনেমাটির ক্লাইম্যাক্স বা শেষ দৃশ্যটি আপনাকে স্তব্ধ করে দেবে। ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি হাজার হাজার লিবীয় নারী, পুরুষ ও শিশুদের সামনে উমর মুখতারকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে আসা হয়। ইতালীয়রা চেয়েছিল মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে।
উমর মুখতার ধীর পায়ে, মাথা উঁচু করে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। তার হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ি। কিন্তু তার ঠোঁট নড়ছিল। তিনি নিচু স্বরে কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। চারপাশের হাজারো বন্দি মানুষ ডুকরে কাঁদছে। ফাঁসির দড়ি তার গলায় পরানো হলো। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইতালীয় জেনারেলরা দেখছে। আর সেই মুহূর্তেও উমর মুখতারের চোখে কোনো শূন্যতা নেই, আছে এক পরম তৃপ্তি—শাহাদাতের তৃপ্তি।ফাঁসির পাটাতন সরিয়ে দেওয়া হলো। ঝুলে পড়লেন মরুভূমির সিংহ। দৃশ্যটি দেখার সময় গলার কাছে এক দলা কান্না এসে আটকে যায়।
শেষ কথা ও উত্তরাধিকার
সিনেমার একেবারে শেষ দৃশ্যে দেখানো হয়, উমর মুখতারের সেই ছিটকে পড়া গোল ফ্রেমের চশমাটি একটি ছোট বাচ্চা ছেলে বালু থেকে কুড়িয়ে নিচ্ছে। এটি একটি গভীর রূপক দৃশ্য। এর মানে হলো, উমর মুখতার মারা গেছেন ঠিকই, কিন্তু তার আদর্শ, তার দেশপ্রেম এবং তার প্রতিরোধের চেতনা মারা যায়নি। সেই চেতনা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে স্থানান্তরিত হয়েছে।
"লায়ন অব দ্য ডেজার্ট" কেবল দুই ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটের একটি মুভি নয়। এটি একজন সত্যনিষ্ঠ মুসলিম কীভাবে তার ধর্ম, মাটি এবং মানুষের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে পারে, তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মুভিটি দেখার পর আপনি আর আগের মতো থাকবেন না। উমর মুখতারের সেই শান্ত অথচ তেজোদীপ্ত চোখ, তার অটল বিশ্বাস এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা আপনার হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসবে। একজন দর্শক হিসেবে আমি মনে করি, ইতিহাস ও সত্যকে ভালোবাসেন এমন প্রতিটি মানুষের জীবনে অন্তত একবার এই মাস্টারপিসটি দেখা উচিত।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR






