স্মৃতির চিলেকোঠায় আটকে থাকা এক ফালি চাঁদ এবং আমাদের হারিয়ে যাওয়া রূপকথার ঈদ
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
আমাদের ছোটবেলার ঈদগুলো কোনো ক্যালেন্ডারের তারিখে বাঁধা ছিল না, আমাদের ঈদ বাঁধা ছিল আকাশের ওই এক চিলতে বাঁকা চাঁদের সাথে। রোজার শেষ দশক শুরু হতেই আমাদের ছোট্ট বুকগুলোতে এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করতো। কবে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন? সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর আর উত্তেজনার দিনটি ছিল ২৯ রোজার বিকেলবেলা। আসরের আজান শেষ হওয়ার পরপরই পাড়ার সব ছেলেপুলে, বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোন মিলে এক ছুটে ছাদে ওঠা বা খোলা মাঠে গিয়ে জড়ো হওয়া। সবার চোখ পশ্চিম আকাশের দিকে। আকাশে একটু মেঘ জমলে আমাদের কচি মুখগুলো মলিন হয়ে যেত, বুকের ভেতর ধকধক করতো— 'আজ কি চাঁদ দেখা যাবে না? কাল কি তবে ঈদ হবে না?'
তখন তো আর হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না যে ফেসবুক স্ক্রল করলেই চাঁদের খবর পাওয়া যাবে। আমাদের খবর আসতো চোখ দিয়ে, হৃদয় দিয়ে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডোবার পর গোধূলির লালচে আলো যখন মিলিয়ে আসতে শুরু করতো, তখন আমাদের সবার দৃষ্টি যেন স্ক্যানারের মতো তন্নতন্ন করে খুঁজতো আকাশটাকে। হঠাৎ করেই হয়তো ভিড়ের মাঝখান থেকে কারোর তীক্ষ্ণ, আনন্দমাখা চিৎকার ভেসে আসতো— "ঐ তো! ঐ তো চাঁদ!" আঙুল উঁচিয়ে দেখানো সেই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সুতোর মতো চিকন, এক চিলতে বাঁকা চাঁদটা যেন আমাদের কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে মোহনীয় দৃশ্য।
চাঁদ দেখার সেই মুহূর্তের অনুভূতিটা আসলে কোনো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সে এক বিশুদ্ধ আনন্দ, যা শরীরের প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে প্রবাহিত হতো। চাঁদ দেখার পরপরই শুরু হতো আসল উন্মাদনা। দৌড়ে নিচে নেমে আসা। ড্রয়িংরুমে সাদাকালো বা বাক্স-মার্কা রঙিন টিভির সামনে বসে পড়া। বিটিভির পর্দায় যখন খবর পাঠিকা হাসি মুখে বলতেন, "আগামীকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর," আর তার ঠিক পরপরই বেজে উঠতো কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী গান— "ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ..."— তখন আমাদের মনে হতো যেন পুরো পৃথিবীটাই আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। পাড়ার মসজিদের মাইক থেকে ইমাম সাহেবের গম্ভীর অথচ আনন্দঘন কণ্ঠ ভেসে আসতো— "সম্মানিত এলাকাবাসী... আনন্দের সাথে জানানো যাচ্ছে যে, আগামীকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হবে।" ব্যস! সাথে সাথে সারা পাড়ায় একযোগে আনন্দ উল্লাস, পটকা আর তারাবাজি ফোটার শব্দ। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ‘ঈদ মোবারক’ বলার সেই দৃশ্যগুলো আজ কেবলই রূপকথা মনে হয়।
চাঁদরাতের সেই উন্মাদনা এখনকার প্রজন্মের কাছে হয়তো পুরোপুরি অচেনা। নতুন জামাটা ঈদের আগে কেউ যেন দেখে না ফেলে, সেজন্য কতই না লুকোচুরি! আলমারি থেকে নতুন শার্ট বা প্যান্টটা বের করে দশবার দেখা, আর বারবার সযতনে ভাঁজ করে লুকিয়ে রাখা— যেন কেউ দেখে ফেললে জামার জৌলুস বা চমকটাই কমে যাবে! ঈদের আগের রাতে উত্তেজনায় চোখের পাতা এক করতে পারতাম না। বারবার মনে হতো, রাত পোহাতে এত দেরি হচ্ছে কেন? কখন সকাল হবে!
