ক্যারিয়ারের দৌড়, স্বপ্নের চাকরির ক্লান্তি এবং দিনশেষে আয়নার সামনের 'আমি'
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
কখনো কি এমন হয়েছে? সারাদিন কাজের পাহাড় সামলে, ল্যাপটপের স্ক্রিন বন্ধ করার পর যখন একা সোফায় হেলান দেন, তখন ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। মনে হয়, "আমি আসলে কে? এই কাজটা ছাড়া আমার কি আর কোনো অস্তিত্ব আছে?"আমরা জীবনের একটা বড় সময় ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটি। সফল হতে হবে, নিজেকে প্রমাণ করতে হবে—এই প্রতিযোগিতায় দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা জীবনের কিছু চরম সত্য ভুলে যাই। আজ ক্যারিয়ার আর জীবন নিয়ে এমন কিছু বাস্তবতার কথা বলব, যা হয়তো আমাদের সবারই মনের কথা, কিন্তু কাউকে বলা হয় না।১. আপনার ভিজিটিং কার্ডের পরিচয়টাই আপনার শেষ কথা নয় আমাদের সমাজের একটা বড় সমস্যা হলো, আমরা "আমি কী করি" আর "আমি কে"—এই দুটোর মাঝের দেয়ালটা ভেঙে ফেলেছি। কেউ যখন আমাদের পরিচয় জানতে চায়, আমরা অবচেতনভাবেই বলে উঠি, "আমি অমুক কোম্পানিতে আছি" বা "আমি এই কাজ করি।" নিজের পেশাকে আমরা আমাদের সম্পূর্ণ সত্ত্বার সাথে এমনভাবে পেঁচিয়ে ফেলি যে, কোনো কারণে কাজে ব্যর্থ হলে মনে হয় জীবনটাই অর্থহীন।কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনার পেশা আপনার জীবনের একটা অংশ মাত্র, পুরো জীবন নয়। দিনশেষে কাজ শেষ করে যখন আপনি বাড়ি ফেরেন, তখন আপনি কারো সন্তান, কারো সঙ্গী, কারো বন্ধু, অথবা শুধুই আপনি—যার নিজের কিছু শখ আছে, পছন্দের গান আছে। কাজের দুনিয়ার বাইরে নিজের এই সুন্দর, স্বাধীন সত্ত্বাটাকে বাঁচিয়ে রাখা খুব জরুরি। তা না হলে একদিন কাজ থেকে অবসর নেওয়ার পর নিজেকে খুব অচেনা আর একা মনে হবে।২. "স্বপ্নের চাকরি"-তেও মেঘলা দিন আসে আমাদের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, প্যাশনের কাজ বা স্বপ্নের চাকরি পেলে জীবনে আর কোনো হতাশা থাকবে না। প্রতিদিন সকালে হাসিমুখে কাজে যাওয়া যাবে।কিন্তু বাস্তবতা একদম আলাদা! নিজের প্যাশনের কাজটাই ধরুন না। হয়তো আপনি খুব মন দিয়ে কোনো সফটওয়্যার প্রোজেক্ট বা একটা বড় ইআরপি (ERP) সিস্টেম দাঁড় করাচ্ছেন, কিংবা নিজের পছন্দের কোনো ব্যবসায় রাত-দিন এক করে দিচ্ছেন। যে কাজটা করতে আপনি সবচেয়ে ভালোবাসেন, সেখানেও এমন দিন আসে যখন একটানা কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠতে হয়। কোনো লজিক বা হিসেব মিলছে না, একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে আছেন—তখন মনে হয়, "ধুর! সব ছেড়ে দিই!"পছন্দের পেশাতেও যে একঘেয়েমি আসতে পারে, বিরক্তি লাগতে পারে—এটা মেনে নেওয়াটা খুব জরুরি। কোনো কাজই শতভাগ নিখুঁত নয়। মেঘলা দিন আসবেই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি ভুল পথে আছেন।৩. দক্ষতার চেয়েও দামি যখন আপনার ব্যবহারক্যারিয়ারের শুরুতে আমরা ভাবি, শুধু কাজের স্কিল আর মেধা থাকলেই তরতর করে ওপরে ওঠা যায়। হ্যাঁ, দক্ষতা আপনাকে একটা ভালো ইন্টারভিউ বা পদোন্নতি এনে দিতে পারে, কিন্তু আপনি সেখানে কতদিন টিকবেন, বা মানুষের কতটা আপন হবেন—সেটা নির্ভর করে আপনার আচরণের ওপর।ধরে নিন, অফিসে একটা ভীষণ চাপের দিন যাচ্ছে। ডেডলাইন কড়া নাড়ছে, সবার মেজাজ খিটখিটে। তখন টিমের সবচেয়ে মেধাবী কিন্তু অহংকারী মানুষটার চেয়ে, সেই মানুষটাকেই বেশি আপন মনে হয়, যে একটা স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বলে, "প্যারা নিও না, আমরা সামলে নেব।" সহকর্মীদের প্রতি আপনার একটুখানি বিনয়, একটু সহমর্মিতা আর ভালো ব্যবহার আপনার জন্য এমন সব দরজা খুলে দিতে পারে, যা শুধু ডিগ্রি বা স্কিল দিয়ে কখনোই খোলা সম্ভব নয়। দিনশেষে মানুষ ভুলে যায় আপনি কত দ্রুত কাজ শেষ করেছিলেন, কিন্তু তারা আজীবন মনে রাখে আপনি তাদের সাথে কেমন আচরণ করেছিলেন।
শেষ কথা...
ক্যারিয়ার খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলাটা বোকামি। নিজের কাজকে ভালোবাসুন, কিন্তু সেই সাথে নিজের মনের যত্ন নিন। সহকর্মীদের প্রতি সদয় হোন, আর কাজ শেষে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা নামিয়ে রেখে নিজের জন্য অন্তত কিছুটা সময় বাঁচিয়ে রাখুন। কারণ, দিনশেষে আপনার মানসিক শান্তিটাই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

