আপনার শরীরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে নক্ষত্রের ইতিহাস
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
কখনো কি নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে ভেবেছেন, আমরা আসলে কী দিয়ে তৈরি? বাইরে থেকে আমরা মানুষ—হাড়, রক্ত, মাংস, ত্বক আর অগণিত কোষ দিয়ে গঠিত। কিন্তু আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, আমাদের শরীরের প্রতিটি অংশ তৈরি হয়েছে অতি ক্ষুদ্র পরমাণু দিয়ে। আর সেই পরমাণুগুলোর ইতিহাস পৃথিবীতে শুরু হয়নি। বরং আমাদের শরীরের কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ক্যালসিয়াম, লোহা—এমন অনেক মৌলের ইতিহাস ছড়িয়ে আছে কোটি কোটি বছর আগের মহাজাগতিক ঘটনায়। তাই অনেকটা কাব্যিকভাবেই বলা যায়,আমরা সবাই নক্ষত্রের ধুলো দিয়ে তৈরি। তবে এই কথার পেছনে যে বিজ্ঞান রয়েছে, সেটি কল্পনার চেয়েও বেশি বিস্ময়কর।প্রথমেই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আমাদের শরীরের প্রতিটি পরমাণু যে কোনো একসময় সরাসরি একটি নক্ষত্রের ভেতরে ছিল—এমনটা বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। বিশেষ করে হাইড্রোজেনের বড় অংশের উৎপত্তি মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব যখন ঠান্ডা হতে শুরু করে, তখন হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো হালকা মৌল তৈরি হয়। অর্থাৎ আমাদের শরীরের কিছু পরমাণু নক্ষত্রের জন্মেরও আগে মহাবিশ্বে উপস্থিত ছিল। কিন্তু গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ শুরু হয় যখন এই হালকা মৌলগুলো নক্ষত্রের ভেতরে প্রবেশ করে।একটি নক্ষত্রকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এটি শুধু আগুনের বিশাল গোলক। কিন্তু ভেতরে চলছে ভয়ংকর শক্তিশালী পারমাণবিক প্রক্রিয়া। নক্ষত্রের কেন্দ্রে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের কারণে হালকা পরমাণুগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন মৌল তৈরি করতে পারে। আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্রে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরি হয়। আরও বড় নক্ষত্রের জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে হিলিয়াম থেকে কার্বন, অক্সিজেনসহ আরও ভারী মৌল তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ নক্ষত্র শুধু আলো ও তাপ দেয় না—তার ভেতরে মহাবিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও তৈরি হয়।এখানেই আসে আমাদের শরীরের সঙ্গে নক্ষত্রের সম্পর্ক। আপনি যে কার্বন দিয়ে তৈরি, আপনার রক্তে থাকা লোহার যে পরমাণু, আপনার হাড়ের ক্যালসিয়াম, শরীরের অক্সিজেন—এসব মৌলের অনেকগুলোই কোনো না কোনো সময় নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ পারমাণবিক প্রক্রিয়া বা নক্ষত্রের বিস্ফোরণজনিত ঘটনাগুলোর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বড় নক্ষত্র যখন জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং ভয়াবহ বিস্ফোরণের মাধ্যমে তার উপাদান মহাকাশে ছড়িয়ে দেয়, তখন সেই মৌলগুলো আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে।ভাবুন, কোটি কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের কোথাও একটি বিশাল নক্ষত্রের জীবন শেষ হলো। সেই নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হওয়া নানা মৌল মহাকাশে ছড়িয়ে গেল। পরে সেগুলো ধীরে ধীরে গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল মেঘের সঙ্গে মিশে গেল। সেই মেঘ থেকেই পরবর্তী সময়ে নতুন নক্ষত্র, গ্রহ এবং অসংখ্য মহাজাগতিক বস্তু তৈরি হলো। আমাদের সৌরজগতও এমন একটি দীর্ঘ মহাজাগতিক ইতিহাসের ফল।প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের সৌরজগত গঠিত হওয়ার সময় আগের প্রজন্মের নক্ষত্রগুলোর রেখে যাওয়া উপাদানও সেখানে উপস্থিত ছিল। সেই ধূলিকণা ও গ্যাস একত্রিত হয়ে সূর্য, পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহ তৈরি করতে শুরু করে। পৃথিবীতে পরবর্তীতে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়া, ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং জীবনের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই একই মৌলগুলো অসংখ্য রূপ নেয়। কোনোটি পাথরে, কোনোটি পানিতে, কোনোটি বাতাসে, আর কোনোটি জীবন্ত প্রাণীর শরীরে জায়গা করে নেয়।