“প্রয়োজন শেষ, সম্পর্কও শেষ—মানুষ কি এখন অনুভূতি নয়, স্বার্থেই বাঁধা?”
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
আজকাল আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে “তুমি কেমন আছো?” প্রশ্নটার মধ্যেও অনেক সময় স্বার্থ লুকিয়ে থাকে। কেউ হয়তো মাসের পর মাস খোঁজ নেয় না, হঠাৎ একদিন ফোন দেয়। তুমি ভাবো—হয়তো মানুষটা তোমাকে মিস করেছে, তোমার কথা মনে পড়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারো, কোনো দরকার আছে বলেই যোগাযোগ। কাজ শেষ, সম্পর্কও আবার আগের মতো নীরব। এই অভিজ্ঞতা আজ নতুন কিছু নয়। বরং অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনোভাবে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এখন সম্পর্কগুলোতে আন্তরিকতার জায়গা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। মানুষ এমনভাবে ব্যবহার শিখে গেছে যে অনেক সময় বুঝতেই সময় লাগে—তোমাকে মানুষটা সত্যিই মূল্য দিচ্ছে, নাকি শুধু নিজের সুবিধার জন্য পাশে আছে। যখন তোমার কিছু দেওয়ার থাকে, তুমি গুরুত্বপূর্ণ। যখন তোমার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, তখন তুমি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাও। এটা শুধু বন্ধুত্বে নয়, অনেক সময় প্রেম, আত্মীয়তা এমনকি পারিবারিক সম্পর্কেও দেখা যায়।
একটা কঠিন বাস্তবতা হলো—মানুষ এখন এমন সম্পর্ক পছন্দ করে, যেখানে তার লাভ আছে। কেউ পরিচিত হয় প্রভাবের জন্য, কেউ সম্পর্ক রাখে সুবিধার জন্য, কেউ পাশে থাকে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। এই বিষয়টা শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তবতা অনেকটা এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুমি যদি কোনোভাবে কারো কাজে আসতে পারো, তাহলে তোমার গুরুত্ব আছে। কিন্তু যেদিন তুমি দুর্বল হবে, যেদিন তোমার দেওয়ার মতো কিছু থাকবে না, সেদিন অনেকেই ধীরে ধীরে দূরে সরে যাবে।
তবে এর মানে এই নয় যে পৃথিবীতে ভালো মানুষ নেই। এখনো কিছু মানুষ আছে যারা নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকে, তোমার খারাপ সময়েও হাত ছাড়ে না। কিন্তু সমস্যা হলো, এই মানুষগুলো এখন অনেক কম। আর যারা সত্যিকারের মানুষ, তারা এতবার প্রতারিত হয় যে একসময় নিজেরাও বদলে যেতে বাধ্য হয়। কারণ বারবার ব্যবহার হওয়ার পর মানুষ বিশ্বাস করতে ভয় পায়। তখন সে সম্পর্কের আগে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে।
সোশ্যাল মিডিয়া এই পরিবর্তনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে মানুষ সম্পর্ক গড়ত সময় দিয়ে, এখন গড়ে ইনবক্সে “Seen” আর “Reaction” দিয়ে। আগে দেখা না হলে মন খারাপ হতো, এখন রিপ্লাই না পেলেই সম্পর্কের গুরুত্ব মাপা হয়। অনেক সম্পর্ক এখন এতটাই উপরের স্তরে আটকে গেছে যে গভীরতা বলতে কিছু নেই। হাজার বন্ধু, শত পরিচিত—কিন্তু সত্যিকারের প্রয়োজনের সময় পাশে থাকার মতো মানুষ হাতে গোনা কয়েকজনও থাকে না।
আরেকটা বিষয় খুব স্পষ্ট—মানুষ এখন এমনভাবে নিজেকে ব্যস্ত দেখাতে শিখেছে, যেন কারো জন্য সময় বের করা একটা বোঝা। অথচ প্রয়োজন হলে সেই মানুষই বারবার যোগাযোগ করে। এটা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার নেই। শুধু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, কে তোমাকে প্রয়োজনের সময় মনে করে আর কে বিনা স্বার্থে তোমার খবর নেয়।
আমাদের সমাজও এই স্বার্থপর মানসিকতাকে অনেকভাবে উৎসাহ দিচ্ছে। ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়—সফল হও, বড় কিছু করো, প্রতিষ্ঠিত হও। কিন্তু খুব কম মানুষ শেখায়—মানুষ হও, সম্পর্কের মূল্য দাও, কাউকে ব্যবহার করো না। ফলে আমরা বড় হচ্ছি অর্জনের পেছনে ছুটতে ছুটতে, কিন্তু অনুভূতির জায়গাগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে, সুযোগ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই বাস্তবতা মানুষকে ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন করে দিচ্ছে। একসময় যে মানুষ খুব সহজে বিশ্বাস করত, এখন সে দশবার ভাবছে। যে মানুষ সবার জন্য সময় দিত, এখন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। কারণ সে বুঝে গেছে—সবাই তোমার অনুভূতির মূল্য দেবে না। কেউ কেউ শুধু তোমার ভালো দিকটা ব্যবহার করবে, তারপর একসময় তোমাকেই অপ্রয়োজনীয় মনে করবে।
তাই জীবনে একটা জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ—মানুষ চিনতে শেখা। সবাইকে নিজের মানুষ ভাবা ঠিক নয়। যে তোমার খারাপ সময়ে পাশে থাকে, বিনা প্রয়োজনে খোঁজ নেয়, তোমার কষ্ট বুঝতে চায়—সেই মানুষগুলোকে মূল্য দিতে হবে। কারণ এখনকার পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ সম্পর্ক খুব সহজে পাওয়া যায় না। আর যারা সত্যিকারের আপন, তারা সংখ্যায় কম হলেও জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
শেষ পর্যন্ত একটা কথাই বলা যায়—মানুষের প্রয়োজন থাকা খারাপ নয়, কারণ জীবনই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যখন সম্পর্ক শুধুই স্বার্থের জন্য হয়, তখন সেখানে অনুভূতি ধীরে ধীরে মরে যায়। সম্পর্ক তখন আর সম্পর্ক থাকে না, হয়ে যায় অস্থায়ী সুবিধার জায়গা। আর সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো, মানুষ তখন বুঝতে পারে—সে কাউকে হৃদয় দিয়ে গুরুত্ব দিয়েছিল, কিন্তু অপরপক্ষ তাকে দেখেছিল শুধু প্রয়োজনের চোখে।
এই যুগে তাই সম্পর্কের সংখ্যা নয়, গুণগত মান গুরুত্বপূর্ণ। হাজার মানুষের ভিড়ে সেই একজন মানুষই যথেষ্ট, যে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই তোমার পাশে থাকবে। কারণ দিনশেষে মানুষ মনে রাখে না—কে কতবার কথা বলেছে, মানুষ মনে রাখে—কে সত্যিই পাশে ছিল।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community