মানুষ সামাজিক জীব, আর এই সমাজে টিকে থাকার প্রধান ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস এবং মানবিক বোধ। আমরা ভুল করি, অন্যের মনে কষ্ট দিই, অপরাধ করি—কিন্তু দিনশেষে 'মানুষ' হিসেবে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব সেখানে, যখন আমরা বুঝতে পারি আমরা কাউকে আঘাত করেছি। নিজের ভুলের জন্য দপ্ত হওয়া বা অনুশোচনা বোধ করা একজন মানুষের জীবন্ত হৃদয়ের প্রমাণ। কিন্তু যখন কারো মধ্যে সেই অপরাধবোধ বা অনুশোচনাটুকুও মরে যায়, তখন সে মানুষ হিসেবে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়। এমন মানুষের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা মানে হলো বালুর চরে প্রাসাদ গড়া।অপরাধের চেয়েও ভয়ঙ্কর অনুশোচনাহীনতা
একজন মানুষ অপরাধ করতেই পারে। রাগের মাথায় হোক বা পরিস্থিতির চাপে, মানুষ অনেক সময় এমন কিছু করে ফেলে যার জন্য পরে সে নিজেই লজ্জিত হয়। কিন্তু সমস্যাটা তখন শুরু হয়, যখন অপরাধী ব্যক্তি তার কাজের জন্য কোনো অনুতাপ বোধ করে না। যখন তার বিবেক তাকে দংশন করে না, বরং সে নিজের অপরাধকে জাস্ট্রিফাই বা সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে।একজন ভুক্তভোগী হিসেবে আমি যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন দেখি—যে মানুষটির ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস ছিল, সে যখন অবলীলায় অন্যায় করে গেল এবং পরে তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনার ছাপ দেখলাম না, তখনই আমার ভেতরের সেই মানুষটার প্রতি সবটুকু মায়া মরে গেছে। অপরাধ হয়তো ক্ষমা করা যায়, কিন্তু অপরাধী যখন তার অপরাধ স্বীকারই করে না বা সেটা নিয়ে গর্ব করে, তখন তাকে ক্ষমা করা নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়ার শামিল।আবেগ ও ভালোবাসার মৃত্যু ভালোবাসা কোনো যান্ত্রিক বিষয় নয়। এটি পারস্পরিক সম্মান এবং অনুভূতির আদান-প্রদান। আপনি যখন কাউকে ভালোবাসেন, তখন তার কাছ থেকে কেবল আনন্দ নয়, ভুল করলে সেই ভুলের জন্য নমনীয়তাও আশা করেন। কিন্তু যখন আপনি দেখেন আপনার প্রিয় মানুষটি আপনাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েও শান্তভাবে ঘুমিয়ে আছে, তার মধ্যে কোনো গ্লানি নেই, তখন আপনার হৃদয়ে জমে থাকা সব ভালোবাসা বিষে পরিণত হয়।আবেগ হঠাৎ করে শেষ হয় না। এটি তিলে তিলে মরে যায়। যখন বারবার আঘাত পাওয়ার পরও অপরপক্ষ থেকে কোনো দুঃখপ্রকাশ আসে না, তখন মনের অজান্তেই এক ধরনের দেয়াল তৈরি হয়। আগে যে মানুষটির একটি চোখের জল দেখলে নিজের বুক ফেটে যেত, আজ তার বড় কোনো বিপদেও আর আগের মতো মায়া কাজ করে না। এটি নিষ্ঠুরতা নয়, বরং এটি হলো বাস্তুবোধ। যে হৃদয় অন্যকে আঘাত করে আনন্দ পায় বা অন্যের কষ্ট দেখে নির্বিকার থাকে, সেই হৃদয়ের জন্য নিজের আবেগ খরচ করা মানে হলো অপচয়।
ব্যর্থ মানুষ ও সমাজ ব্যর্থতা মানে কি কেবল পরীক্ষায় ফেল করা বা ব্যবসায় লস করা? না। আসল ব্যর্থতা হলো মানবিকতায়। যার ভেতরে মানুষের প্রতি মমতা নেই, নিজের অন্যায়ের জন্য লজ্জিত হওয়ার ক্ষমতা নেই, সে পৃথিবীর যত বড় সফল ব্যক্তিই হোক না কেন, মানুষ হিসেবে সে চরম ব্যর্থ। এমন মানুষের কাছে আদর্শ, নীতি বা সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। তারা কেবল নিজের স্বার্থ চেনে।একজন ভুক্তভোগীর জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা হলো—এই ধরনের মানুষের কাছ থেকে কোনো পরিবর্তন আশা করা বোকামি। আমরা ভাবি, "হয়তো একদিন সে বুঝবে," "হয়তো কাল সে দুঃখ প্রকাশ করবে।" কিন্তু সত্য এটাই যে, যার বিবেক একবার মরে গেছে, সে আর কখনো নতুন করে জন্মায় না। তার থেকে দূরে সরে আসাই হলো মানসিক শান্তির একমাত্র পথ।