এখন আপনার শরীরের কথা ভাবুন। আপনি যে পানি পান করছেন, তার হাইড্রোজেনের ইতিহাস মহাবিশ্বের শুরুর সময় পর্যন্ত যেতে পারে। আপনার শরীরের কার্বন এসেছে আরও দীর্ঘ মহাজাগতিক রাস্তা পেরিয়ে। আপনার হাড়ের ক্যালসিয়াম, দাঁতের বিভিন্ন উপাদান, রক্তের লোহার মতো মৌলগুলোও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। পৃথিবী মূলত এই মৌলগুলোকে নতুনভাবে সাজিয়ে জীবনের জন্য ব্যবহার করেছে।এমনকি আপনার রক্তের লোহাও একটি অসাধারণ গল্প বহন করে। লোহা মহাবিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌল, কিন্তু বড় নক্ষত্রের জীবনের শেষ পর্যায়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এর উৎপত্তির সম্পর্ক রয়েছে। কোনো একসময় সেই মহাজাগতিক উপাদান মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। কোটি কোটি বছর পর তারই কোনো অংশ পৃথিবীতে এসে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আপনার শরীরের অংশ হয়ে থাকতে পারে। আজ আপনার রক্তে অক্সিজেন পরিবহনে যে লোহা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তার ইতিহাস তাই মানুষের ইতিহাসের চেয়েও অনেক, অনেক পুরোনো।তবে শুধু নক্ষত্রই সব মৌল তৈরি করে—এমনটাও ঠিক নয়। মহাবিশ্বে কিছু ভারী মৌল তৈরির ক্ষেত্রে নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ছাড়াও নিউট্রন-তারকার সংঘর্ষের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী মহাজাগতিক ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সোনা, প্লাটিনামের মতো কিছু ভারী মৌলের উৎপত্তির সঙ্গে এমন ঘটনাগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের শরীরের উপাদানগুলোর ইতিহাস আসলে একাধিক ধরনের মহাজাগতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত।সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়াগুলো কোনো কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ বছরের গল্প নয়। এগুলোর সময়কাল বিলিয়ন বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ আপনার শরীরের পরমাণুগুলোর কিছু অংশ এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন পৃথিবীর অস্তিত্বই ছিল না। মানুষ তো দূরের কথা, পৃথিবী, সূর্য এবং আমাদের সৌরজগতের জন্মেরও বহু আগে এসব পরমাণুর যাত্রা শুরু হয়েছিল।তাই “আমরা নক্ষত্রের ধুলো” কথাটি শুধু একটি সুন্দর কবিতা নয়; এর পেছনে রয়েছে বাস্তব বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমাদের শরীরের সব পরমাণু কোনো নির্দিষ্ট নক্ষত্রের ভেতরে ছিল। বরং আমাদের শরীরের মৌলগুলো এসেছে মহাবিশ্বের দীর্ঘ রাসায়নিক ও নাক্ষত্রিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় থেকে। কিছু এসেছে মহাবিশ্বের প্রাথমিক সময় থেকে, কিছু নক্ষত্রের ভেতরের পারমাণবিক প্রক্রিয়া থেকে, আবার কিছু এসেছে নক্ষত্রের বিস্ফোরণ বা আরও বিরল মহাজাগতিক ঘটনাগুলো থেকে।সবশেষে একটু থেমে ভাবুন—আপনি যখন আয়নায় নিজের মুখ দেখেন, তখন হয়তো শুধু একজন মানুষকেই দেখেন। কিন্তু বিজ্ঞানের চোখে সেই শরীরের ভেতরে লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের বহু বিলিয়ন বছরের ইতিহাস। আপনার হাড়ে থাকা ক্যালসিয়াম, রক্তে থাকা লোহা, শরীরের কার্বন ও অক্সিজেন—সবকিছুর পেছনে রয়েছে মহাজাগতিক এক দীর্ঘ যাত্রা।আপনি শুধু পৃথিবীর সন্তান নন; আপনার শরীরের ভেতরে মহাবিশ্বেরও ইতিহাস লেখা আছে।হয়তো এ কারণেই রাতের আকাশের দিকে তাকালে তারাগুলোকে এত দূরের মনে হয় না। কারণ তাদের আলো আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় ঠিকই, কিন্তু তাদের গল্পের কিছু অংশ—তাদের তৈরি করা উপাদানের গল্প—আজও আমাদের শরীরের ভেতর বেঁচে আছে।এক অর্থে, আমরা সবাই মহাবিশ্বের পুরোনো গল্পের নতুন অধ্যায়।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community