রমজানে নফসের সঙ্গে আমার যুদ্ধ
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
রমজান এলেই আমার ভেতরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন অনুভব করি। যেন বছরের অন্য সব মাসের চেয়ে এই মাসটা আলাদা—নরম, গভীর আর আলোভরা। চাঁদ দেখার খবর শুনলেই বুকের ভেতর কেমন একটা কাঁপন জাগে। মনে হয়, আল্লাহ আবারও আমাকে একটা সুযোগ দিলেন—নিজেকে বদলানোর, নিজের নফসের সঙ্গে লড়াই করার, নিজের ভুলগুলো শোধরানোর।আমি জানি, আমার সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরে কেউ নয়—আমার নিজের নফস। যখন রাগে অন্ধ হয়ে যাই, যখন অহংকারে নিজেকে বড় ভাবি, যখন গোপনে কোনো ভুল কাজের দিকে মন টানে—তখন বুঝি, এটা আমার নফসেরই খেলা। বছরের অন্য সময়ে হয়তো আমি নিজেকে সামলাতে পারি না। কিন্তু রমজান এলে যেন এক নতুন শক্তি পাই। সুবহে সাদিকের আগে সেহরির সময় ঘুম ভাঙলে মনে হয়, আমি কেবল ক্ষুধা সহ্য করতে উঠিনি; আমি উঠেছি নিজের ভেতরের অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে।সারাদিন রোজা রেখে যখন তৃষ্ণায় কণ্ঠ শুকিয়ে আসে, তখন বারবার মনে পড়ে যায়—আমি চাইলে তো লুকিয়ে একটু পানি খেতেই পারি। কেউ দেখবে না। কিন্তু তখন মনে হয়, আল্লাহ তো দেখছেন। এই অনুভূতিটাই আমাকে থামিয়ে দেয়। এই এক মুহূর্তেই আমি বুঝতে পারি, রমজান আমাকে তাকওয়া শিখাচ্ছে—অদেখার ভয়, অথচ গভীর ভালোবাসা মিশ্রিত এক অনুভূতি।আমি লক্ষ্য করি, রোজার দিনগুলোতে আমার রাগও যেন একটু কমে যায়। কেউ কটু কথা বললেও নিজেকে মনে করাই—“আমি রোজাদার।” এই কথাটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় আমি যেন নিজের নফসকে শক্ত করে ধরে ফেলেছি। সে চায় আমি চিৎকার করি, জবাব দিই, অপমানের বদলা নিই। কিন্তু আমি চুপ থাকি। এই নীরবতায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি আছে। মনে হয়, আমি হারিনি; বরং আমি জিতেছি—নিজের ওপর।রমজানের রাতগুলো আমার কাছে আরও বেশি আবেগময়। তারাবিহর নামাজে দাঁড়িয়ে যখন কুরআনের তিলাওয়াত শুনি, তখন মনে হয় এই বাণীগুলো সরাসরি আমার হৃদয়ের উদ্দেশে নাজিল হয়েছে। কত ভুল করেছি, কত অবহেলা করেছি—সবকিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সিজদায় মাথা রাখলে অশ্রু থামে না। মনে হয়, আল্লাহর দরবারে আমি এক অসহায় বান্দা—ক্ষমা চাইছি, আবারও শুরু করার সুযোগ চাইছি।এই মাসে দান করতে পারলেও হৃদয়ে অন্যরকম তৃপ্তি পাই। যখন দেখি কেউ আমার দেওয়া সামান্য সহায়তায় হাসছে, তখন বুঝি—আমার নফসের ভেতরে যে লোভ ছিল, সেটাকে একটু হলেও ভাঙতে পেরেছি। রমজান আমাকে শিখায়, দুনিয়ার সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী; স্থায়ী হলো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি।তবে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই রমজান শেষ হয়ে গেলে। ঈদের আনন্দের মাঝেও বুকের ভেতর একটা শূন্যতা কাজ করে। মনে হয়, যে প্রশান্তি, যে নিয়মিত ইবাদত, যে আত্মসংযম—সব কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে? আমি কি আবার আগের মতো হয়ে যাব? এই ভয়ই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, রমজান শুধু এক মাসের জন্য নয়; এটি আমার সারাজীবনের জন্য এক শিক্ষা।একজন মুসলিম হিসেবে আমি অনুভব করি, রমজান আমার আত্মার আয়না। এই মাসে আমি স্পষ্টভাবে দেখতে পাই আমি কে—আমার দুর্বলতা কোথায়, আমার শক্তি কতটুকু। আমার নফস কখন আমাকে টেনে নিচে নামাতে চায়, আর আমার ঈমান কিভাবে আমাকে ওপরে তুলতে চায়। এই টানাপোড়েনের মাঝেই আমার জীবনের আসল গল্প।রমজান আমাকে শিখিয়েছে, নিজের নফসকে পুরোপুরি মেরে ফেলা যায় না; কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রতিদিনের ছোট ছোট সংযম, প্রতিটি নীরব ক্ষমা, প্রতিটি অশ্রুভেজা দোয়া—এসবই আমাকে একটু একটু করে বদলে দেয়। আমি হয়তো পরিপূর্ণ নই, কিন্তু আমি চেষ্টা করছি। আর এই চেষ্টার নামই তো ইবাদত।শেষ রাতে, বিশেষ করে কদরের রাতের খোঁজে যখন জেগে থাকি, তখন হৃদয়ের গভীর থেকে একটি প্রার্থনাই বেরিয়ে আসে—“হে আল্লাহ, আমার নফসকে পরিশুদ্ধ করুন। আমাকে এমন বান্দা বানান, যে আপনাকে ভয় করে, ভালোবাসে এবং আপনার সন্তুষ্টিতেই সন্তুষ্ট থাকে।” সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারি, রমজান কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণার মাস নয়; এটি আমার আত্মার পুনর্জন্মের মাস।
রমজান আমার কাছে এক আবেগের নাম, এক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি, এক আশার আলো। যতবার এই মাস ফিরে আসে, ততবার মনে হয়—আমি আবারও নতুন করে শুরু করতে পারি। আর সেই নতুন শুরুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community