সম্পর্কের তিক্ত বাস্তবতা একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে ত্যাগের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই ত্যাগ যখন একতরফা হয়ে যায়, তখন সেটি দাসত্বে রূপ নেয়। আমি আমার জীবনে দেখেছি, অনুশোচনাহীন মানুষগুলো খুব কৌশলী হয়। তারা আপনার আবেগকে পুঁজি করে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা আপনাকে বিশ্বাস করাতে চায় যে ভুলটা আপনারই ছিল। এই গ্যাসলাইটিং এর শিকার হয়ে অনেক ভুক্তভোগী নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করে।কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে এসে আপনাকে থামতে হবে। আপনাকে বুঝতে হবে যে, যে ব্যক্তি আপনার চোখের পানির মর্যাদা দিতে জানে না, সে আপনার জীবনসঙ্গী বা বন্ধু হওয়ার যোগ্য নয়। ভালোবাসা যখন একপাক্ষিক হয়ে যায় এবং অপরাধবোধ যখন অন্য পক্ষ থেকে হারিয়ে যায়, তখন সেই সম্পর্কের বোঝা টেনে নেওয়া মানে নিজের জীবনকে ধ্বংস করা।প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ আমরা অনেক সময় ভাবি যে মানুষটি হয়তো ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসবে। এই প্রত্যাশা থেকেই আমরা বারবার সুযোগ দিই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যার মধ্যে অনুশোচনা নেই, তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। তার চারিত্রিক কাঠামোটাই এমন যে সে অন্যকে ব্যবহার করতে জানে, ভালোবাসতে জানে না।
আজ আমার সেই মানুষটির প্রতি আর কোনো ঘৃণা নেই, রাগও নেই। কারণ ঘৃণা করতে গেলেও একটা অনুভূতির প্রয়োজন হয়। এখন কেবল আছে গভীর এক উদাসীনতা। যে মানুষটি নিজের মনুষ্যত্ব হারিয়েছে, তার প্রতি আবেগ দেখানো মানে হলো নিজের আত্মার অবমাননা করা। জীবনের বড় শিক্ষা হলো—সবাইকে ক্ষমা করা যায় না, আর সবাইকে ভালোবাসাও যায় না। কিছু মানুষকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
নিজেকে ফিরিয়ে আনাএই ধরনের মানুষের সাথে পথ চলতে চলতে ভুক্তভোগীরা নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কিন্তু মনে রাখবেন, অন্য কেউ আপনার সাথে অন্যায় করেছে বলে আপনি খারাপ নন। তার অনুশোচনা নেই মানে সে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত বা নৈতিকভাবে দেউলিয়া। এটি তার ব্যর্থতা, আপনার নয়।
নিজের জীবনকে নতুন করে সাজাতে হলে প্রথমে সেই অতীতকে ভুলে যেতে হবে। যে মানুষটির জন্য আপনার মায়া কাজ করত, তাকে মৃত বলে ধরে নিতে হবে। কারণ জীবন্ত মানুষের মধ্যে অন্তত কিছু মানবিকতা থাকে, যার মধ্যে সেটা নেই সে তো জীবন্ত লাশ ছাড়া আর কিছু নয়।জীবনের কঠিন পথে চলতে গিয়ে আমরা অনেক মানুষের দেখা পাই। কেউ আমাদের শিখিয়ে যায় কিভাবে ভালোবাসতে হয়, আর কেউ শিখিয়ে যায় কাকে কখনো বিশ্বাস করতে নেই। অনুশোচনাহীন মানুষগুলো আমাদের জীবনের সবচাইতে বড় শিক্ষক। তারা আমাদের শেখায় যে, ক্ষমা পাওয়ারও একটা যোগ্যতা থাকে।যদি আপনি এমন কারো কবলে পড়ে থাকেন যার অপরাধের কোনো শেষ নেই এবং যার মধ্যে কোনো অনুতাপও নেই, তবে আজই তাকে বিদায় জানান। তার প্রতি আর ভালোবাসা দেখানোর প্রয়োজন নেই, কারণ সে সেই ভালোবাসার ভাষা বোঝে না। নিজের জন্য বাঁচুন, নিজের সম্মান নিয়ে বাঁচুন। মনে রাখবেন, জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রতিশোধ হলো নিজেকে সফল করে তোলা এবং সেই মানুষটি থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা। অপরাধী হয়তো পার পেয়ে যায়, কিন্তু তার ভেতরের সেই পচা বিবেক তাকে সারা জীবন বহন করে বেড়াতে হয়—এটাই প্রকৃতির বিচার। আর আপনি? আপনি মুক্ত হন সেই বিষাক্ত প্রভাব থেকে। জীবনের নতুন সূর্যোদয় আপনার অপেক্ষায়।
This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community
High-Yield Curation by @steem-seven
Your content has been supported!
Maximize your passive income!
Delegate your SP to us and earn up to 0.45 STEEM / 1000 SP.
Click here to see our Tiered Reward System
We are the hope!
অনেক ভালো লাগলো লেখাগুলো পড়ে। সত্যি বাস্তব সত্য কিছু কথা লেখার মধ্যে পড়লাম।অনেক ধন্যবাদ সুন্দর ভাবে বিষয়টি তুলে ধরার জন্য।