আমার রিজিক যতটুকু নির্ধারিত, আমি ঠিক ততটুকুই পাবো— এর বেশিও নয়, কমও নয়
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
সাধারণত আমরা রিজিক বলতে শুধু টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি বা সোনা-দানা বুঝি। কিন্তু রিজিকের প্রকৃত অর্থ এবং এর পরিধি অত্যন্ত বিশাল। একজন মানুষের জীবনে যা কিছু তার উপকারে আসে, যা দিয়ে সে জীবন অতিবাহিত করে এবং যা তাকে মানসিক বা শারীরিক তৃপ্তি দেয়, তার সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। আপনি আজ যে অন্ন গ্রহণ করেছেন, সেটি আপনার রিজিক। আপনি যে সুস্থ শরীর নিয়ে বেঁচে আছেন, যে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছেন, সেটিও আপনার রিজিক। আপনার বুদ্ধিমত্তা, আপনার অর্জিত জ্ঞান, আপনার সুন্দর চরিত্র, এমনকি আপনার বিপদে পাশে দাঁড়ানো একজন অকৃত্রিম বন্ধুও আপনার জন্য এক বড় রিজিক। অনেক সময় আমরা অঢেল সম্পদের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের সুস্বাস্থ্য বা পরিবারের ভালোবাসা হারিয়ে ফেলি। অথচ সুস্বাস্থ্য এবং সুন্দর একটি পরিবার ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় রিজিক। তাই রিজিককে শুধু অংকের হিসেবে না দেখে জীবনের সামগ্রিক আশীর্বাদ হিসেবে দেখা উচিত।
একটি অতি পরিচিত ও চিরন্তন সত্য হলো— মানুষ তার মৃত্যুর আগে তার জন্য নির্ধারিত শেষ দানাটি না খেয়ে এবং তার জন্য বরাদ্দ শেষ নিঃশ্বাসটি না নিয়ে পৃথিবী ত্যাগ করবে না। এই বাক্যটি যদি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করি, তবে আমাদের জীবনের অর্ধেক দুশ্চিন্তা নিমিষেই ধুলোয় মিশে যায়। আমরা যখন দেখি আমাদের সমবয়সী কেউ অনেক উপরে উঠে গেছে বা আমার চেয়েও কম যোগ্যতাসম্পন্ন কেউ অনেক বিত্তবান হয়ে গেছে, তখন আমাদের মনে হাহাকার তৈরি হয়। আমরা ভাবতে শুরু করি, কেন আমি পারলাম না? আমার ভাগ্য কেন এমন? এই প্রশ্নগুলোই মূলত আমাদের অশান্তির মূল কারণ। আমরা ভুলে যাই যে, প্রত্যেকের পরীক্ষার খাতা আলাদা এবং প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দের পরিমাণও আলাদা। কারো রিজিক হয়তো অনেক প্রাচুর্যের মাঝে লুকিয়ে আছে, আবার কারো রিজিক হয়তো অল্প সম্পদের মাঝে অনেক বেশি বরকত বা কল্যাণের মাঝে নিহিত। রিজিকে অটল বিশ্বাস থাকলে মানুষের মন থেকে ঈর্ষা, হিংসা এবং অন্যের প্রতি বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়। তখন মানুষ অন্যের সাফল্যে ব্যথিত না হয়ে নিজের যতটুকু আছে তা নিয়েই পরম সুখে থাকতে পারে।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, যদি সব ভাগ্যেই লেখা থাকে, তবে কষ্ট করে কাজ করার বা পরিশ্রম করার দরকার কী? এটি একটি অত্যন্ত ভুল ধারণা। ভাগ্য বা রিজিক নির্ধারিত হওয়ার মানে এই নয় যে আমাদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হবে। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক: আকাশে ওড়া পাখিগুলো জানে তাদের রিজিক নির্ধারিত, কিন্তু তারা কি বাসায় বসে থাকে? না, তারা সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বাসার বাইরে বেরিয়ে পড়ে। তারা জানে না আজ কোথায় খাবার মিলবে, তবুও তারা ডানা ঝাপটায়, এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছোটে। দিনশেষে তারা ঠিকই পেট ভরে বাসায় ফেরে। এখানে ডানা ঝাপটানো বা বাসার বাইরে বের হওয়াটা হলো পরিশ্রম বা চেষ্টা, যা আমাদের দায়িত্ব। আর সেই চেষ্টার বিনিময়ে যথাযথ রিজিক মিলিয়ে দেওয়াটা হলো সৃষ্টিকর্তার বিধান। পরিশ্রম হলো আমাদের পক্ষ থেকে একটি আর্জি বা আবেদন। আমরা পরিশ্রম করি কারণ এটি আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব। কিন্তু ফল প্রাপ্তির পর আমরা যদি মনে করি এটি কেবল আমার মেধা বা গায়ের জোরে হয়েছে, তবে সেটি হবে ভুল। আমাদের পরিশ্রম কেবল রিজিক প্রাপ্তির মাধ্যম বা উসিলা মাত্র।
আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের অঢেল সম্পদ আছে, কিন্তু তাদের পেটে হজম করার মতো শক্তি নেই অথবা রাতে ঘুমানোর মতো শান্তি নেই। আবার এমন অনেক মানুষ আছেন যারা দিন আনে দিন খায়, কিন্তু দিনশেষে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। এখান থেকেই আসে বরকত-এর ধারণা। বরকত হলো অল্প জিনিসের মাঝে অধিক কল্যাণ থাকা। রিজিকে বিশ্বাসী মানুষ সবসময় হালাল বা সৎ পথের উপার্জনকে প্রাধান্য দেয়। সে জানে, অসৎ পথে পাহাড় সমান সম্পদ গড়লেও তাতে শান্তি আসবে না। বরং সৎ পথের সামান্য উপার্জনই তাকে প্রকৃত সুখ দিতে পারে। রিজিকে তুষ্টি বা সন্তুষ্টি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ। যার মন তৃপ্ত, সেই মূলত প্রকৃত ধনী। আমাদের যা নেই তা নিয়ে হাহাকার না করে যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আমাদের ভেতর এক ধরণের ইতিবাচক শক্তি কাজ করে। এই কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া আমাদের মানসিক চাপ কমায় এবং আমাদের জীবনকে আনন্দময় করে তোলে।
বর্তমান সময়ে ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা একটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো ক্যারিয়ার নিয়ে অতি দুশ্চিন্তা। প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে আমরা নিজের সক্ষমতার চেয়েও বেশি কিছু পেতে চাই। যখন আমরা আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল পাই না, তখনই আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। কিন্তু আমরা যদি এই বিশ্বাসটি অন্তরে গেঁথে নেই যে, আমার জন্য যা লেখা আছে তা আমার কাছে আসবেই, আর যা আমার জন্য নয় তা হাজার চেষ্টা করলেও আমার হবে না, তবে ব্যর্থতা আমাদের অতটা বিচলিত করতে পারবে না। ব্যর্থতা মানেই সব শেষ নয়; হতে পারে সেই পথে আমার রিজিক ছিল না, অথবা আমার জন্য এর চেয়েও উত্তম কিছু অপেক্ষা করছে। এই ইতিবাচক চিন্তাভাবনা আমাদের ধৈর্য ধরতে শেখায় এবং জীবনের কঠিন সময়েও আমাদের ভেঙে পড়তে দেয় না।
জীবন হলো একটি পরীক্ষা ক্ষেত্র। এখানে ধন-সম্পদ, অভাব-অনটন সবই আমাদের পরীক্ষার অংশ। রিজিক নিয়ে আমাদের যে অস্থিরতা, তা মূলত আমাদের আস্থাহীনতার ফল। আমরা যদি বিশ্বাস করতে শিখি যে আমাদের সৃষ্টিকর্তা আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত রিজিকটিই নির্ধারণ করে রেখেছেন, তবে আমাদের জীবন হবে অনেক সহজ ও শান্তিময়। আমাদের উচিত সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু ফলাফলের ক্ষেত্রে কোনো জবরদস্তি না করে যা পাওয়া যায়, তা হাসিমুখে গ্রহণ করা। মনে রাখতে হবে, মানুষের চাহিদা অসীম, কিন্তু তার প্রয়োজন সীমিত। আপনার যা প্রয়োজন, তা আপনি ঠিক সময়ে ঠিকভাবেই পাবেন। তাই অযথা দুশ্চিন্তা ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজটুকু সঠিকভাবে করে যান এবং আপনার অর্জিত রিজিকে সন্তুষ্ট থাকুন। প্রকৃত সুখী তারাই, যারা নিজের রিজিকে তুষ্ট থেকে অন্যের জন্য মঙ্গল কামনা করে।
যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য মনের শক্তি প্রয়োজন। আর সেই শক্তির উৎস হলো অটল বিশ্বাস। যখন আমরা বিশ্বাস করি আমাদের রিজিক কোনো মানুষের হাতে নেই, তখন আমরা দুনিয়ার ভয় থেকে মুক্ত হতে পারি। এই মুক্তিই মানুষকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করে। জীবনকে উপভোগ করার মূলমন্ত্র হলো আজ যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত থাকা এবং আগামীকালের জন্য কঠোর পরিশ্রম করা, কিন্তু ফলাফল নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হওয়া। রিজিকে বিশ্বাসের মাধ্যমে অর্জিত এই মানসিক প্রশান্তিই আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হতে পারে।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR



This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community