ওদিকে চাঁদরাতের সন্ধ্যা থেকেই মেয়েদের মাঝে শুরু হতো আরেক উৎসব। উঠোনে পাটি বা মাদুর বিছিয়ে গোল হয়ে বসে হাতে মেহেদি দেওয়া। তখন টিউব মেহেদির এত চল ছিল না। পাটা-পুতায় বেটে আনা কাঁচা মেহেদি পাতার সেই সোঁদা গন্ধটা আজও যেন নাকে লেগে আছে। দেশলাইয়ের কাঠি বা টুথপিক দিয়ে কত যত্ন করে নকশা আঁকা হতো হাতে। কার মেহেদির রঙ কত গাঢ় হলো, সকালে উঠে তা মেলানোর মাঝেই ছিল এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা আর অনাবিল সুখ। অন্যদিকে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসতো মায়ের হাতের সেমাই ভাজা, পায়েস আর গরম মশলা দিয়ে মাংস কষানোর সেই পাগল করা সুবাস। পুরো বাড়িটা যেন একটা উৎসবের কারখানায় পরিণত হতো।
ঈদের সকালটা ছিল আরও স্নিগ্ধ, আরও পবিত্র। ফজরের আজানের পরপরই ঘুম থেকে উঠে পড়া। সুবাসিত সাবান (হয়তো তিব্বত, লাক্স বা লাইফবয়) দিয়ে গোসল সেরে, গায়ে কড়া আতর মেখে, সেই কড়কড়ে ইস্ত্রি করা নতুন জামাটা গায়ে জড়ানোর অনুভূতি ছিল রাজার সিংহাসনে বসার মতো। এরপর বাবার আঙুল ধরে, কিংবা দাদার হাত ধরে ঈদগাহের দিকে হেঁটে যাওয়ার সেই দৃশ্যটা আজ যখন চোখের সামনে ভাসে, তখন অজান্তেই চোখের কোণটা ভিজে ওঠে। বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করলেই হাতের মুঠোয় চলে আসতো কড়কড়ে নতুন নোট। দুই টাকা, পাঁচ টাকা বা দশ টাকার সেই নতুন নোটগুলোর যে কী অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ ছিল! সারা দিন সেই টাকাগুলো পকেট থেকে বের করে বারবার গোনা, আর বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো। কে কত সালামি পেল, কার চেয়ে কার সালামি দশ টাকা বেশি— তার হিসাব মেলানোর মাঝেই ছিল আমাদের দুনিয়ার সব সুখ।
আমাদের সেই ঈদগুলোতে কোনো সোশ্যাল মিডিয়ার শো-অফ ছিল না। ভালো ছবি তোলার জন্য কোনো ডিএসএলআর ক্যামেরা বা স্ন্যাপচ্যাটের ফিল্টার ছিল না। আমাদের আনন্দগুলো ছিল খুব খাঁটি, মাটির কাছাকাছি। একটা নতুন জামা, মায়ের হাতের জর্দা-সেমাই, আর বন্ধুদের সাথে সাইকেল নিয়ে বা পায়ে হেঁটে কয়েকটা ঘণ্টা পাড়া চষে বেড়ানো— এই নিয়েই আমাদের ঈদের আনন্দ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যেতো। প্রতিটি বাড়িতে ঢুকে সেমাই খাওয়াটা যেন এক অলিখিত নিয়ম ছিল। তখন মানুষের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, দরজাগুলো সবার জন্যই খোলা থাকতো।
আজ আমরা বড় হয়েছি। সময়ের সাথে সাথে আমরা আধুনিক হয়েছি, আমাদের আয় বেড়েছে, জীবনে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। এখন আমরা নামিদামি ব্র্যান্ডের পোশাক পরি, ফাইভ স্টার হোটেলে বুফে খাই, ঈদের ছুটিতে দেশের বাইরে ঘুরতে যাই। এখনকার ঈদে আয়োজনের কোনো কমতি থাকে না। চাঁদরাতে এখন আর কেউ ছাদে যায় না, স্মার্টফোনের নোটিফিকেশনই জানিয়ে দেয় ঈদের খবর। মাইকের ঘোষণার জন্য কেউ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে না। এখন আমরা স্ট্যাটাস দিই, চেক-ইন দিই, কিন্তু একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে সেই প্রাণখোলা হাসিটা আর হাসতে পারি না। যান্ত্রিক শহরের এই যান্ত্রিক জীবনে আমরা যেন আনন্দগুলোকেও যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলেছি।
বুকের খুব গভীরে মাঝে মাঝে খুব তীব্রভাবে ইচ্ছে করে— সময়ের চাকাটা যদি কোনো জাদুবলে একটু পেছনে ঘোরানো যেত! যদি আরেকবার বাবার সেই শক্ত হাতটা ধরে মেঠো পথ পেরিয়ে ঈদগাহের মাঠে ফিরে যাওয়া যেত! যদি আরেকবার সেই ধুলোমাখা বিকেলে বন্ধুদের সাথে চিৎকার করে বলে ওঠা যেত, "ঐ তো চাঁদ!" কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। রূপকথার মতো সেই মায়াবী ঈদগুলো হয়তো আর কখনো এই জীবনে ফিরে আসবে না। তারা চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে মহাকালের গহ্বরে। কেবল স্মৃতির পাতায়, আমাদের হৃদয়ের এক নিভৃত কোণে তারা চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। এই স্মৃতিগুলোই আজ আমাদের সম্বল, এই স্মৃতিগুলোই আমাদের বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত প্রেরণা। ভালো থাকুক আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশব, ভালো থাকুক আমাদের সেই রূপকথার ঈদগুলো।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


High-Yield Curation by @steem-seven
Your content has been supported!
Maximize your passive income!
Delegate your SP to us and earn up to 0.45 STEEM / 1000 SP.
Click here to see our Tiered Reward System
We are the hope!